ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ শিল্প ও সাহিত্য ]
মূলঃ  আলবেয়ার কামু

দ্য প্লেগ (৭ম পর্ব)

অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
প্রকাশিত: ১৮:২২, ১৩ মে ২০২১
দ্য প্লেগ (৭ম পর্ব)
ছবি: সংগৃহীত

আসলে শহরের নাগরিকদের মত রিও নিজেও খুবই অবাক হয়েছিল এই রোগের আগমনে। এটা আমরা তার ইতস্ততভাবে থেকে বুঝতে পারি। সারাক্ষণ সে সংশয় ও আত্মবিশ্বাসের দোলাচলে দুলছিল। অনেকটা যুদ্ধ শুরুর সময়ের মতো। যুদ্ধ শুরু হলে মানুষেরা ভাবে যুদ্ধ খুবই নির্বুদ্ধিতার কাজ; এটা কখনই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কিন্তু তাদের ভাবনা কখনোই যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে না। একই কথা প্রযোজ্য নির্বুদ্ধিতার ক্ষেত্রে। যুদ্ধের মতো নির্বুদ্ধিতারও চলার নিজস্ব পথ রয়েছে। এটা বোঝা সম্ভব, যখন মানুষেরা তাদের আত্মকেন্দ্রিকতা হতে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। কিন্তু এই শহরের মানুষেরা এতকাল নিজেদেরকে নিয়েই মগ্ন ছিল। সুতরাং তারা মহামারির আগমনকে বিশ্বাস করতে পারলো না। 

বাস্তবেও মহামারি মানুষের অনুধাবনযোগ্য কোনো বিষয় নয়। সেকারণেই আমরা বলে থাকি যে, মহামারি বলে কিছু নেই। ওটা মনের ধোঁকাবাজি মাত্র। মনে করি যে, ওটা একটা দুঃস্বপ্ন যা দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা চলে যায় না। বরং আমাদেরকে এক দুঃস্বপ্ন থেকে অন্য দুঃস্বপ্নে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। ওটার উপস্থিতি শুধু বুঝতে পারে সেই সকল মানুষেরাই, যারা পূর্বসতর্কতা গ্রহণ না করার কারণে মরে যায়। সুতরাং বুঝতে না পারার কারণে শহরের নাগরিকদেরকে আমরা বেশি দোষ দিতে পারি না। স্বাভাবিকভাবেই তাদের ভেতরে চিন্তাশীলতা কাজ করেনি। সেকারণেই তারা ধরে নিয়েছিল যে, এই শহরে মহামারির আগমন একটি অসম্ভব ব্যাপার। তারা তাদের ব্যবসা ও ভ্রমণ নিয়েই ব্যস্ত ছিল এবং বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মতাদর্শ অনুযায়ী চিন্তাভাবনা করছিল। প্লেগের মতো সিরিয়াস বিষয় নিয়ে তারা চিন্তা করতে সক্ষম ছিল না। ফলে নিজেদেরকে তারা মনে করেছিল মুক্ত মানুষ। অথচ মহামারির উপস্থিতিতে মুক্ত বা স্বাধীন বলে কোনো কিছুরই অস্তিত্ব থাকতে পারে না।

এমনকি রিও যখন তার সঙ্গীদেরকে বলেছিল যে, শহরের বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন মানুষ প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে, তখনও তারা সমূহ বিপদ বুঝতে পারেনি। তাদের কাছে মনে হয়েছিল যে, ডাক্তার হিসেবে সাধারণ মানুষের চেয়ে কিছুটা ভিন্নতর কল্পনা শক্তির অধিকারী হবার কারণেই রিও এই অদ্ভুত চিন্তা করছে। 

এইরকম একটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় রিও তার কক্ষের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তা করছিল সংশয় ও অস্পষ্ট অস্বস্তি নিয়ে। তার পূর্বপাঠ থেকে রোমন্থন করার চেষ্টা করছিল রোগটি সম্পর্কে। এক সময়ে সে মনে করতে সক্ষম হলো ইতিহাসে ঘটে যাওয়া প্রায় ত্রিশটি বা তার চেয়েও বেশি সংখ্যক প্লেগের কথা। এগুলোর কারণে পৃথিবীতে একশত মিলিয়নেরও অধিক সংখ্যক মানুষ মারা গিয়েছিল।

রিও ভাবতে চেষ্টা করলো এক’শ মিলিয়ন মৃত্যু বলতে আমরা আসলে কি বুঝে থাকি? যুদ্ধক্ষেত্রে যোদ্ধারা লাশ কি সেটাই ভুলে যায়। স্বচক্ষে না দেখে থাকলে লাশ শব্দটিও তার কাছে অলীক বলে মনে হয়। সুতরাং ইতিহাসে লিপিবদ্ধ এক’শ মিলিয়ন লাশ আমাদের কল্পনায় বেশি গুরুত্ব বহন করে না। এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দেয়া ধুঁয়ার তুলনায়। সে কনস্টান্টিনোপলের মহামারি সম্পর্কে স্মরণ করার চেষ্টা করল। ঐতিহাসিক প্রোকোপিয়াসের (Procopius) দেয়া তথ্য অনুযায়ী এই মহামারির সময়ে প্রতিদিন দশ হাজার মানুষের মৃত্যু হতো। দশ হাজার লাশ বলতে কি বোঝায় তা সে অনুধাবন করার চেষ্টা করলো। ধরে নিলো এই সংখ্যা বড় ধরণের একটা সিনেমাহলের দর্শক সংখ্যার পাঁচগুণ। অর্থাৎ যদি পাঁচটি সিনেমাহলের দর্শকদেরকে একত্রিত করে নগরকেন্দ্রের মাঠে নিয়ে হত্যা করে স্তূপ করে রাখা হয়, তাহলে হয়তো কেউ সংখ্যা সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা অর্জন করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে কি তা সম্ভব? কোনো মানুষের পক্ষেই কি দশ হাজার মানুষকে একত্রিত করা সম্ভব? সুতরাং সে সিদ্ধান্তে আসলো যে, প্রোকোপিয়াসের মত প্রাচীন ঐতিহাসিকদের দেয়া তথ্য নির্ভরযোগ্য হতে পারে না। সেটা ছিল তার দেয়া সাধারণ ধারণা মাত্র। 

এরপর সে মাত্র ৭০ বছর পূর্বের ক্যানটনের প্লেগের কথা ভাবলো। সেখানকার অধিবাসীদের ভেতরে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আগেই ৪০ হাজার ইঁদুর প্লেগে মারা গিয়েছিল। এখানেও মৃত ইঁদুরদের সংখ্যা গণনা করার কোনো নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি ছিল না। ফলে ভুলের একটা প্রশস্ত মার্জিন রেখেই অনুমান করা হয়েছিল। ‘যদি একটা ইঁদুরের দৈর্ঘ্য ১০ ইঞ্চি হয়, তাহলে চল্লিশ হাজার ইঁদুরকে যদি আমরা একটার পর একটা স্থাপন করি, তাহলে তা কত দীর্ঘ হবে?’

দ্রুত রিও নিজেকে নিরস্ত করল। নিজের কল্পনাশক্তিকে নিয়ে কৌতুক করার কোনো ইচ্ছেই তার হলো না। সে বুঝতে পারলো যে, সীমিত সংখ্যক মৃত্যুর ঘটনা মহামারির সৃষ্টি করে না। এগুলো অতিরিক্ত কিছু সতর্কতা গ্রহণের অনুভব সৃষ্টি  করতে পারে। সুতরাং সে মৃতের সংখ্যার পরিবর্তে পর্যবেক্ষিত কেসসমূহের লক্ষণ যেমন, শারীরিক অসাড়তা, শয্যাশায়ী হওয়া, যৌন রোগ বা বাগী (buboes) রোগে আক্রান্ত হওয়া, প্রচণ্ড রকমের পিপাসা পাওয়া, প্রলাপ বকা, শরীরে কাল ফুসকুড়ি উঠা, আভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রসারণ (dilatation) ইত্যাদি বিষয়ে মনোনিবেশ করলো। স্মৃতি থেকে সে মনে করতে পারলো যে, মেডিক্যাল হ্যান্ডবুকে প্লেগের লক্ষণ হিসেবে নিম্নরূপ লিপিবদ্ধ রয়েছে, ‘নাড়ির স্পন্দন উঠানামা করা বা অনিয়মিত ও ভুল হওয়া, সামান্যতম নড়াচড়ার কারণে রোগীর মৃত্যুমুখে পতিত হওয়া।’

রিও অনুভব করলো যে, এই রোগে প্রতিটি রোগীর জীবন ঝুলে থাকে সুতার উপরে। একটু এদিক-সেদিক হলেই মৃত্যু অবধারিত হয়ে পড়ে। তার দেখা রোগীদের মধ্যে প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজনই (সে সঠিক সংখ্যাটিই মনে করতে পারল) এভাবে মৃত্যুবরণ করেছে। বিষয়টি তার কাছে প্রচণ্ড রকমের ভীতিকর বলে মনে হল। সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। বাইরে শান্ত আলো ছড়াচ্ছিল বসন্তের আকাশ। কিন্তু তার কক্ষের ভেতরে একটা শব্দই ঘুরপাক খাচ্ছিল, ‘প্লেগ’। এই শব্দ তার মনকে আচ্ছাদিত করে রাখার সমান্তরালে দৃষ্টির সামনে অবস্থিত ধূসর ও হলুদ রঙের শহরের উপরেও একটা কাল্পনিক প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল। তবে শহরকে তখনও আপাতভাবে মনে হচ্ছিল কর্মব্যস্ত ও সুখী, যা তার নৈমিত্তিক ও চিন্তাহীন শান্ততা দিয়ে প্লেগের পুরনো সকল ছবিগুলোকে ভুল প্রমাণিত করছে। 

রিও’র স্মৃতিতে দৃশ্যপটগুলো ভেসে আসতে লাগলো। এথেন্স, মৃত ব্যক্তিদের অস্থি রাখার স্থানে পরিণত হয়েছিল। পাখিরাও চলে গিয়েছিল। চীনদেশের শহরগুলো পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল নীরব বেদনার্ত মানুষদের দিয়ে। মারসেইলি শহরের আসামিরা মৃতদেহগুলোকে স্তূপ করে রাখছিল। Provence এর গ্রেট ওয়ালের ইমারতগুলো প্রবল প্লেগ-বায়ুকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছিল। কনস্টান্টিনোপলের কুষ্ঠরোগীদের কুঠুরিগুলোতে আর্দ্র, পচনশীল তৃণশয্যাগুলো কাদার মেঝেতে ডুবে যাচ্ছিল। বিছানা থেকে আংটা দিয়ে রোগীদেরকে উপরে তুলে ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছিল। ইংল্যান্ডের ব্ল্যাক ডেথ (Black Death) এর সময়ে মাস্ক পরিহিত ডাক্তাররা উৎসব করছিল। মিলানের সমাধিক্ষেত্রে নারী-পুরুষেরা মেতে উঠেছিল অবাধ যৌনসংগমে। লন্ডনের অলিতে-গলিতে ছড়িয়েছিল স্তূপীকৃত গলিত লাশ। প্রতিটি স্থানই মানুষের নিরন্তর কান্নার জায়গায় পরিণত হয়েছিল।

তবে এই বিভীষিকাগুলোর কোনটিরই ধারে-পাশে ছিল না উড়ানের বসন্তের সেই বিকেল। অদৃশ্য গাড়ির হুইসেলের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সেটা ভবিষ্যৎ কোনো নিষ্ঠুরতা ও বেদনার সম্ভাবনাকে অস্বীকার করছিল। শুধু বাড়িগুলোর পেছনে সাগরের মর্মর-ধ্বনি জানান দিচ্ছিল পার্থিব অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার।
রিও’র মনের ভেতরে ভেসে উঠল এথেন্সবাসীর জ্বালানো প্লেগ-আগুনের (plague-fires) কথা, যা লুক্রেটাস ( Lucretius) বলে গেছেন। রাতের অন্ধকারে মৃতদেরকে আনা হয়েছিল। কিন্তু রাখার কোন জায়গা হচ্ছিল না। ফলে জীবিতরা টর্চের আলোতে পরস্পরের সাথে মারামারি করছিল। নিজেদের প্রিয়জনদের জন্যে সমাধির জন্যে জায়গা দখল করতে। শেষ পর্যন্ত তারা নিজেরাই রক্তাক্ত হয়েছিল।

রিও’র চোখের সামনে আরেকটা একটা দৃশ্য ভেসে উঠল। সেটা বর্তমানের। চিতার লালচে আভা প্রতিফলিত হচ্ছে অন্ধকার ঘুমন্ত সাগরের উপরে। যুদ্ধরত টর্চগুলো আগুনের স্ফুলিঙ্গ তৈরি করছে। ঘন পূতিগন্ধময় ধুঁয়া উড়ে যাচ্ছে বিনিদ্র আকাশের দিকে। অমঙ্গলের অশনিসংকেত দোদুল্যমান হয়ে কার্যকারণ ক্ষমতাকে ক্রমশ গ্রাস করছে। প্লেগ শব্দটি উচ্চারিত হবার মুহূর্ত হতেই এক বা একাধিক ব্যক্তি তাৎক্ষণিকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে।
  
তারপরেও সেটাকে থামানো সম্ভব ছিল। যদি তার বাইরে থেকে আসা এই অস্তিত্বকে আমরা স্বীকার করে নিতাম এবং আমাদের করণীয় করতাম। কারণ শুধুমাত্র তাহলেই জানতে পারতাম যে, সেটা আসলেই কী ছিল। একে ঠেকানোর জন্যে কী ধরণের পদক্ষেপ আমাদের গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমরা সকলেই ভুলের ভেতরে ডুবে ছিলাম। ধরেই নিয়েছিলাম যে, মহামারি বলে কোনো কিছু কখনই আমাদেরকে আক্রমণ করবে না। রিও জানালা খুলতেই তাৎক্ষণিকভাবে নগরের শব্দ উচ্চকিত হলো। পার্শ্ববর্তী কোনো কাঠ চেরাইয়ের কল থেকে হিসহিস শব্দ শোনা গেল। সংক্ষিপ্ত, কিন্তু অবিরাম।

প্রতিদিনকার মত রোগীদের দেখতে যাওয়ার জন্যে রিও উঠে দাঁড়াল। এই একটা মাত্র কাজের ভেতরেই সে সকল সময়ে অনাবিল শান্তি ও আসল স্বস্তি খুঁজে পায়। অন্য সকল কাজকেই তুচ্ছ বলে মনে হয়। সুতরাং অযথা সময় ব্যয় না করে নিজের কাজগুলোকে যথাযথভাবে করতেই সে মনঃস্থির করল।

দ্য প্লেগ (প্রথম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বিতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (তৃতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (চতুর্থ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চম পর্ব)

দ্য প্লেগ (ষষ্ঠ পর্ব)

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!