দ্য প্লেগ (ষষ্ঠ পর্ব)

ঢাকা, শনিবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ২০ ১৪২৮,   ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৩

দ্য প্লেগ (ষষ্ঠ পর্ব)

মূলঃ  আলবেয়ার কামু

অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৩৯ ৬ মে ২০২১   আপডেট: ১৩:৪৭ ৬ মে ২০২১

দ্য প্লেগ

দ্য প্লেগ

ত্যারু’র ডাইরিতে ডাক্তার রিও সম্পর্কে কিছু বর্ণনা দেয়া ছিল। সেগুলো ছিল যথেষ্টই  নির্ভুল ও সঠিক। 

“ডাক্তার রিও। বয়স প্রায় ৩৫ বছর। উচ্চতা মধ্যম। প্রসারিত কাঁধ। প্রায় চারকোনা মুখ। চোখদুটো স্থির ও গভীর। চোয়াল দুটো একটু উচ্চকিত। একটু বড় কিন্তু সুন্দর নাক। ছোট ছোট করে ছাঁটা কাল চুল। সামান্য বাঁকা   মুখ। পরস্পরের সাথে শক্তভাবে এঁটে থাকা ভারী দুটো ঠোঁট। গায়ের রঙ তামাটে। বাহুর উপরে ঝুলে থাকা ঘন কাল আস্তিন। সব মিলিয়ে তাকে সিসিলিয়ান কৃষক বলে মনে হয়।’’

“দ্রুত গতিতে হাঁটে। রাস্তায় চলার সময়ে পা ফুটপাথের বাইরে চলে যায়। নিজের অজান্তেই এবং গতি না বাড়ালেও। তবে প্রতি তিনবারে দুইবার সে ছোট্ট লাফ দিয়ে ফুটপাথে ফিরে আসে। কিছুটা আনমনা স্বভাবের। গাড়ি রাস্তার মোড় পেরিয়ে যাবার পরও প্রায়ই সাইড-সিগন্যাল অন করে রাখে। মাথায় কিছু পরে না। তাকে দেখতে একজন যথেষ্ট জ্ঞানী মানুষ বলেই মনে হয়।’’

ত্যারু’র বর্ণনা সঠিক ছিল। ডাক্তার রিও শুধু ঘটনার মোড়গুলো সম্পর্কেই সচেতন ছিল। অন্যকিছু সম্পর্কে নয়।

দ্বার রক্ষীর দেহ সৎকারের পর রিও রিচার্ডকে টেলিফোন করে চাইলো কুঁচকি-জ্বরের কেইসগুলো  সম্পর্কে সে  আর কিছু জানতে পেরেছে কিনা। 

“না, এখনো কিছুই জানতে পারিনি,” রিচার্ড বললো। “দুটো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। একটা গত দুইদিনে। অন্যটা তার আগের তিনদিনে। পরের রোগীটা ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছে বলে আমার মনে হয়েছিল। আমি তাকে দেখতে গিয়েছিলাম।’’

“আর কোন নতুন কেইস আসলে আমাকে অনুগ্রহ করে জানাবে,” রিও বলল। 

সে অন্য কয়েকজন সহকর্মীকেও টেলিফোন করলো। অনুসন্ধানগুলো থেকে সে জানতে পারলো যে, বিগত কয়েকদিনে প্রায় ২০টি একই ধরনের কেইস পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু সবগুলো রোগীই মরে গেছে। রিও তখন রিচার্ডকে (সে স্থানীয় মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ছিল।) অনুরোধ করল পরবর্তীতে নতুন আসা  কেসগুলোকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে প্রেরণ করার জন্যে। 

“দুঃখিত,” রিচার্ড বলল,” এ বিষয়ে আমার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। নগর প্রধান এ বিষয়ে আদেশ জারী না করলে করা যাবে না। তবে তুমি কিসের উপরে ভিত্তি করে সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছ যে, এই রোগীদের হতে সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে?” 

“নির্দিষ্ট কোন ভিত্তি নেই। তবে লক্ষণগুলোকে আমার কাছে আসলেই ভীতিকর বলে মনে হচ্ছে।’’

যাই হোক, রিচার্ড তাকে পুনরায় জানালো যে, রোগীদেরকে আইসলেশন ওয়ার্ডে পাঠানোর ক্ষমতা তার নেই। সে শুধু বিষয়টিকে নগর প্রধানের কাছে উপস্থাপন করতে পারে। 

এই ধরণের কথাবার্তা চলার সময়ে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে মোড় নিল। মিশেলের মৃত্যুর পরদিন আকাশে মেঘ করল। কয়েকবার কম সময়ের জন্যে প্রবল বৃষ্টি হল। প্রতিবার বৃষ্টির পরই কয়েক ঘন্টার জন্যে তাপমাত্রা বেড়ে বেড়ে গেলো। কুয়াশাচ্ছন্ন আর্দ্রতার সৃষ্টি হলো। সাগরের পরিবেশও বদলে গেলো। আকাশের গাঢ়-নীল স্বচ্ছতা উবে গেলো। পরিবর্তে নীচু হয়ে আসা আকাশে ইস্পাতের মত রূপালী আলোর ঝলকানি দেখা যেতে লাগলো। এগুলোর দিকে তাকিয়ে সবার চোখ জ্বলতে লাগলো। বসন্তের আর্দ্র তাপ সবার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠলো। এবং সবাই অপেক্ষা করতে লাগলো শুষ্ক ও পরিষ্কার গ্রীষ্মের উষ্ণতার জন্যে। 

এক ধরনের উদাসীনতা সাপের মত এঁকে-বেঁকে মালভূমির উপরে অবস্থিত শহরের উপরে নেমে আসলো। শহরটির চারদিক সাগর দিয়ে ঘেরা ছিল। ফলে সাদা চুনকাম করা দেয়ালবেষ্টিত শহরের ধুলাচ্ছন্ন দোকানের সারির মধ্য দিয়ে হাঁটাহাঁটি বা গাড়ি চালানোর সময়ে নাগরিকদের কাছে মনে হতে লাগলো যে, তারা বন্দী হয়ে আছে। নগরের জলবায়ু দিয়ে। অবশ্য রিও’র সেই বৃদ্ধ রোগীর ক্ষেত্রে এটা সত্য ছিল না। সে এই প্রখর  আবহাওয়াকে স্বাগতম জানালো। “এই আবহাওয়া আমাদেরকে উত্তপ্ত ও সিদ্ধ করলেও এজমা রোগীদের জন্যে  খারাপ নয়,“ সে বললো। তবে বাস্তবে ওটা এজমা রোগীদের অনুকূলতা দিয়ে সিদ্ধ করলো না। সেটা আমাদেরকে সিদ্ধ করলো জ্বর যেরকম করে রোগীকে সিদ্ধ করে, তেমন করে। পুরো শহর জ্বরাক্রান্ত হয়ে গেলো। অন্তত রিও’র কাছে তাই মনে হলো।

‘ফাইদহার্বে’ সড়ক দিয়ে তদন্তের জন্যে গাড়ি চালিয়ে যাবার সময়ে সে অনুভব করতে পারলো কটার্ড কেন আত্নহত্যা করার চেষ্টা করেছিল। অবশ্য একইসাথে এই ধরণের ভাবনাকে তার নিকটে অযৌক্তিক বলেও মনে হলো এবং  সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, তার এই ধরণের ভাবনার জন্যে নিজের স্নায়বিক ক্লান্তিই দায়ী। অন্যকিছু নয়। সেই মূহূর্তগুলোতে সে আসলেই খুব উদ্বিগ্ন হয়ে গিয়েছিল এবং নিজের স্নায়ুর উপরে নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করা তার জন্যে খুবই জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

কটার্ডের বাসস্থানে পৌঁছে সে দেখতে পেলো যে,  পুলিশ ইন্সপেক্টর তখনও আসেনি। গ্র্যান্ডের সাথে প্রথমে দেখা  হলো। সে তাকে পরামর্শ দিল দরজা খোলা রেখে অপেক্ষা করার জন্যে। মিউনিসিপ্যাল করণিক কটার্ডের দুটো কক্ষ ছিল। দুটোই ছিল কম আসবাবপত্র দিয়ে সজ্জিত। চোখে পড়ার মত একটা জিনিসই ছিল সেখানে। একটা বুকশেলফ। সেটিতে দুই তিনটা অভিধান রাখা ছিল। কক্ষে ছিল একটা ছোট্ট ব্ল্যাকবোর্ড। এতে অর্ধেক মুছে যাওয়া দুটো শব্দ লেখা ছিলঃ ‘পুষ্পিত পথ’।

গ্র্যান্ড জানালো যে, কটার্ড রাতে ঠিক ঘুমিয়েছিল। তবে সকালে ঘুম থেকে উঠেছে মাথাব্যাথা নিয়ে। এছাড়াও খুবই দুর্বল অনুভব করছে সে। রিও দেখলো  গ্র্যান্ডকেও দেখতেও ক্লান্ত ও অবসন্ন মনে হচ্ছে। সে কক্ষের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে পায়চারি করছে এবং টেবিলের উপরে রাখা হস্তাক্ষরে লেখা কটার্ডের পোর্টফোলিওটি বার বার নেড়েচেড়ে দেখছে। 

রিও’কে সে জানাল যে, কটার্ড সম্পর্কে সে আসলেই খুব কম জানত। কটার্ড হলো অনেকটা অদ্ভুত পাখির মতো। অনেকদিন পর্যন্ত তাদের সম্পর্ক সিঁড়িতে দেখা হবার সময়ে পারস্পারিক অভিবাদন বিনিময়ের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। 

“তার সাথে আমার মাত্র দুইবার আলাপচারিতা হয়েছিল। কয়েকদিন পূর্বে সিঁড়ির সামনে আমার হাত থেকে একটা চকের বাক্স পড়ে গিয়েছিল। লাল ও নীল রঙের চকের বাক্স। কটার্ড তার কক্ষ হতে বেরিয়ে এসে আমাকে সেগুলো তুলতে সাহায্য করেছিল। এমনকি সে আমাকে রঙিন চক নিয়ে আসার কারণ জিজ্ঞেস করেছিল।’’

গ্র্যান্ড রিওকে ব্যাখ্যা করেছিল যে, ল্যাটিন ভাষার জ্ঞানকে ঘষেমেজে উজ্জ্বল করার চেষ্টা করছে সে। কারণ, স্কুলে সে যে ল্যাটিন ভাষা শিখেছিল, তা স্মৃতিতে অস্পষ্ট হয়ে এসেছে।  

“দেখ, ডাক্তার, আমাকে বলা হয়েছিল যে, ল্যাটিন ভাষার চর্চা ফরাসী শব্দের অর্থকে সত্যিকারভাবে বুঝতে সাহায্য করে।’’

একারণেই সে ল্যাটিন শব্দকে ব্ল্যাকবোর্ডের উপরে বার বার নীল চক দিয়ে লিখত। সেগুলোর ধাতু ও শব্দরূপ নিরীক্ষা করে দেখত। শেষে লাল চক দিয়ে সে লিখে রাখত শব্দের সেই অংশ, যাতে সে ভুলে না যায়।  

“আমি জানি না কটার্ড আমার এই বিষয়টি অনুসরণ করেছিল কিনা। তবে তাকে আমার এ বিষয়ে আগ্রহী বলে মনে হয়েছিল। একদিন সে আমাকে অবাক করে দিয়ে একটা লাল চক চেয়েছিল। আমি আসলেই ধারণা করতে পারিনি চক দিয়ে সে কি করতে চেয়েছিল।’’

রিও তাকে তাদের দ্বিতীয় আলাপচারিতার বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইল। কিন্তু এই সময়েই একজন করণিক সহ ইন্সপেক্টর চলে এলেন এবং জানালেন যে, গ্র্যান্ডের সাক্ষ্য দিয়ে তিনি শুনানির কাজ শুরু করতে চান।

ডাক্তার খেয়াল করল যে, কটার্ড সম্পর্কে কথা বলার সময়ে গ্র্যান্ড বার-বার তাকে ‘দুর্ভাগ্যবান মানুষ’ হিসেবে অভিহিত করছে। এমনকি ‘তার মারাত্মক সিদ্ধান্ত’ এই ধরণের শব্দগুলোও ব্যবহার করছে। কটার্ডের আত্নহত্যার চেষ্টার উদ্দেশ্য কি হতে পারে, সে সম্পর্কে বলার সময়ে রিও লক্ষ্য করল যে, গ্র্যান্ড কথা খুঁজে পাচ্ছে না। শব্দের সল্পতায় ভুগছে। অবশেষে ‘একটি গোপন ব্যাথা’ এই শব্দটি দিয়ে ভাব প্রকাশ করতে সমর্থ হল।

ইন্সপেক্টর তাকে জিজ্ঞেস করলেন কটার্ডের আচরণে সে এমনকিছু খেয়াল করেছে কিনা যা থেকে তার আত্নহত্যার ইচ্ছা প্রকাশিত হয়। 
“গতকাল সে আমার দরজায় টোকা দিয়ে এক বক্স দিয়াশলাই চেয়েছিল। আমি তাকে দিতেই সে আমাকে বলেছিল যে, আমাকে বিরক্ত করার জন্যে সে দুঃখিত। কিন্তু যেহেতু আমরা প্রতিবেশী সেহেতু সে মনে করে যে, আমি কিছুই মনে করব না। দিয়াশলাই এর বক্সটা ফিরিয়ে দেবে বলেও জানিয়েছিল। তবে আমি তাকে সেটা তার কাছেই রেখে দিতে বলেছিলাম।’’

ইন্সপেক্টর গ্র্যান্ডকে জিজ্ঞেস করলেন, কটার্ডের কোন আচরণ তার কাছে অদ্ভুত বলে মনে হয়েছে কিনা।

“তাকে দেখলে আমার সবসময়ে মনে হয় যে, সে কিছু একটা বলতে চাচ্ছে। তবে সম্ভবত আমি ব্যস্ত থাকার কারণে সে তার কথাগুলো বলতে পারেনি।“ এরপর নিজের ব্যস্ততার বিষয়ে গ্র্যান্ড রিও’র দিকে ফিরে লজ্জার সাথে বলল, “কিছু ব্যক্তিগত ধরণের কাজ করছিলাম আমি।’’

ইন্সপেক্টর বললেন যে, তিনি অসুস্থ লোকটির সাথে দেখা করতে চান। এবং তার কাছ থেকে তার ভাষ্য শুনতে চান। রিও নিজেও ভাবছিলো যে কটার্ডকে এখন নিয়ে আসা উচিৎ। কটার্ড ঘরে আসতেই রিও দেখতে পেল সে একটা বাদামী ফ্লানেল কাপড়ের নাইটশার্ট পরে আছে। তার মুখে একটি ভীত-সন্ত্রস্ত ভাব।  

“ইনি কি পুলিশ?”

“হ্যা,” রিও বলল। “তবে ভয় পাবার কিছু নেই। কয়েকটা ফর্মালিটি সম্পন্ন করতে হবে আমাদেরকে। তারপর তুমি তোমার কক্ষে ফিরে যাবে।“ 

কটার্ড জানাল যে, এর কোনই প্রয়োজনই ছিল না। এটাও বললো যে, পুলিশের উপস্থিতিকে সে পছন্দ করেনি।  তার কথায় রিও কিছুটা বিরক্তি হলো। 

“আমিও তাদেরকে খুব বেশী পছন্দ করি না। তবে তোমাকে সংক্ষেপে তার কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।  সঠিকভাবে। আর কিছু নয়।’’

কটার্ড কিছু বলল না। রিও দরজার দিকে এগিয়ে গেল। এক পা না ফেলতেই কটার্ড তাকে ডাকল। রিও বিছানার ধারে যেতেই তার হাত আঁকড়ে ধরল। 

“তুমি কি মনে কর পুলিশ আমার মতো অসুস্থ ও ফাঁসিতে ঝুলতে যাওয়া মানুষের সাথে খারাপ আচরণ করতে পারে?”

রিও তার দিকে মূহুর্তের জন্যে তাকাল। আশ্বস্ত করল যে, এরকম কোনকিছুই হবার সম্ভাবনা নেই। ডাক্তার হিসেবে সে অবশ্যই তার রোগীকে রক্ষা করবে। তার কথায় কটার্ড আশ্বস্ত হয়ে ইন্সপেক্টরের দিকে এগিয়ে গেল।

ইন্সপেক্টর কটার্ডকে তার সম্পর্কে গ্র্যান্ডের সাক্ষ্য পড়ে শোনালেন।  তারপর তাকে জিজ্ঞেস করলেন কেন সে ফাঁসি দিতে গিয়েছিল। 
সে পুলিশ অফিসারের দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিল, “একটি গোপন ব্যাথা।’’

ইন্সপেক্টর তাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, ভবিষ্যতেও সে এরকম করবে কিনা।

মুখে সতেজ ভাব এনে কটার্ড বলল, “অবশ্যই না। আমি শুধু শান্তিতে বাস করতে চাই।’’

“তুমি আমার কথা শোন, “পুলিশ অফিসার বিরক্তি সহকারে বলল,”এই মূহুর্তে অন্যেরা নয়, তুমিই অন্যদের শান্তি বিনষ্ট করছ।’’

রিও ইন্সপেক্টরকে ঈশারা করলো কটার্ডকে আর কিছু না বলতে। 

“একটা ঘন্টা খামাখা নষ্ট হলো আমার!” ইন্সপেক্টর ঘর থেকে বের হয়ে আসার পর বললেন। “আপনি জানেন যে, অনেক বিষয় নিয়ে আমাদেরকে চিন্তা করতে হয়। এমনকি এখন যে সবাই জ্বর নিয়ে কথা বলছে, সেটা নিয়েও।’’

তারপর তিনি ডাক্তাররের কাছে জানতে চাইলেন যে, শহরে কোন কঠিন রোগ এসেছে কিনা। রিও তাকে জানালো যে, সে জানে না। 
“অবশ্যই আবহাওয়ার কারণে এমনটা হচ্ছে,” পুলিশ অফিসার উপসংহারে উপনীত হলেন। 

কিন্তু সময়ের সাথে দিনগুলো ক্রমশ আরও উষ্ণ ও আর্দ্র হতে লাগল। প্রতিবার রোগী দেখার পরই রিও আরও বেশী উদ্বিগ্নতা অনুভব করতে লাগল। একদিন বিকেলে উপশহরে বৃদ্ধ রোগীর প্রতিবেশী কটিসন্ধিতে হাত চেপে ধরে বমি করতে শুরু করল। প্রবল জ্বরের সাথে প্রলাপ বকতে শুরু করল। তার স্নায়ুসন্ধিগুলো মিশেলের চেয়ে অনেক বেশী স্ফীত ছিল। এর একটা স্নায়ুসন্ধি পাঁকতে শুরু করল। এক সময়ে পাকা ফলের মত ফেটে গেল। 

এপার্টমেন্টে ফিরে আসার পর রিও জেলার মেডিক্যাল স্টোর ডিপার্টমেন্টে টেলিফোন করল। রিও’র প্রফেশনাল ডায়রীতে সেদিন শুধুমাত্র একটা এন্ট্রিই সে করলোঃ “নেতিবাচক উত্তর।’’ 

শহরের বিভিন্ন অংশ হতে একই ধরণের কেইস আসতে থাকলো তার কাছে। স্ফীত হয়ে উঠা বেশকিছু  ফোঁড়াগুলোকে অপারেশন করার দরকার হলো।  ছুরি দিয়ে ক্রসের মত করে একটু কাটতেই সেগুলো থেকে রক্ত ও পুঁজের মিশ্রণ বেরিয়ে আসতে লাগলো। রোগীদের অঙ্গগুলো ফুলে যেতে লাগল। প্রতিটা রোগীর শরীর থেকেই প্রচুর রক্তপাত হলো। তাদের পা ও পাকস্থলীর উপরে গাঢ় রেখা দৃশ্যমান হয়ে উঠল। কোন কোন সময়ে ফোঁড়াগুলোতে জল জমা বন্ধ হয়ে গেল। আবার হঠাৎ করে সেগুলো ফুলে উঠতে লাগল। প্রতিটা রোগীই মারা যেতে লাগল অবহেলা ও অনিয়মের কারণে।

স্থানীয় পত্রিকাগুলো পূর্বে অজস্র ইঁদুর সম্পর্কিত সংবাদ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু মানুষের মৃত্যু নিয়ে তারা কোন সংবাদই ছাপল না। কারণ ইঁদুরগুলো মরেছিল রাস্তায়, আর মানূষগুলো মারা যাচ্ছিল তাদের বাড়িতে। আমরা জানি যে, পত্রিকাগুলো আসলেই বাসস্থানের চেয়ে রাজপথ নিয়েই বেশী ব্যস্ত থাকে।

অবশ্য ততক্ষণে সরকারী ও মিউনিসিপ্যাল অফিসের কর্তারা বিষয়টা নিয়ে ভাবছিলেন। কারণ, বিচ্ছিন্নভাবে প্রত্যেক  ডাক্তার একটা অথবা দুটো ঘটনা দেখলেও এবং এগুলোর বিপরীতে কোন কার্যক্রম গ্রহণ করার প্রয়োজন অনুভব না করলেও বিচ্ছিন্ন সংখ্যাগুলোকে যোগ করার পর তা অবাক করা বিশাল সংখ্যায় গিয়ে দাঁড়ালো। 

পরের দিনগুলোতে মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে লাগল। সকলের কাছেই স্পষ্ট হল যে, রোগটা মহামারীর আকার ধারণ করেছে। এটা আরও স্পষ্ট হল যখন একদিন ক্যাসেল নামের  রিও’র এক জ্যেষ্ঠ সহকর্মী তার সাথে দেখা করতে আসল। 

“ডাক্তার হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই তুমি জান যে, এটা কি রোগ,” সে রিও’কে বলল।

“আমি ময়নাতদন্তের ফলাফলের জন্যে অপেক্ষা করছি,’’ রিও বললো। 

“অবশ্যই তুমি জান যে, এটা বোঝার জন্যে কোন ময়নাতদন্তের দরকার নেই। চাকুরীর একটা বড় সময় আমি চীন দেশে ছিলাম। এছাড়াও আমি বিশ বছর পূর্বে প্যারিসেও কিছু ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলাম। আমি জানি যে, সেই সময়েও কেউই স্পষ্টভাবে রোগটির নাম উচ্চারণ করতে সাহস পায়নি। ওটা বলা নিষিদ্ধ ছিল। সাধারণ মানূষকে তা শঙ্কিত করবে বলে। এমনকি আমার একজন সহকর্মীও তখন বলেছিল, ‘অসম্ভব, এই রোগ হতেই পারে না; এই রোগ পশ্চিম ইউরোপে আর হয় না।‘ হ্যা, মৃত মানুষেরা ছাড়া সবাই তাই জানতো। আমরা দুজনেই জানি যে, আসলে সেটা কি রোগ ছিল,” ক্যাসেল বলল।   

রিও চিন্তার ভেতরে ডুবে গেলো।  সার্জারি কক্ষের জানালা দিয়ে সে বাইরে তাকাল সে। দূর দিগন্তে একটা খাঁড়া উঁচু পাহাড় অর্ধ বৃত্তাকারের মত করে উপসাগরকে ঢেকে রেখেছে। আকাশ নীল। তারপরেও আকাশের দীপ্তি মরে যাচ্ছিল। গোধূলির আগমনের সাথে সাথে।

“হ্যা, ক্যাসেল,” সে উত্তর করল। “এখনও বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবুও সবকিছুই এটাকে প্লেগ বলেই নির্দেশ করছে।’’

ক্যাসেল উঠে দাঁড়াল এবং দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করলো। 

“তুমি কি জান,” ক্যাসেল বলল, “তারা আমাদেরকে কি বলবে? বলবে যে, রোগটি অনেক পূর্বেই নাতিশীতোষ্ণ দেশগুলো হতে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।’’ 

“বিলুপ্ত? এই শব্দের আসল অর্থ কি?” রিও তার কাঁধ নাড়ল।

“হ্যা, ভুলে যেয়ো না যে, প্রায় বিশ বছর পূর্বে এই রোগ প্যারিস হতেও বিলুপ্ত হয়ে গেছে।’’

“আশা করি যে, এবারেরটি তখনকারটার চেয়ে বেশি খারাপ হবে না। তবুও আমার কাছেও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।’’

‘প্লেগ’ শব্দটি প্রথমবারের মত উচ্চারিত হল। এই বর্ণনার সময়ে ঘটনার বর্ণনাকারীও ডাক্তার রিও’র সাথে জানালার পাশে দাঁড়িয়েছিল। সেও হয়তো তার অনিশ্চয়তা ও বিস্ময়কেই সমর্থন করেছিল। কারণ, সামান্য কিছু মতপার্থক্য থাকলেও তার প্রতিক্রিয়াও ছিল শহরের সিংহভাগ মানুষদের মতো।

আমরা প্রত্যেকেই জানি যে, মহামারী কোন না কোনভাবে বারবার পৃথিবীতে আসতে পারে। এমনকি আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য বলে মনে হলেও। কারণ, পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধের মত অসংখ্যবার প্লেগ এসেছে। তারপরেও  প্লেগ বা যুদ্ধ শুরু হলে আমরা আশ্চর্য হই।প্রতিবারেই। ঠিক প্রথমবারের মতো।

দ্য প্লেগ (প্রথম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বিতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (তৃতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (চতুর্থ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চম পর্ব)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ