যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসার গবেষণায় হাওরের সন্তান ড. মো. ওবায়দুল
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের সন্তান ড. মো. ওবায়দুল ইসলাম একজন বাংলাদেশি গবেষক। তাঁর কাজের প্রধান ক্ষেত্র ক্যানসার গবেষণা, বায়োমেডিক্যাল সায়েন্স ও ফার্মেসি। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মায়ামির মিলার স্কুল অব মেডিসিনের সার্জারি বিভাগ এবং সিলভেস্টার কমপ্রিহেনসিভ ক্যানসার সেন্টারে সহকারী বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত।
শেকড় হাওরাঞ্চলে, উচ্চশিক্ষা ইউরোপে, গবেষণার বিস্তৃতি কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে—ড. মো. ওবায়দুল ইসলামের পথচলা প্রমাণ করে, অধ্যবসায় আর জ্ঞানচর্চার শক্তিতে একজন মানুষ আন্তর্জাতিক গবেষণাঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারেন।
শৈশবের শুরু মহেশপুরে, শিক্ষার ভিত মোহনগঞ্জে
ড. মো. ওবায়দুল ইসলামের পিতা মো. আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং মাতা রওশন আরা বেগম। তাঁর জন্ম ধর্মপাশা উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামে।
জন্মের দুই বছর পর তাঁর পরিবার ধর্মপাশা উপজেলার উকিলপাড়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। মাত্র তিন বছর বয়সে ইংরেজি মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন তিনি। পাঁচ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে চলে আসেন মোহনগঞ্জে।
মোহনগঞ্জের মাইলোরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষার পর তিনি ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। ২০০২ ব্যাচের এই শিক্ষার্থী পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান বিদেশে। তাঁর শিক্ষাজীবনের এই সূচনা হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আশাব্যঞ্জক দৃষ্টান্ত।
ফার্মেসি থেকে বায়োমেডিক্যাল সায়েন্সে:
২০০৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভে ফার্মেসিতে স্নাতক (B.Pharm) সম্পন্ন করেন তিনি। এরপর ২০১৩–২০১৬ সালে ইতালির ইউনিভার্সিটি অব সিয়েনা থেকে মেডিকেল বায়োটেকনোলজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
তাঁর উচ্চশিক্ষার পরবর্তী ধাপ ছিল ইতালির পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটি অব মার্কে ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সেখানে বায়োমেডিক্যাল সায়েন্সেসে পিএইচডি গবেষণা করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল মূত্রথলির ক্যানসারে অকার্যকর HDL এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের ভূমিকা।
কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্র—গবেষণার নতুন দিগন্ত
২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত কানাডার ইউনিভার্সিটি অব শেরব্রুকে গবেষণার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। সেখানে মূত্রথলির ক্যানসার, কোলেস্টেরল বিপাক, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং ডালিমের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করেন। পাশাপাশি আলঝেইমার রোগের অগ্রগতিতে জীবাণু, প্রদাহ ও রোগপ্রতিরোধী কোষের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও তাঁর গবেষণার আগ্রহ বিস্তৃত হয়।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মায়ামিতে পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০২৬ সালের জুন থেকে একই প্রতিষ্ঠানের সার্জারি বিভাগ ও সিলভেস্টার কমপ্রিহেনসিভ ক্যানসার সেন্টারে সহকারী বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করছেন।
ক্যানসারের ওষুধপ্রতিরোধ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা:
ক্যানসার চিকিৎসায় বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো—কিছু ক্যানসার কোষ সময়ের সঙ্গে চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ড. ওবায়দুল ইসলামের গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য এই প্রতিরোধের পেছনের জৈবিক প্রক্রিয়া বোঝা এবং তা মোকাবিলার সম্ভাব্য উপায় খুঁজে বের করা।
বিশেষ করে পাকস্থলী ও খাদ্যনালির ক্যানসারে WEE1 ও MYC-এর মতো সংকেতপথের ভূমিকা, ধূমপানের প্রভাব এবং Helicobacter pylori সংক্রমণের সঙ্গে ক্যানসারের অগ্রগতি ও চিকিৎসার প্রতিরোধের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর গবেষণাকর্ম উল্লেখযোগ্য।
২০২৩ সালে তাঁর গবেষক দলের একটি গবেষণা Molecular Therapy–Oncolytics জার্নালে প্রকাশিত হয়। এতে ধূমপানের কারণে WEE1-এর প্রকাশ বৃদ্ধি কীভাবে খাদ্যনালির ক্যানসারে ডোসেট্যাক্সেল ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে, তা বিশ্লেষণ করা হয়। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের গবেষণাকর্মেও ক্যানসার চিকিৎসায় WEE1-এর ভূমিকা এবং WEE1-MYC সংকেতপথ নিয়ে তাঁর গবেষণার ধারাবাহিকতা দেখা যায়।
এ ধরনের গবেষণা ক্যানসারের জটিলতা বুঝতে এবং ভবিষ্যতে আরও কার্যকর চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবনের সম্ভাবনা অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষতা, বৃত্তি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি:
আধুনিক গবেষণাগারে ক্যানসার কোষ বিশ্লেষণ, জিনের প্রকাশ নির্ণয়, PCR ও RNA সিকোয়েন্সিং, ফ্লো সাইটোমেট্রি, ওয়েস্টার্ন ব্লটিং এবং বিভিন্ন প্রোটিন বিশ্লেষন।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি ইতালির DSU এবং ERSU-সহ বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে তরুণ পিএইচডি গবেষক হিসেবে সেরা উপস্থাপনার দুটি পুরস্কার অর্জন করেন এ ছাড়া ২০২৪ সালে আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্যানসার রিসার্চ (AACR)-এর ডরিন জে. পুথরা ক্যানসার রিসার্চ ফাউন্ডেশন স্কলার-ইন-ট্রেনিং অ্যাওয়ার্ড রয়েছে।ডাইজেস্টিভ ডিজিজ উইক (DDW) ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৬ — আমেরিকান গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (AGA), ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৬ সালের সম্মেলন/কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বা সংশ্লিষ্ট স্বীকৃতি।
নতুন প্রজন্মের জন্য যে শিক্ষা
ড. মো. ওবায়দুল ইসলামের জীবনকথার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা শুধু বিদেশের নামকরা প্রতিষ্ঠানে কাজ করা নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে বছরের পর বছর জ্ঞান অর্জন, গবেষণার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মানবস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা।
একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন যখন অধ্যবসায়, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তার সম্ভাবনা জন্মস্থানের সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারে। ড. মো. ওবায়দুল ইসলামের পথচলা সেই আশারই প্রতিচ্ছবি।
তাঁর গবেষণা আরও সমৃদ্ধ হোক, ক্যানসারসহ জটিল রোগের চিকিৎসায় নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে তাঁর প্রচেষ্টা সফল হোক—এই শুভকামনা।
মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০০২ ব্যাচের এই প্রাক্তন শিক্ষার্থীর আন্তর্জাতিক গবেষণাযাত্রা হোক আগামী প্রজন্মের স্বপ্ন, সাহস ও অধ্যবসায়ের অনুপ্রেরণা।