শিশুসাহিত্যের পথচলা অধিকতর সংবেদনশীল ও সূক্ষ্ম
এটি কেবল কিছু বর্ণ, শব্দ বা বাক্যের সমষ্টি নয়; বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ মনন ও কল্পনার আকাশ বিনির্মাণের প্রধান হাতিয়ার। সাহিত্যের অন্য যে কোনো শাখার চেয়ে শিশুসাহিত্যের পথচলা অধিকতর সংবেদনশীল ও সূক্ষ্ম।
বিশ্ব শিশুসাহিত্যের বিশাল ও বহুমাত্রিক ক্যানভাস যখন প্রযুক্তির বিস্তার, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং আধুনিক মনস্তত্ত্বের হাত ধরে প্রতিনিয়ত নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, তখন আমাদের দেশের শিশুসাহিত্য চর্চা কাঠামোগত ও সৃজনশীল দুর্বলতার ভেতর দিয়ে সময় পার করছে।
বিশ্বমঞ্চের গতিশীলতার সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের সাহিত্যিক আবেগ ও ঐতিহ্যগত শক্তি স্পষ্ট হলেও, আমাদের মৌলিক সীমাবদ্ধতাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের অগ্রগতির আড়ালে যে সীমাবদ্ধতা ও সংকটগুলো প্রকট হয়ে উঠেছে, তা একজন শিশুসাহিত্য অনুরাগীর দৃষ্টিতে খোলামেলাভাবে মূল্যায়ন করার ক্ষুদ্র প্রয়াসে এই লেখার অবতারণা।
বিশ্ব শিশুসাহিত্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে প্রতিনিয়ত নতুন আইডিয়া, থিম ও ফ্যান্টাসির বৈচিত্র্য আসছে। হ্যারি পটার থেকে শুরু করে সমসাময়িক বিশ্বসাহিত্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্ব উষ্ণায়ন, জলবায়ু শরণার্থী শিশু কিংবা আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা নিয়ে চমৎকার সব ফিকশন লেখা হচ্ছে।
অথচ আমাদের শিশুসাহিত্যের একটি বড় অংশে দেখা যায় গতানুগতিক ধারার পুনরাবৃত্তি। ঠাকুরমার ঝুলির রূপকথা, মামাবাড়ির গল্প বা গতানুগতিক ভূত-চৌকিদার জাতীয় রহস্য গল্পের বাইরে নতুন কোনো চিন্তার বিস্ফোরণ খুব একটা ঘটে না। লেখকেরা যেন সচেতনভাবেই নিরাপদ সীমানার ভেতরে বিচরণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক সৈয়দ শামসুল হক তাঁর সাহিত্যিক চিন্তায় বারবার একটি আক্ষেপ প্রকাশ করে গেছেন—বড়দের লেখার বেলায় লেখকেরা যতোটা সাহসী ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাপ্রেমী হন, শিশুদের লেখার বেলায় ততোটাই যেন ভীরু হয়ে পড়েন। শিশুদের অক্ষম বা অপরিপক্ব মনে করে তাদের জন্য একঘেয়ে ও চর্বিতচর্বণ গল্প উপহার দেওয়া আমাদের সাহিত্যের একটি দীর্ঘমেয়াদী দুর্বলতা।
বিশ্ব শিশুসাহিত্যের একটি প্রাণকেন্দ্র হলো এর লেখার সঙ্গে মিশে যাওয়া চোখ জুড়ানো মানসম্মত চিত্রাঙ্কন। বিশ্বমানের বইগুলোতে ইলাস্ট্রেশন কেবল অলংকরণ নয়, বরং গল্পের একটি অপরিহার্য দৃশ্যমান রূপ।
আমাদের দেশে কিছু ব্যতিক্রম বাদে শিশুতোষ বইগুলোতে বাজেট স্বল্পতা, ভালো ইলাস্ট্রেটরের অভাব এবং প্রকাশকদের পেশাদারিত্বের ঘাটতির কারণে বইগুলো অনেক সময় শিশুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়।
একটি শিশুর কল্পনার জগতকে রঙিন করে তোলার জন্য যে ধরনের ভিজ্যুয়াল বা গ্রাফিক মানের প্রয়োজন, তার স্পষ্ট অভাব আমাদের প্রকাশনা শিল্পে আজও রয়ে গেছে।
বইয়ের প্রচ্ছদ বা ভেতরের অলংকরণকে কেবল একটি 'আনুষঙ্গিক কাজ' হিসেবে দেখার মানসিকতা আমাদের শিশুসাহিত্যের বিকাশকে আটকে রেখেছে।
অনেক সময় আমাদের শিশুসাহিত্যগুলো শিশুদের আনন্দ দেওয়ার চেয়ে তাদের 'নৈতিক শিক্ষা' দেওয়ার একটি বাহন হয়ে দাঁড়ায়। লেখক বা অভিভাবকেরা প্রায়শই ভুলে যান যে, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া উপদেশ শিশুরা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে না।
বিশ্ব শিশুসাহিত্যে নৈতিকতা বা মূল্যবোধ গল্পের আড়ালে অত্যন্ত প্রচ্ছন্নভাবে থাকে, যা পাঠকের নিজের ভেতর থেকে উপলব্ধি তৈরি করে। বরেণ্য শিশুসংগঠক ও সাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খান (দাদা ভাই) তাঁর আজীবন কাজের অভিজ্ঞতা থেকে এই সত্যটি উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর ভাবনা অনুযায়ী, শিশুদের জোর করে ভালো মানুষ বানানোর চেষ্টা করা মানে তাদের চিন্তার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া।
শিশুসাহিত্য কখনো নীতিবাক্যের পাঠশালা হতে পারে না; এটি হলো আনন্দ, কৌতূহল ও আবিষ্কারের এক মুক্তোছড়া।' আমাদের অনেক রচনায় এই সূক্ষ্ম জায়গার ঘাটতি স্পষ্ট—শিক্ষামূলক হওয়ার অতিরিক্ত চাপে গল্পগুলো অনেক সময় নিরস ও বয়ানধর্মী হয়ে পড়ে।
বিশ্বের সেরা শিশুসাহিত্যগুলো খুব দ্রুত বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে বিশ্বমানের পাঠকদের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু আমাদের শিশুসাহিত্য কেবল দেশীয় সীমানার মাঝেই বন্দি। আমাদের মৌলিক ও মানসম্মত কিশোর সাহিত্যগুলো ইংরেজি বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষায় অনূদিত না হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর কোনো পরিচিতি নেই।
অন্যদিকে, বিদেশি ভালো বইগুলো বাংলায় অনুবাদের ক্ষেত্রেও মানসম্মত সম্পাদনা, মুন্সিয়ানা ও শৈল্পিক অনুবাদের বড় অভাব লক্ষ করা যায়।
আমাদের শিশুসাহিত্যের দুর্বলতাগুলোকে লজ্জা হিসেবে না দেখে বরং একটি আত্মশুদ্ধি ও পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখা উচিত। লেখকদের প্রচলিত ছক ভেঙে আরও সাহসী হতে হবে।
শিশুদের বুদ্ধিমত্তা ও কৌতূহলকে খাটো করে না দেখে তাদের সমকক্ষ হিসেবে মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। প্রকাশকদের এগিয়ে আসতে হবে মানসম্মত ইলাস্ট্রেশন এবং আন্তর্জাতিক মানের বই তৈরির মননশীল মানসিকতা নিয়ে।
তবেই আমাদের শিশুসাহিত্য গতানুগতিকতার গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বমানের সঙ্গে সত্যিকারের প্রতিযোগিতায় নামতে পারবে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ মননভূমি তৈরি করতে সক্ষম হবে।