পোল্ট্রি খামারের ছাদে সৌর বিদ্যুৎ- সাশ্রয় ও সম্ভাবনা
মুরগির খামার ও মাছ চাষ—এখন চলবে সূর্যের শক্তিতে! বিদ্যুৎ চলে গেলে খামারের ফ্যান, লাইট ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বন্ধ হয়ে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। সঠিকভাবে ডিজাইন করা সোলার সিস্টেম নিশ্চিত করবে খামারে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ।
খামারে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ—হবে না ১ টাকাও লস!
দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে পোল্ট্রি খামারের বিশাল ছাদ। এসব ছাদে সৌরপ্যানেল স্থাপন করে প্রায় ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটপিক (MWp) সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব। এতে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি পোল্ট্রি খামারের বিদ্যুৎ ব্যয় ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
গত ৩ অক্টোবর ঢাকার র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ ব্রাঞ্চের (WPSA-BB) আয়োজিত আন্তর্জাতিক কারিগরি সেমিনার-২০২৬-এ এ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (BPICC) সভাপতি মসিউর রহমান। ‘ক্লাইমেট-স্মার্ট পোল্ট্রি ফার্মিং’ বিষয়ক উপস্থাপনায় তিনি পোল্ট্রি শিল্পকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিনির্ভর করার ওপর গুরুত্ব দেন।
- উপস্থাপনা অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ বর্গমিটার পোল্ট্রি শেডের ছাদ রয়েছে। এর ৭০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা গেলে উচ্চদক্ষতার সৌরপ্যানেলের মাধ্যমে প্রায় ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ MWp সক্ষমতা স্থাপন সম্ভব।
এতে নতুন জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতিতে এ উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৩২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট। অন্যদিকে, গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ সংকটের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিংয়ের চাপও বেড়েছে।
এ অবস্থায় পোল্ট্রি খামারের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন দিনের বেলায় বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে এবং জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উৎপাদনের ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
সরকারের ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গেও এ সম্ভাবনার মিল রয়েছে। পোল্ট্রি খাতের ছাদ থেকে সম্ভাব্য সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা জাতীয় ওই লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৭৩ থেকে ৮২ শতাংশের সমান। ফলে খাতটিকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা সম্ভব।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে পোল্ট্রি খামারিরাও সরাসরি লাভবান হতে পারেন। খামারে ভেন্টিলেশন, কুলিং, আলো ও পানি সরবরাহের যন্ত্রপাতি চালাতে প্রচুর বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়।
ছাদে সৌরপ্যানেল স্থাপন করে নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা গেলে বিদ্যুৎ বিল কমবে এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিও কিছুটা হ্রাস পাবে। পাশাপাশি সৌরপ্যানেলের ছায়া শেডের ওপর সরাসরি সূর্যের তাপ পড়া কমিয়ে ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
- শুধু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, পোল্ট্রি বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরেরও সুযোগ রয়েছে। উপস্থাপনায় বছরে প্রায় ৩৫ লাখ টন পোল্ট্রি ম্যানিউর বা মুরগির বিষ্ঠা উৎপাদনের কথা তুলে ধরা হয়।
এসব বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বায়োগ্যাস ও জৈবসার উৎপাদন করা সম্ভব। পাশাপাশি মৃত মুরগি প্রক্রিয়াজাত করে পোল্ট্রি মিল তৈরির মতো উদ্যোগও বর্জ্য থেকে অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
এ লক্ষ্যে ছোট, মাঝারি ও বড় খামারের জন্য পৃথক প্রযুক্তিনির্ভর মডেলের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ছোট খামারে সৌরবিদ্যুৎ, জ্বালানি-সাশ্রয়ী আলো ও বায়োগ্যাস ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যয় কমানো যেতে পারে। মাঝারি খামারে যুক্ত হতে পারে কম্পোস্টিং, নেট মিটারিং ও স্বয়ংক্রিয় ভেন্টিলেশন। বড় খামারে সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি স্টোরেজ, বায়োগ্যাস ও কম্পোস্ট প্ল্যান্টের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় পরিবেশ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালুর সুযোগ রয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অটোমেশন ও ডেটাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমন্বয়ে গড়ে উঠতে পারে পরিবেশবান্ধব ‘স্মার্ট পোল্ট্রি ফার্ম’। এতে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়, জ্বালানি সাশ্রয় এবং পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, দেশের পোল্ট্রি খামারের বিশাল ছাদকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগানো গেলে তা শুধু খামারিদের ব্যয় কমানোর উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ও জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সম্ভাব্য ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ MWp সক্ষমতা বাস্তবে অর্জন করতে প্রয়োজন বিনিয়োগ, উপযুক্ত নীতিসহায়তা, কারিগরি পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন। উল্লেখ্য, MWp সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সক্ষমতা নির্দেশ করে; এটি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের সমান নয়।