ঢাকা,  বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

[ ফিচার ]

স্ট্যাচু অব লিবার্টি- আমেরিকার গণতান্ত্রিক আদর্শ ও বাস্তবতা

ডাঃ এম আর করিম রেজা
প্রকাশিত: ১৮:৫৪, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
স্ট্যাচু অব লিবার্টি- আমেরিকার গণতান্ত্রিক আদর্শ ও বাস্তবতা
স্ট্যাচু অব লিবার্টি  এখনও নিউইয়র্ক হারবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এর মাধ্যমে যে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের বার্তা দেওয়া হয়, তা শুধু বক্তৃতা কিংবা আনুষ্ঠানিক উদ্‌যাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না

১৮৮৬ সালের এই দিনে নিউইয়র্ক হারবারে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি বা স্বাধীনতার মূর্তি। ফ্রান্সের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে উপহার দেওয়া এই স্মৃতিস্তম্ভ ছিল দুই দেশের বন্ধুত্ব এবং স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রতি তাদের অঙ্গীকারের প্রতীক।

মূর্তিটি নির্মাণের অর্থ জুগিয়েছিল ফ্রান্স। অন্যদিকে, এর বিশাল ভিত্তি নির্মাণের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন আমেরিকানরা। সংবাদপত্রের প্রকাশক জোসেফ পুলিৎজারের উদ্যোগে শুরু হওয়া তহবিল সংগ্রহ অভিযানে এক লাখ বিশ হাজারেরও বেশি মানুষ অনুদান দেন। 

তাঁদের অনেকেই দিয়েছিলেন এক ডলারেরও কম অর্থ। এই উদ্যোগ দেখিয়েছিল, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সাধারণ মানুষও বড় কিছু অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারেন।

প্রথম দিকে মূর্তিটি ছিল চকচকে তামাটে রঙের। সময়ের সঙ্গে বাতাস ও আর্দ্রতার প্রভাবে এর গায়ে সবুজ আস্তরণ তৈরি হয়। প্রথম ১৬ বছর এটি বাতিঘর হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল। মূর্তিটির পায়ের কাছে ভাঙা শিকল ও বেড়ি নিপীড়ন থেকে মুক্তির প্রতীক। আর বাম হাতে ধরা ফলকে খোদাই করা রয়েছে আমেরিকার স্বাধীনতার তারিখ—৪ জুলাই, ১৭৭৬।

সমুদ্রপথে আমেরিকায় আসা লাখ লাখ অভিবাসীর কাছে এই মূর্তি হয়ে উঠেছিল নতুন জীবন, স্বাধীনতা ও উন্নত ভবিষ্যতের আশার প্রতীক। কবি এমা লাজারাসের *‘দ্য নিউ কলোসাস’* কবিতাটি ১৯০৩ সালে মূর্তিটির ভিত্তিতে স্থাপন করা হলে মানুষের মনে এর এই তাৎপর্য আরও গভীর হয়।

তবে আজ এই ঐতিহাসিক মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন জাগে—আমেরিকা কি সত্যিই সেই গণতান্ত্রিক আদর্শগুলো মেনে চলছে, যার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি?

আমেরিকায় রাজনৈতিক বিভাজন বৃদ্ধি, নাগরিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ এবং জনসাধারণের আস্থা কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো দেশটির গণতন্ত্রের সুস্থতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। 

তবে এসব সমস্যা কতটা গভীর এবং সময়ের সঙ্গে কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, তা বিচার করতে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি।

কোনো দেশের গণতান্ত্রিক শক্তি শুধু তার গৌরবময় ইতিহাস কিংবা প্রতীকী স্থাপনার ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য প্রয়োজন জবাবদিহিমূলক সরকার, আইনের শাসন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি  এখনও নিউইয়র্ক হারবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এর মাধ্যমে যে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের বার্তা দেওয়া হয়, তা শুধু বক্তৃতা কিংবা আনুষ্ঠানিক উদ্‌যাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বাস্তব জীবনেও সেই আদর্শের প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

গণতন্ত্র কোনো স্মৃতিস্তম্ভের মতো একবার তৈরি করেই রেখে দেওয়ার বিষয় নয়। এটি একটি জীবন্ত অঙ্গীকার, যা রক্ষা করতে হয় প্রতিটি প্রজন্মকে—কথায় নয়, কাজে।

লেখক : ডাঃ এম আর করিম রেজা, চিকিৎসক ও সমাজকর্মী।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!