ঢাকা,  শনিবার   ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

[ ফিচার ]

কাছের মানুষটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ফ্লাইং মাঙ্কি সিনড্রোম

নাজমীন মর্তুজা
প্রকাশিত: ১২:৫১, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
কাছের মানুষটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ফ্লাইং মাঙ্কি সিনড্রোম
আত্মমর্যাদা হারালে মানুষের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। পৃথিবীর সব সম্পর্ক, সব প্রাপ্তির ঊর্ধ্বে নিজের সম্মানটুকু ধরে রাখুন

মনস্তত্ত্বে ‘ফ্লাইং মাঙ্কি’ (Flying Monkey) বলে একটি ধারণা আছে। এটি এমন ব্যক্তিদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যারা কোনো ম্যানিপুলেটিভ বা আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তির হয়ে অন্যকে প্রভাবিত করে, তার পক্ষে কথা বলে, তার প্রচারিত বক্তব্য ছড়ায় কিংবা অন্যের ওপর মানসিক চাপ তৈরিতে সহযোগিতা করে। অনেক সময় তারা নিজেরাও বুঝতে পারে না, অন্য কারও কৌশলের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এদেরই আমাদের সমাজের প্রচলিত ভাষায় বলা হয় চুগলখোর ।

এরা নিজেরা সব সময় সামনে থাকে না, বরং কখনো এক পক্ষের কথা আরেক পক্ষের কাছে পৌঁছে দিয়ে, কখনো ভুল বোঝাবুঝি উসকে দিয়ে, কখনো দুপক্ষেই সুর মিলিয়ে নিজেদের খেলাটা চালিয়ে যায়। অনেকটা ডুগডুগির মতো, এপাশে একবার, ওপাশে আরেকবার! আশ্চর্যের বিষয়, আমরা সচেতন হয়েও অনেক সময় এদের কৌশলের ফাঁদে পড়ে যাই। কারণ, এরা সম্পর্কের ভেতরে বিশ্বাস অর্জন করে, আর সেই বিশ্বাসকেই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে।

Flying Monkey Syndrome সম্পর্কের আড়ালে অদৃশ্য এক ক্ষমতার খেলা আমাদের চারপাশে ‍যখন হাতধরে চলে । বহুদিন আগে এই বিষয়ের ওপর একটি লেখা পড়েছিলাম। লেখাটি বেশ মনে ধরেছিল। 

ইতিহাস থেকে পরিবার, বন্ধুত্ব থেকে কর্মক্ষেত্র, এমনকি সামাজিক সম্পর্কেও কিছু মানুষের ভূমিকা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। লেখাটি ভালো লেগেছিল বলেই আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম। হয়তো আপনাদের অনেকের জীবনেও এমন অভিজ্ঞতার সঙ্গে এর মিল খুঁজে পাবেন।

বুদ্ধিকে যত বেশি কাজে লাগাবেন, ততই শান্তির পথ খুঁজে পাবেন। বাকি চিত্তের যে কর্মফল, তা অন্য কেউ এসে কাটিয়ে দিতে পারে না নিজের কর্মফল নিজেকেই কাটাতে হয়। বুদ্ধিকে সমৃদ্ধ করার জন্য বই যথেষ্ট, কিন্তু বিবেক ও প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজন আত্মোপলব্ধি।

একজন মানুষ যখন যুক্তিকে উপেক্ষা করে মূর্খতাকে প্রাধান্য দেয়, তখন সে আবেগ, মানবিকতা কিংবা বুদ্ধি, কোনোটিরই যথাযথ প্রয়োগ করতে পারে না। মানুষ যখন হৃদয়ের অনুভূতি এবং মস্তিষ্কের বিবেচনাবোধ, দুটোকেই বিসর্জন দেয়, তখন তার আচরণ কখনো কখনো অমানবিক হয়ে ওঠে। 

আসলে বিষয়টি নতুন নয়, নতুন হয়েছে শুধু নাম আর উপস্থাপনার ধরন। যুগ যুগ ধরে মানুষ পরনিন্দা করেছে, কানকথা ছড়িয়েছে, এক পক্ষের কথা অন্য পক্ষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থে, কখনো অন্ধ আনুগত্যে, আবার কখনো নিজের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ না করেই। আজ সেই পুরোনো আচরণকেই মনস্তাত্ত্বিক পরিভাষায় নতুন করে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। 

তবে প্রত্যেক পরনিন্দাকারীই ফ্লাইং মাঙ্কি নয়, যেমন প্রত্যেক আত্মকেন্দ্রিক মানুষও নার্সিসিস্ট নন। এখানে মূল বিষয় হলো, কেউ কি জেনেশুনে কিংবা অন্ধ আনুগত্যের বশে অন্যের ম্যানিপুলেশনের অংশ হয়ে উঠছেন? তিনি কি সত্য যাচাই না করেই অন্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন? কারও ব্যক্তিগত বিরোধকে নিজের যুদ্ধ বানিয়ে ফেলছেন? 

সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়টি হলো, এই মানুষগুলো সব সময় আপনার শত্রুর পরিচয়ে আসে না। কখনো তারা বন্ধু, কখনো আত্মীয়, কখনো সহকর্মী, এমনকি আপনার অত্যন্ত কাছের মানুষও হতে পারে। তারা আপনার কাছে সহানুভূতির মুখোশ পরে আসে, আপনার কথা শোনে, তারপর সেই কথাকেই অন্যের হাতে অস্ত্র হিসেবে তুলে দেয়। আবার কখনো একজনের বক্তব্যকে বিকৃত করে অন্যজনের কাছে পৌঁছে দিয়ে সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করে।

তবে মনে রাখতে হবে, কাউকে সন্দেহ করলেই তিনিম্যানিপুলেটর হয়ে যান না। ব্যক্তির পরিচয়ের চেয়ে তার ধারাবাহিক আচরণ, উদ্দেশ্য, তথ্য বিকৃত করার প্রবণতা এবং নিজের কাজের দায় স্বীকার করার মানসিকতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের জটিল মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের সব সুতো উন্মোচন করা মানুষের পক্ষে সহজ নয়। অনেক সময় সত্যের চেয়ে প্রভাবশালী বয়ান বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, যুক্তির চেয়ে আনুগত্য বড় হয়ে দাঁড়ায়, আর বিবেকের চেয়ে ব্যক্তিগত পক্ষপাত শক্তিশালী হয়। 

ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস থাকুক, কিন্তু নিজের বিবেক ও বিচারবুদ্ধিকেও জাগ্রত রাখুন। কারণ অন্ধ বিশ্বাস যেমন মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে পারে, তেমনি অন্ধ অবিশ্বাসও সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তাই প্রশ্নটা শুধু এই নয় যে, আপনার আশপাশে কোনো ফ্লাইং মাঙ্কি আছে কি না। 

প্রশ্নটা হলো, আপনি নিজেই কখনো অন্য কারও প্ররোচনায়, সত্য যাচাই না করে, অজান্তে সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন না তো? নিজের বুদ্ধি ব্যবহার করুন, বিবেককে প্রশ্ন করতে দিন, আর অন্যের বিবাদে জড়ানোর আগে সত্যের দিকটা বোঝার চেষ্টা করুন। কারণ অন্যের হাতের পুতুল হয়ে ওঠার চেয়ে নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকা অনেক বেশি সম্মানের। জীবনে কোনো সম্পর্কই চিরস্থায়ী নয়। 

সময়ের সঙ্গে মানুষ বদলায়, বদলে যায় সম্পর্কের সমীকরণও। আজ যে আপনাকে ছাড়া চলতে পারে না, কাল সে নিজের প্রয়োজনে দূরে সরে যেতে পারে। তাই বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা কিংবা ভালোবাসা, কোনো সম্পর্কেই নিজের অস্তিত্বকে অন্যের ওপর নির্ভরশীল করবেন না। সম্পর্কে ভারসাম্য রাখুন, একা চলতে শিখুন, নিজেকে চিনুন, নিজের আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা অটুট রাখুন। মনে রাখবেন, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মমর্যাদা। 

এটা হারিয়ে কাউকে ধরে রাখার কোনো অর্থ নেই। Flying Monkey-রা খেলবে, এটাই তাদের অভ্যাস। কিন্তু আপনি কখনো তাদের খেলার উপকরণ হবেন না, তাদের পাজলের সমাধানযোগ্য কোনো টুকরোও নয়। নিজেকে এমন এক রহস্যে রাখুন, যা তারা চাইলেই ভেদ করতে পারবে না।মনে রাখবেন, সময়টা সহজ নয়। এখন লড়াই শুধু মানুষে মানুষে নয়, যন্ত্রের সঙ্গেও। তাই আবেগের চেয়ে সচেতনতা, প্রতিক্রিয়ার চেয়ে প্রজ্ঞা আর সম্পর্কের চেয়ে নিজের আত্মমর্যাদাকে বেশি গুরুত্ব দিন।

আত্মমর্যাদা হারালে মানুষের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। পৃথিবীর সব সম্পর্ক, সব প্রাপ্তির ঊর্ধ্বে নিজের সম্মানটুকু ধরে রাখুন। কারণ কাউকে ধরে রাখতে গিয়ে নিজেকেই হারিয়ে ফেলার চেয়ে একা থাকা অনেক বেশি সম্মানের। তাই এমন যেন না হয় যে,  নিজেকে নিয়ে ভাবতে হয় আমার পুরো জীবনটাই আসলে ভুল ছিল? এই সম্ভাবনাটি মৃত্যুর চেয়েও বেশি ভীতিজনক। ভুল হবে তবে ভুলেরও সীমাবদ্ধতা আছে ।

লেখক : নাজমীন মর্তুজা, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী কবি, গীতিকার, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!