অন্ধ ও অন্য প্রাণীরাও কি স্বপ্ন দেখে?
স্বপ্ন সবাই আমরা কম বেশি দেখি। তবে আগে আমাদের জানা উচিত স্বপ্ন কি? আর মানুষ কেনইবা স্বপ্ন দেখে? এই সব প্রশ্নগুলো সবার মনে জাগে। এমন কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না যে কোনোদিনই স্বপ্ন দেখেনি।
এই স্বপ্ন নিয়ে বিজ্ঞানীদেরও মাথা ব্যথা রয়েছে। তাদের দাবি, যদি একজন মানুষ ৭০ বছর বাঁচে তাহলে তার মোট জীবনের প্রায় ৬ বছরই সে স্বপ্ন দেখে কাটায়। তার মানে নিশ্চয় তারা একটি গবেষণা করে এটা বের করেছে।
আমরা ভালো, মন্দ, ভয় ও আনন্দ সব রকমের স্বপ্নই দেখি। স্বপ্ন নিয়ে বিভিন্ন ধর্মে অনেক বর্ণনা আছে। এসবের ওপর হারহামেশা গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা। আর ব্যাখ্যা করে স্বপ্ন সম্পর্কে বিজ্ঞান অনেক তথ্যও দিয়েছেন। মূলত, স্বপ্ন হলো মানুষের অবচেতন মনে ঘুমের মধ্যে দেখা কিছু ঘটনা। যেগুলো দেখার সময় আমরা সেগুলোকে সত্যি বলে মনে করি। আমরা কেন স্বপ্ন দেখি? এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো উত্তর কারো জানা নেই। তবে বিভিন্ন সময় বিজ্ঞানীরা কিছু থিওরির মাধ্যমে স্বপ্নকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। তবে, স্বপ্ন নিয়ে বিজ্ঞানীরা যে শাখায় গবেষণা করেন তাকে অনাইরলজি নামকরণ করা হয়েছে।

সাইকোঅ্যানালিটিকাল থিওরি: মূলত স্বপ্ন নিয়ে থিওরির শেষ নেই। অনেকগুলো থিওরি আছে। এর মধ্যে একটি থিওরি হল সাইকোঅ্যানালিটিকাল থিওরি। প্রথমেই আলোচনা করা যাক এই থিওরির ব্যাপারে। বিজ্ঞানি সিগ্মুন্ড ফ্রয়েড এর মতে, স্বপ্ন হলো আমাদের অবদমিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এর দুটি অংশ থাকে একটি হল প্রকাশিত অংশ আর ওপরটি হল অন্তর্নিহিত অংশ।
প্রকাশিত অংশে সত্যিকারের ছবি, ভাবনা এসব থাকে। আর অপ্রকাশিত অংশে থাকে তার উল্টোটা। অর্থাৎ, এই অংশে থাকে স্বপ্নের মনস্তান্ত্রিক দিক।
আক্টিভেসন সিন্থিসিস মডেল: স্বপ্নের অনেকগুলো থিওরির মধ্যে আরেকটি থিওরি হলো আক্টিভেসন সিন্থিসিস মডেল। এটি মূলত আমাদের ঘুমের একটি পর্যায় আরইএম বা রোপিড আই মুভমেন্ট। এই পর্যায়ের স্বপ্ন দেখার সময় মস্তিষ্কের সেই অংশগুলো সচল হয়ে উঠে, যারা বিভিন্ন ধরনের আবেগ অনুভূতি আর স্মৃতির সঙ্গে জড়িত। আর মস্তিষ্কের এ অভ্যন্তরীণ সক্রিয়তার ফলেই সৃষ্টি হয় বিভিন্ন ধরনের সিগন্যাল, আর এই কারণে আমরা স্বপ্ন দেখি।
অর্থাৎ এই স্বপ্ন হল মস্তিষ্কের সিগন্যালের ফলাফল। যা আমাদের মস্তিষ্কে ঘুরবে, মোটামুটি তাই আমরা স্বপ্নে দেখতে পাব।
ইনফরমেশন প্রোসেসিং থিওরি: স্বপ্ন নিয়ে বিজ্ঞানীদের দেয়া অসংখ্য থিওরির মধ্যে আরেকটি থিওরি হল ইনফরমেশন প্রোসেসিং থিওরি। এই থিওরি সম্পর্কে তাদের ব্যাখ্যা, আমাদের মস্তিষ্ক সারাদিন যে সব তথ্য গ্রহণ করে রাতের বেলা ঘুমের সময় সে তথ্যগুলো প্রসেসিং করে মস্তিষ্ক। আর এই স্বপ্ন হলো সে তথ্য প্রসেসিং এর একটি অংশ। একটি মানুষ প্রতি রাতে তিন থেকে সাতটি স্বপ্ন দেখে। প্রতিটি স্বপ্ন কয়েক সেকেন্ড থেকে শুরু করে ত্রিশ মিনিট পর্যন্ত বলবৎ থাকে।

কিন্তু ঘুম থেকে উঠার পাঁচ মিনিটের ভেতরেই মানুষ এর ৫০ ভাগ ভুলে যায়। আর দশ মিনিটের ভেতরে ভুলে যায় ৯০ ভাগ। আর এই স্বপ্নে আমরা সেসব মানুষ বা জায়গার ছবি দেখি যা আমরা সচেতন বা অবচেতনভাবে আগে কখনো কোথাও দেখেছি। এই ব্যাখ্যা পড়ে হয়ত এখন পাঠকদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে কী অন্ধ মানুষরা স্বপ্ন দেখে না? হ্যাঁ! নিশ্চয়। অন্ধ মানুষরাও স্বপ্ন দেখে, এমন কি যারা জন্ম থেকে অন্ধ তারাও স্বপ্ন দেখে। কিন্তু তারাতো কোন জায়গা বা মানুষকে দেখেনি, তাহলে কীভাবে তারা এই স্বপ্ন দেখে। তাদের স্বপ্নে থাকে বিভিন্ন ধরনের শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ, স্বাদ এসব। এমনকি বিজ্ঞানীদের মতে, শুধু মানুষ নয় কুকুর বিড়াল হাতি বানরসহ সব রকম প্রাণীই স্বপ্ন দেখে।
স্বপ্নের ওপরে আমাদের সাধারণত কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আমরা চাইলে কোন কিছু নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারি না আবার চাইলে কোন কিছুকে না দেখতে রুখাতেও পারি না। যেমন, আপনি স্বপ্নের মধ্যে দেখছেন যে আপনাকে কেউ তাড়া করছে আর আপনি প্রাণপণে দৌড়ানোর চেষ্টা করছেন কিন্তু হাত পা নড়াতে পারছেন না। অনেক সময় মানুষ এটাকে বোবা ধরা বলে থাকে। তবে এটাও স্বপ্ন। হয়ত আদিযুগ থেকে শুনে আসছেন, এটা বোবা ধরা, তাই এখনো সেটাই বলছেন।

মূলত স্বপ্ন কখনো কোনো নিয়ম-নীতি বা যুক্তি মেনে আসে না, স্বপ্ন আমাদের ঘুমের মধ্যে অবচেতন মন, তার ইচ্ছা হয় বলে আমাদের স্বপ্ন দেখতে হয়। মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কোরটেক্স যা আমাদের যুক্তি বিবেচনা বোধকে নিয়ন্ত্রণ করে তা ঘুমের সময় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। অনেক সময় মানুষ বুঝতে পারে যে সে স্বপ্ন দেখছে আবার মাঝে মাঝে সে চাইলেও তার সপ্নের ঘটনা প্রবাহকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এ ধরনের স্বপ্নকে বলা হয় লুসিক ড্রিম। মূলত স্বপ্ন দেখতে না চাইলেও দেখতে হয়। কারণ, এটা পুরোপুরি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এতে মানুষের কোনো হাত নেই।
ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই