ব্যাড টাচ
চুমাচুমির ক্যালানিতে অনেকেরই তো প্রতিক্রিয়া দেখলাম। আমার শৈশব কেটেছে মফস্বল শহরে, একদম নির্ভয়ে। অবাধ ঘোরাঘুরি আর খেলাধুলায় আমাদের সময় পার হতো।
বিকেল হলেই ছুটে যেতাম মাঠে। তখন আমি ক্লাস টু-এর ছাত্রী, পড়ি নড়াইল প্রাইমারী স্কুলে। বড় বোন বা মা—তখনও কেউ আমাকে শেখায়নি ‘ব্যাড টাচ’ কী জিনিস।
একদিন বিকেলে খেলা শেষে আমরা কয়েকজন পানি খেতে গেলাম টিউবওয়েলের পাড়ে। সেখানে লম্বা জুব্বা পরা একজন বিদেশী হুজুর তাঁর সঙ্গীসাথীদের নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি মূলত তাবলীগ করতে এসেছিলেন। হুজুর এবং গুরুজন দেখলে সালাম দিতে হবে—এতটুকু তো জানতাম। তাই এগিয়ে গিয়ে বললাম, "আসসালামু আলাইকুম।"
সালাম শুনে সেই বিদেশী হুজুর আমাকে কাছে ডাকলেন। আমি কাছে যেতেই তিনি আমার কপালে একটা চুমু দিলেন এবং বললেন—"মা, তুমি খুব ভাগ্যবতী মেয়ে। তুমি যেখানে যাবে, ঘর আলো করে রাখবে।"
আমি তখন আনন্দে বিমোহিত হয়ে বাসায় ফিরে মাকে ঘটনাটি বলি। আর ঠিক সেদিনই প্রথম জেনেছিলাম 'ব্যাড টাচ' আর 'গুড টাচ' কী। হয়তো সেই ভদ্রলোকের মনে কোনো খারাপ অভিসন্ধি ছিল না, সবার সামনেই আমাকে আদর করেছিলেন। কিন্তু ওই ঘটনার পর থেকে বাড়ির মানুষ আমাকে আর সেই মাঠে খেলতে যেতে দেয়নি।
ঠিক ওই সময়েই একবার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আমাদের স্কুলে এসেছিলেন হেলিকপ্টারে করে। স্কুলের নিয়ম অনুযায়ী এক আর দুই রোল নম্বরধারী শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব দেওয়া হলো ফুলের মালা দিয়ে তাঁকে বরণ করার। আমি মালা পরিয়ে দিতেই প্রেসিডেন্ট এরশাদ আদর করে আমার কপালে একটা চুমু দিলেন।
সেদিন সেটা ছিল কেবলই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার যে পরিস্থিতি, তাতে শিশু থেকে বৃদ্ধ—কেউই নিরাপদ নয়। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, একটা চুমু দেওয়া বা কোনো কথা বলার পেছনেই ‘ব্যাড টাচ’ বা খারাপ উদ্দেশ্য খোঁজা হয়।
তবে দিনশেষে একজন বাবার প্রতিক্রিয়াকে আমি ইতিবাচক দিক থেকেই দেখব। তিনি হুজুর হোন, আপন আত্মীয়-স্বজন হোন কিংবা স্কুলের শিক্ষক—কারও অধিকার নেই শিশুদের সাথে এমন কোনো শব্দ বা ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করার, কিংবা কোনো কন্যা শিশুকে এভাবে চুমু দেবার। আমাদের সন্তানদের সুরক্ষায় এই সচেতনতাটুকুর এখন বড্ড প্রয়োজন।