ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ ফিচার ]

ঢাকায় শিকড়, শান্তিনিকেতনের শৈশব, বিশ্বজোড়া জ্ঞানসাধক অমর্ত্য সেন

হারুন-অর-রশীদ খান
প্রকাশিত: ১১:২৮, ৩ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকায় শিকড়, শান্তিনিকেতনের শৈশব, বিশ্বজোড়া জ্ঞানসাধক অমর্ত্য সেন
শৈশবের একটি উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে ঢাকায়। সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। পরবর্তীকালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

আজ ৩ নভেম্বর, ড. অমর্ত্য সেন ৯৩ বছরের চৌকাঠ টপকালেন। জন্মেছিলেন ১৯৩৩ সালে।

অমর্ত্য সেন শুধু অর্থনীতির ছাত্রদের কাছে নয়, মানবিক চিন্তার প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। তাঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে— 'Development is freedom' অর্থাৎ, উন্নয়ন মানেই স্বাধীনতা। এই দর্শনেই তিনি মানব উন্নয়ন সূচকের তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে তুলেছেন। আজও অমর্ত্য সেন মানবিক সমাজব্যবস্থার পক্ষে সরব কণ্ঠস্বর।

১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে প্রথম বাঙালি হিসেবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ নিয়ে ভিন্ন ও গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরার সুবাদে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি ও শ্রদ্ধা অর্জন করেন। তার দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষের মতো বিষয় ভালো করে বোঝার আগ্রহ জন্মে খুব ছোটবেলাতেই। ১৯৪৩ সালে বাংলার দুর্ভিক্ষ তথা পঞ্চাশের মন্বন্তর তিনি প্রত্যক্ষভাবে দেখেছিলেন।

তখন তার বয়স মাত্র ৯ বছর। স্কুল প্রাঙ্গণে হঠাৎ করেই পাগলপ্রায় একটি লোক ঢুকে পড়ে। কিছু শিক্ষার্থী তাকে নিয়ে মজা করা শুরু করলেও অমর্ত্য এবং আরো কিছু শিক্ষার্থী তার সহায়তায় এগিয়ে যান। তার সাথে কথা বলতে গিয়ে জানতে পারলেন যে লোকটি ৪০ দিন ধরে কিছু খাননি। তার দুর্ভিক্ষের অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে এই বিষয়ে গবেষণা করার অনুপ্রেরণা জোগায়। অভাবে জর্জরিত মানুষের পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করেন, পরিস্থিতির পেছনের কারণগুলো তুলে ধরা এবং কিছু ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান দেওয়ার বিষয়েও কাজ করেন।

২০০৪ সালে বিবিসি বাংলার ৩০ দিনের একটি শ্রোতা জরিপে শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় নির্বাচিত ২০ জনের মধ্যে ১৪তম স্থান দখল করেন অমর্ত্য সেন।

বিশ্ববরেণ্য অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক ও নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন। দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও মানবকল্যাণ নিয়ে তাঁর গবেষণা বিশ্বজুড়ে বিশেষ স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

Tracing Amartya Sen's journey from colonial India to Nobel Prize and beyond  — Harvard Gazette

১৯৩৩ সালের ৩ নভেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে তাঁর জন্ম। তাঁর পারিবারিক শিকড় বাংলাদেশের ঢাকার ওয়ারীতে। পিতা আশুতোষ সেন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের অধ্যাপক। 

মাতামহ ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন প্রখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই তাঁর নাম রাখেন ‘অমর্ত্য’, যার অর্থ অমর বা অবিনশ্বর।

শৈশবের একটি উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে ঢাকায়। সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। পরবর্তীকালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। 

এরপর যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ১৯৫৯ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
অর্থনীতিতে মৌলিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৮ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। 

বিশেষ করে দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, সামাজিক বৈষম্য ও জনকল্যাণমূলক অর্থনীতিতে তাঁর গবেষণা বিশ্বব্যাপী নতুন চিন্তার দ্বার উন্মোচন করেছে। 

তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস ডব্লিউ ল্যামন্ট ইউনিভার্সিটি প্রফেসর এবং অর্থনীতি ও দর্শনের অধ্যাপক।

নিজের আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন,
"আমার জন্ম একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। আর সারা জীবনই আমি ঘুরে বেড়িয়েছি এক ক্যাম্পাস থেকে আরেক ক্যাম্পাসে।"

ঢাকার শিকড়, শান্তিনিকেতনের শৈশব এবং বিশ্বজোড়া জ্ঞানসাধনা—সব মিলিয়ে অমর্ত্য সেন এক অনন্য বাঙালি মনীষী।

আজ ৩ নভেম্বর, তাঁর ৯৩তম জন্মবার্ষিকী। বিশ্ববরেণ্য এই বাঙালি অর্থনীতিবিদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা।

Oh! Calcutta! Amartya Sen's childhood memories brim with nostalgia | The Spectator

শৈশব ও নামকরণের গল্প
অমর্ত্য সেনের নাম রেখেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 'অমর্ত্য' শব্দের অর্থ 'অমর' বা 'অবিনশ্বর'। তাঁর পরিবারের সঙ্গে শান্তিনিকেতনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও মানবিক চিন্তাশীল।

শিক্ষাজীবনের সূচনা
১৯৪১ সালে তিনি ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি’স স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন। দেশভাগের পর পরিবার-সহ ভারতে চলে আসেন এবং ভর্তি হন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলে। ১৯৫৩ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। পরবর্তীতে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে উচ্চশিক্ষা নিতে যান। ১৯৫৬ সালে প্রথম শ্রেণিতে বিএ (অনার্স) ডিগ্রি পান। আর, ওই বছরই কেমব্রিজ মজলিসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

অমর্ত্য সেন ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। তিনি দুর্ভিক্ষ, মানব উন্নয়ন, জনকল্যাণ অর্থনীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর তাঁর গবেষণার জন্য বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁর 'সক্ষমতা তত্ত্ব বা ক্ষমতাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি' (Capability Approach) তত্ত্ব আজও মানব উন্নয়ন সূচকের (HDI) অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

১৯৯৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান 'ভারতরত্ন' প্রদান করেছে। এছাড়া তিনি পেয়েছেন ১২০টিরও বেশি সম্মানসূচক ডিগ্রি এবং পুরস্কার। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, তিনিই প্রথম অ-আমেরিকান নাগরিক, যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হিউম্যানিটিস মেডেল পেয়েছেন।

অমর্ত্য সেন শিক্ষকতা করেছেন বিশ্বের নামকরা প্রতিষ্ঠানগুলোতে, যেমন— হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স, দিল্লি স্কুল অব ইকোনমিক্স, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT), স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফর্নিয়া বার্কলে। তাঁর ছাত্রদের অনেকে আজ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ এবং নীতিনির্ধারক হিসেবে কাজ করছেন।


 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!