ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ আন্তর্জাতিক ]

পাকিস্তানে অনলাইনে যৌন শোষণের শিকার ১৫ লাখ শিশু

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৩৬, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পাকিস্তানে অনলাইনে যৌন শোষণের শিকার ১৫ লাখ শিশু
সংগৃহীত ছবি

কম্পিউটার গেম খেলতে গিয়ে অপরিচিত এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল পাকিস্তানি কিশোরী জারা শাহের (ছদ্মনাম)। শুরুতে সাধারণ কথোপকথন ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ থাকলেও একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি তার কাছে ব্যক্তিগত ও আপত্তিকর ছবি দাবি করেন। জারা এতে রাজি না হলে তাকে পরিবারকে খুঁজে বের করে সবকিছু জানিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৭ বছর বয়সী জারা পাকিস্তানে অনলাইনে যৌন শোষণের শিকার হওয়া আনুমানিক ১৫ লাখ শিশুর একজন। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের মধ্যে প্রায় ৬ শতাংশ এক বছরে প্রযুক্তিনির্ভর যৌন শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

Advertisement

জারা বলেন, অনলাইন গেম খেলার সময় ওই ব্যক্তির সঙ্গে তার কথা শুরু হয়। পরে সে বন্ধুর মতো আচরণ করতে থাকে এবং দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করে। একপর্যায়ে আপত্তিকর ছবি চাইলে তিনি তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। তখন তাকে পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করে কথোপকথনের বিষয়টি জানিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

ইউনিসেফের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ওপর সংঘটিত অনলাইন যৌন শোষণের প্রায় ৮৫ শতাংশ ঘটনায় অপরাধী ভুক্তভোগীর পূর্বপরিচিত ছিল। অর্থাৎ, অনলাইন নির্যাতনের ক্ষেত্রে অপরিচিত ব্যক্তিই প্রধান ঝুঁকি—এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়।

ইউনিসেফের বৈশ্বিক প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ড্যানিয়েল কার্ডেফেল্ট এএফপিকে বলেন, এ ধরনের শোষণ অনেক সময় বন্ধুত্বপূর্ণ কথোপকথন, অনলাইন গেমিং, উপহার, অর্থ কিংবা ভালোবাসার প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে শুরু হয়। অপরাধীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য কাজে লাগিয়ে শিশুদের আস্থা অর্জনে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে পারে।

পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে শিশুদের নীরবতার কারণে। ইউনিসেফের গবেষণায় দেখা যায়, ভুক্তভোগী শিশুদের ৭১ শতাংশ কাউকে বিষয়টি জানায়নি। জরিপে অংশ নেওয়া কোনো শিশুই পুলিশ, হেল্পলাইন বা সমাজকর্মীদের মতো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় অভিযোগ করেনি। সামাজিক লজ্জা, কলঙ্ক এবং পরিবার ও সমাজের প্রতিক্রিয়ার ভয় তাদের নীরব থাকার অন্যতম কারণ।

লাহোরভিত্তিক শিশু অধিকার সংগঠন পাহচানের পরিচালক মেহেক নাঈম জানান, রিপোর্ট করা নির্যাতনের প্রায় ৪৪ শতাংশ পুরোপুরি অনলাইনে ঘটেছে। এসব ঘটনায় স্ন্যাপচ্যাট ও হোয়াটসঅ্যাপ ছিল ব্যবহৃত সাধারণ মাধ্যমগুলোর মধ্যে অন্যতম।

রক্ষণশীল সামাজিক পরিবেশে অনলাইন যৌন ব্ল্যাকমেইলের প্রভাব মেয়েদের ওপর আরও ব্যাপক হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় তাদের বাইরে যাওয়া বা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। জারাও পরিবারকে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়ার হুমকির কারণে নীরব থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

জারা বলেন, বিষয়টি জানাজানি হলে তার স্কুলে যাওয়া কিংবা বাড়ির বাইরে বের হওয়াও বন্ধ হয়ে যেতে পারত। তাই কথা বলার চেয়ে নীরব থাকাই তখন নিরাপদ মনে হয়েছিল। তবে সেই ঘটনার পরও তিনি ভয় ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

ইউনিসেফের হিসাবে, পাকিস্তানে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৭৪ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ফলে শিশুদের ডিজিটাল উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন নিরাপত্তার ঝুঁকিও সামনে আসছে।

এদিকে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েও পাকিস্তানে বিতর্ক চলছে। চলতি মাসে পাঞ্জাবের প্রাদেশিক সরকার ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব পাস করেছে। তবে ডিজিটাল অধিকারকর্মী উসামা খিলজি এর বিরোধিতা করে বলেছেন, এমন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে এবং শিশুরা ভিপিএনের মাধ্যমে তা এড়িয়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে, অলাভজনক সংস্থা মুসলিম হ্যান্ডসের মুখপাত্র তাহিরা আফ্রাসিয়াবের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় পাকিস্তানে আইনি কাঠামো থাকলেও এর যথাযথ বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। মানবাধিকার আইনজীবী সালমান আফ্রিদিও বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিভিন্ন ফাঁকফোকরের কথা তুলে ধরেছেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থনৈতিক দুর্বলতাকেও ব্যবহার করে শিশুদের যৌন উপাদান তৈরিতে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। এর সঙ্গে গ্রুমিং, প্রলোভন, জবরদস্তি, ব্ল্যাকমেইল, যৌন উপাদান তৈরি, বিতরণ ও বাণিজ্যিকীকরণের মতো একাধিক ধাপ যুক্ত থাকতে পারে।

ইউনিসেফের প্রতিবেদনে শিশুদের অনলাইন সুরক্ষায় শক্তিশালী আইন, আইন প্রয়োগের সক্ষমতা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ ও গোপনীয় অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জারার অভিজ্ঞতা দেখায়, অনলাইন গেমে একটি সাধারণ পরিচয়ও কীভাবে ধীরে ধীরে ভয়ংকর শোষণের ঘটনায় পরিণত হতে পারে। সেই ঘটনার মানসিক চাপ থেকে বেরিয়ে আসাও তার মতো অনেক শিশুর জন্য দীর্ঘ ও কঠিন প্রক্রিয়া।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এম ইউ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!