ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ ফিচার ]

ডোরাকাটা মলাটে ‘আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’

স্বরলিপি
প্রকাশিত: ১৬:৫৫, ২০ এপ্রিল ২০১৯
ডোরাকাটা মলাটে ‘আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’
ছবি: সংগৃহীত

এক কিশোরীর লেখা ডায়েরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাক্ষ্য বহন করছে। হিটলারের নাৎসী বাহিনীর অত্যাচার আর ইহুদিদের সংগ্রামের খণ্ডছবি ধারণ করে আছে। কিশোরীর নাম আনা ফ্রাঙ্ক। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে প্রথমত মাতৃভূমি ত্যাগ করে পাড়ি জমাতে হয়েছিল হল্যাণ্ডে। সেখান থেকেও নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার জন্য একটি ঘুপচি ঘরে ঠাঁই নিতে হয়েছিল। যে ঘরে রাতের বেলা বাতি জ্বালানো নিষেধ ছিল। দিনের বেলায় জানালা খোলার উপায় ছিল না। 

আনার বয়স তখন ১৩ বছর। যেদিন ডায়েরি লেখার জন্য হাতে কলম তুলে নিয়েছিল,সে দিনটি ছিল ১৪ জুন, ১৯৪২ সাল।

আনার লেখায় পাওয়া যায় ‘আসলে আমার মনে হয়, তেরো বছরের এক স্কুলের মেয়ের মনখোলা কথাবার্তা কোন আগ্রহ জাগাবে না। না আমার, না সেদিক থেকে আর কারো। তা হোক, কী আসে যায় তাতে? আমি চাই লিখতে কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হল, আমার বুকের গভীরে যা কিছু চাপা পড়ে রয়েছে আমি চাই সেসব বের করে আনতে’।
 আনা ঠিক এই কাজটিই করেছে।

গোপন আস্তানায় লুকিয়ে থাকা ১৩ বছরের ফ্রাঙ্ক ডায়েরিতে শেষ অক্ষর লিখেছিল পনেরো বছর দুই মাস পর্যন্ত। দুই বছর দুই মাসের এই ডায়েরি বা দিনলিপি নাৎসীদের নির্মাতার ইতিহাস বহন করছে।

এতে আনার পরিবারের সংগ্রাম আর পরিণতিও স্পষ্ট। হিটলারের অত্যাচারে জার্মান ইহুদিরা তখন দেশ ছেড়ে হলাণ্ডে পাড়ি জমিয়েছে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।  

আনা ফ্রাঙ্কের মায়ের নাম এডিথ, বাবার নাম অটো ফ্রাঙ্ক। আনা ফ্রাঙ্কের বড় বোন মরগট। ১৯৩৩ সালে জন্মস্থান জার্মান ছেড়ে আনা ফ্রাঙ্ক পরিবারের সঙ্গে চলে যায় হল্যাণ্ডে। তখন তার বয়স মাত্র চার বছর।

পরিবারের সঙ্গে আনা ফ্রাঙ্কএর ঠিক ছয় বছর পরেই হল্যাণ্ডেও আনা ফ্রাঙ্কের পরিবার অনিরাপদ পরিস্থিতির মুখোমুখী হয়। হিটলারের নাৎসী বাহিনী হল্যাণ্ড দখল করে নেয়। অসংখ্য ইহুদিকে পাঠিয়ে দেয়া হয় বন্দিশিবিরে। আনা ফ্রাঙ্কের বড় বোন মারগটের বয়স তখন ষোল। মারগট কয়েকজন অফিসারের কু-দৃষ্টিতে পড়ে। মারগটকে ডাকা হয় বন্দিশিবিরে।

কিন্তু আনা ফ্রাঙ্কের বাবা অটো ফ্রাঙ্ক সেই ডাকে সাড়া দেননি। পরিবার নিয়ে আত্মগোপনে গেলেন। এ সময় তাকে সাহায্য করেন কয়েকজন ইংরেজ। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হল না। ১৯৪৪ সালে ৪ আগস্ট, সেখানে হানা দেয় নাৎসি বাহিনী। ১৯৪৫ সালের ৬ জানুয়ারি মারা যান আনা ফ্রাঙ্কের মা।

অন্যদিকে আনা ফ্রাঙ্ক ও তার বড় বোন মারগটকে পাঠানো হলো দূরের বেরজেন-বেল্সেন বন্দিশিবিরে। ১৯৪৫ এ ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে অথবা মার্চের শুরুতে বন্দিশিবিরেই মৃত্যু হয় মারগটের। একই বন্দিশিবিরে মৃত্যু হয় ১৫ বছর ৯ মাসের কিশোরী আনা ফ্রাঙ্কের।

বন্দিশিবিরে মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসেছিলেন আনা ফ্রাঙ্কের বাবা অটো ফ্রাঙ্ক। অটো ফ্রাঙ্কের দুই শুভাকাঙ্ক্ষী এলি আর মিপ অটো ফ্রাঙ্কের হাতে তুলে দিয়েছিল আনার লেখা লাল ডোরাকাটা মলাটের একটা ডায়েরি। সঙ্গে ছিল আরো কিছু কাগজ। এগুলো ছিল আনার দিনলিপি আর তার লেখা গল্প, উপন্যাস ও স্মৃতিকথা।

১৯৪৭ সালে প্রথমবারের মতো ডাচ ভাষায় এটি প্রকাশিত হয়। প্রথমে এই ডায়েরির নাম ছিল ‘Rear Annex’।  জানা যায়, শুরুতে আমেরিকান প্রকাশকরা এই ডায়েরি প্রকাশে খুব একটা আগ্রহ প্রকাশ করেননি। ১৯৫২ সালে এটি, ‘The Diary of a Young Girl’ প্রকাশ হয়। খুব দ্রুতই জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়।

অসংখ্য, অগণিত ভাষায় এটি অনূদিত হয়েছে। ডায়েরিকে উপজীব্য করে মঞ্চ নাটক, সিনেমা তৈরি হয়েছে।
তৎকালীন ইতিহাস, ইহুদিদের লাঞ্ছনা-যন্ত্রণা ও সংগ্রামসহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খণ্ডকালীন সাক্ষ্য বহন করছে আনার লেখা ডায়েরি।

তথ্যসূত্র : Diary_Of_Annie_Frank
https://en.wikipedia.org/wiki/The_Diary_of_a_Young_Girl

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআরকে

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!