দ্য প্লেগ (৮ম পর্ব)

ঢাকা, শনিবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ২০ ১৪২৮,   ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৩

দ্য প্লেগ (৮ম পর্ব)

মূল: আলবেয়ার কামু

অনুবাদ: মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৩১ ২৫ মে ২০২১   আপডেট: ১৯:৫৭ ৮ জুন ২০২১

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ডাক্তার রিও’র ভাবনার শেষদিকে জোসেফ গ্র্যান্ড আসলো। মিউনিসিপাল অফিসে গ্র্যান্ড বিভিন্ন ধরনের কাজ করে। অনেক সময়েই তাকে পরিসংখ্যান বিভাগের পক্ষ হতে জন্ম, বিবাহ, এবং মৃত্যু সংক্রান্ত হিসাব লিপিবদ্ধ করতে হয়। গত কয়েকদিন পূর্বেও সে মৃতদের সংখ্যা যোগ করার দায়িত্ব পালন করেছে। ডাক্তারের কাছে ঋণী হবার কারণে সে সর্বশেষ মৃত্যু সংখ্যার একটা কপি এনেছে। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে। গ্র্যান্ডের সাথে এসেছে প্রতিবেশী কটার্ড।

“মৃত্যু সংখ্যা তো প্রতিদিনই বাড়ছে, ডাক্তার। গত দুইদিনে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে।”

রিও তার সাথে হ্যান্ডশেক করার পর কটার্ডকে জিজ্ঞেস করল সে কেমন আছে? গ্র্যান্ড রিওকে জানাল যে, কটার্ড এসেছে তাকে ধন্যবাদ দিতে। বিশেষকরে সমস্যা সৃষ্টি করার জন্যে মাফ চাইতে। রিও কাগজের উপরে লেখা সংখ্যাগুলোর দিকে তাকিয়েছিল। ভ্রু কুঁচকে। 
“ঠিক আছে,” সে বলল। “আমার মনে হয় আমাদের উচিৎ রোগটিকে সঠিক নামে ডাকার। এতদিন পর্যন্ত আমরা মনঃস্থির করতে পারিনি। আমি ল্যাবরেটরিতে যাচ্ছি। তোমরা কি আমার সাথে যেতে চাও?” 

“অবশ্যই যেতে চাই,” গ্র্যান্ড তার সাথে নীচে নামতে নামতে বলল। “আমিও তাই ভাবি। যে কোনকিছুকে সঠিক নামেই ডাকা উচিৎ। কিন্তু রোগটার নাম কি?”

“সেটা জেনে তোমার লাভ নেই।” 

“দেখ,” গ্র্যান্ড মৃদু হাসল। “সঠিক নামে ডাকতে পারাটা খুব সহজ নয়।”

তারা ডি’আরমেস নামের একটি জায়গায় যাওয়ার জন্যে যাত্রা করলো। কটার্ড নীরবে তাদেরকে অনুসরণ করল। রাস্তাঘাটগুলো অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আসছিল। সংক্ষিপ্ত গোধূলির সময় পেরিয়ে ইতিমধ্যেই শহরে রাত নেমে এসেছিল। দিগন্তের উপরে সন্ধ্যার প্রথম তারাগুলো ঝিকমিক করছিল। একটু পর স্ট্রীট লাইটগুলো একসাথে জ্বলে উঠলে আকাশ কিছুটা নিষ্প্রভ হয়ে গেল। এই সময়েই রাস্তার উপরে মানুষদের উঁচু কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

“আমাকে এখনই চলে যেতে হবে,” গ্র্যান্ড বলল। ডি’আরমেসের কাছাকাছি পৌঁছার পর। “আমাকে গাড়ি ধরতে হবে। সন্ধ্যার সময়গুলো আমার জন্যে আসলেই কাজের। আমাদের এলাকায় আমরা বলি: আজকের কাজ কালকের জন্যে কখনোই রেখে দিও না।”

রিও লক্ষ্য করেছে যে, গ্র্যান্ড তার এলাকার নামের ( Montélimar) বরাত দিয়ে প্রায়ই নিজের কথার ভেতরে কিছু উদ্ধৃতি ও বাক্যাংশ ব্যবহার করে থাকে। যেমন, ‘স্বপ্নের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া’, ‘ছবির মত সুন্দর’ ইত্যাদি।

“ঠিক,” কটার্ড যোগ করল। “গ্র্যান্ড কখনই সন্ধ্যার বাসা থেকে বের হয় না।”

রিও গ্র্যান্ডকে জিজ্ঞেস করল যে, সন্ধ্যার পর তাকে মিউনিসিপাল অফিসের জন্যে কোন অতিরিক্ত কাজ করতে হয় কিনা। কিন্তু গ্র্যান্ড জানাল যে, বাসায় তাকে কখনই অফিসের কাজ করতে হয় না। তবে নিজ থেকেই সে একটা বিশেষ কাজ করে থাকে।

রিও আলাপচারিতা চালিয়ে যাওয়ার যাওয়ার জন্যে বলল, “তুমি কি সেই কাজটা খুবই পছন্দ কর?”

“আমি অনেক বছর ধরেই কাজটা করে আসছি। তবে তেমন অগ্রগতি করতে পারিনি।”
 
“তুমি কি আমাকে বলবে,” রিও তাকে থামিয়ে দিল,” কি সেই কাজটা কি যা তুমি বছর ধরে করছ?” 

গ্র্যান্ড তার মাথার হ্যাটের উপরে হাত রাখলো। হ্যাটটিকে তার বৃহৎ উৎকীর্ণ কান পর্যন্ত নামিয়ে আনল। তারপর  বিড়বিড় করে অর্ধেক-স্পষ্ট কিছু মন্তব্য করল। তার কথাগুলো থেকে রিওর কাছে মনে হল যে, সে ‘ব্যক্তিত্বের বিকাশ’ সম্পর্কিত কোন বিষয় বা কাজের সাথে জড়িত আছে।

গ্র্যান্ড চলে যাবার পর রিও দ্রুত পিছন ফিরলো। ছোট ছোট পদক্ষেপে ফিগ গাছের নীচ দিয়ে boulevard de la Marne সড়ক বরাবর হাঁটতে লাগল। ল্যাবরেটরি গেটের কাছে পৌঁছার পর কটার্ড বলল যে, সে তার কাছ থেকে কিছু পরামর্শ নিতে এসেছে। রিও পকেটের ভেতরে মৃতের সংখ্যা সম্পর্কিত কাগজটি নাড়াচাড়া করতে করতে তাকে জানাল যে, এই মুহূর্তে তার সময় নেই। সে চাইলে কনসাল্টিং আওয়ারে তার সাথে দেখা করতে পারে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বলল যে, সে পরেরদিন তাদের এলাকায় যাবে। সেখানে দুপুরের পর  নিজেই সে  তার সাথে দেখা করবে।

কটার্ডকে ছেড়ে দেয়ার পর ডাক্তার এতক্ষণ গ্র্যান্ড সম্পর্কেই চিন্তা করছিল। তাকে সে কল্পনা করার চেষ্টা করছিল অতীত কালের ভয়াবহ মহামারীর সময়কালের কোন মানুষ হিসেবে। সে কল্পনা করছিল যে, গ্র্যান্ড দৈবানুগ্রহে সেখানে উপস্থিত ছিল। “গ্র্যান্ড এমন ধরণের মানুষ, যে সকল সময়েই বিপদ থেকে পলায়ন করতে সমর্থ হয়,“ রিও মনে মনে আওড়াল। কারণ, ইতিপূর্বে কোথাও  সে পড়েছিল যে, প্লেগ দুর্বল ধরণের মানুষদেরকে আক্রমণ করে না। আক্রমণ করে দৈহিকভাবে শক্তিশালী মানুষদেরকে।

গ্র্যান্ড সম্পর্কে ভাবনাচিন্তার পর সে সিদ্ধান্তে আসলো যে, সে উপরের ধরণের ‘রহস্যময় মানুষ’। যদিও প্রাথমিক দৃষ্টিতে তাকে স্থানীয় প্রশাসনের শুধু একজন নম্র স্বভাবের কর্মচারী বলেই মনে হয়। শীর্ণ ও দীর্ঘদেহী; মনে হয় যে, তার শরীরের চেয়ে অনেক বড় আকারের পোশাকের ভেতরে হারিয়ে আছে সে। অদ্ভুত কোন কারণে সে নিজের আকৃতি এবং দৈর্ঘ্যের চেয়ে অনেক বড় ও দীর্ঘ পোশাক পরে থাকে।
গ্র্যান্ডের নীচের চোয়ালে প্রায় সবগুলো দাঁত থাকলেও উপরের চোয়ালের সবগুলো দাঁতই পড়ে গেছে। ফলে যখন সে উপরের ঠোঁট নাড়াচাড়া করে হাসে, তখন তার নীচের ঠোঁট নড়ে না এবং মুখটাকে মনে হয় মুখমণ্ডলের ভেতরে ছোট্ট একটা কাল গর্ত।

তার হাঁটার ভঙ্গী দেখে মনে হয় একটা লজ্জিত ভিক্ষু দেয়ালের গা ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে এক সময়ে দরজার ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। ইঁদুরের মত। তার মুখ থেকে অনর্গল নির্জীব ধরণের ধুঁয়া ও বেইসমেন্ট কক্ষের গন্ধ বের হয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে একজন অতিসাধারণ মানুষের সকল বৈশিষ্ট্য তার ভেতরে বিদ্যমান। বাস্তবিক পক্ষেই তাকে ডেস্কের উপরে মাথা নিচু করে শহরের টয়লেট সমূহের শুল্ক গণনা অথবা ময়লা সংগ্রহের প্রতিবেদন জোগাড় করা করণিক ছাড়া অন্যকিছু হিসেবে কল্পনা করা কঠিন। শুধু তাই নয়, তার সাথে প্রথম দেখাতেই আপনার মনে হবে যে, সে কি কাজ করে তা আপনি তা জানেন। তাকে দেখার পর এটাও আপনি অনুভব করবেন যে, পৃথিবীতে এই লোকটির আগমনের কারণ একটাই। মিউনিসিপাল অফিসের সহকারী করণিক হিসেবে কাজ করা, যার মাসিক বেতন ৬২ ফ্রাঙ্কস। দৈনিক বেতন ৩০ সেন্ট।

২০ বছর পূর্বে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাশের পর গ্র্যান্ড মিউনিসিপাল অফিসের এই সাময়িক চাকুরীটি সে গ্রহণ করেছিল। টাকার অভাবে পড়াশুনা চালাতে না পেরে। খুব দ্রুতই সে চাকুরিতে স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল। নগর প্রশাসনের কিছু স্পর্শকাতর সমস্যাকে সার্থকভাবে সমাধান দিতে পারার কারণে। এমনকি তখন অফিস থেকেও  তাকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল যে, দ্রুতই তাকে একটি গ্রেড দেয়া হবে। যা দিয়ে সে আরামদায়ক জীবন যাপন করতে পারবে।

কখনই জোসেফ গ্র্যান্ডের কোন  উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। মৃদু হাসি দিয়ে নিজেও সে তা স্বীকার করে থাকে। মোটের উপরে সে আশা করে এমন একটা জীবন, যা সে সততার সাথে যাপন করতে এবং অবসর সময়কে নিজের সখের পেছনে ব্যয় করতে পারবে। কিন্তু তার চাকুরীর ‘সাময়িক’ প্রকৃতি পরিবর্তন না হবার কারণে জীবিকা নির্বাহের খরচ বেড়ে গেলেও তার বেতনও বাড়েনি। ফলে অর্থনৈতিকভাবে সে যথেষ্টই অসুবিধার ভেতরে ছিল। বিষয়টি সে রিও’র কাছে স্বীকার করেছিল। তবে অন্য কেউই জানত না।

আসলে এর ভেতরেই নিহিত ছিল গ্র্যান্ডের মৌলিকত্ব। সে চাইলে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তাকে দেয়া গ্রেড সম্পর্কিত প্রতিশ্রুতির বিষয়টি অফিস কর্তৃপক্ষের গোচরে আনতে পারত। অনুযোগ হিসেবে। কিন্তু তার ডিপার্টমেন্টের প্রধান (যিনি এসম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন) মারা যাবার কারণে সে তা করেনি। এছাড়াও চাকুরী শুরুতে যে শর্তাবলী দেয়া হয়েছিল, সেগুলো সে ভুলে গিয়েছিল।

তার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো যে, সে সঠিক কথা খুঁজে পায় না। রিও খেয়াল করে দেখেছে যে, এই বিশেষত্বই  তার ব্যক্তিত্বের চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করেছে। এর কারণেই সে কর্তৃপক্ষ বরাবর অনুযোগ জানিয়ে চিঠি লিখতে বা অন্য কোন ব্যবস্থা নিতে সমর্থ হয়নি। তার বক্তব্য অনুযায়ী নিজের ‘অধিকার’ নিয়ে কথা বলতে কখনই তার ভাল লাগত না। এমনকি ‘প্রতিশ্রুতি’ শব্দটিও উচ্চারণ করতে সে স্বচ্ছন্দ বোধ করত না। অন্যদিকে ‘আপনার দয়া’ ‘কৃতজ্ঞতা’, ‘অনুরোধ’ এই শব্দগুলোও ছিল তার আত্মসম্মানবোধের সাথে সাংঘর্ষিক। ফলে সঠিক শব্দ খুঁজে না পাওয়া ও আনুষঙ্গিক কারণে সে অনেক বছর ধরেই কম বেতনের চাকুরীটি করে আসছিল। রিওকে সে সবসময়েই বলত যে, সে সকল সময়েই তার আয়ের ভেতরে বসবাস করে এসেছে। এমনকি তার প্রয়োজনগুলোকেও কাটছাঁট করেছে আয়ের সাথে সঙ্গতি রাখার জন্যে। প্রায়ই সে শহরের মেয়রের (যে একই সাথে একজন বিজনেস ম্যাগনেট ছিল) একটা মতামতকে সমর্থন করত। মতামতটা ছিল,”এই শহরের কেউ কোনদিন অনাহারে মৃত্যুবরণ করেনি। মোটকথা, নিরলংকার সন্ন্যাসীদের মত জীবনযাপনই সকল ধরণের উদ্বিগ্নতা থেকে রক্ষার কবচ বলে গ্র্যান্ড বিশ্বাস করত।

এছাড়াও নিজেকে প্রকাশ করার জন্যে সর্বক্ষণ সঠিক শব্দ খুঁজত সে। এই প্রেক্ষিতে বলা যেতে গ্র্যান্ডের জীবন ছিল একটি অনুকরণীয় জীবন। সে ছিল সেই সকল স্বল্প সংখ্যক মানুষদের অন্তর্ভুক্ত, যারা অল্পে তুষ্ট থাকে ও  নিজেকে নিয়েই আনন্দে থাকে। গ্র্যান্ড নিজের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে যতটুকুই সে বলত, তা তার দয়া ও স্নেহ ইত্যাদি বোধের আতিশয্যকেই প্রকাশ করত। নিজের পিতামাতা সম্পর্কে (যাদেরকে সে শৈশবে হারিয়েছিল) সে বলত যে, তাদের অনুপস্থিতি তাকে কষ্ট দেয়। সে কখনই লুকানোর চেষ্টা করেনি যে, প্রতিদিন বিকেলে শহরে নিজ এলাকায় গির্জার ঘণ্টাধ্বনি তাকে টানে। তারপরেও অতি সাধারণ আবেগের বিষয় প্রকাশ করতে তার কষ্ট হত। শব্দের স্বল্পতার কারণে। মোটের উপর শব্দ খুঁজে পাওয়ার সমস্যা তার জন্যে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

“ডাক্তার, তুমি জান না নিজেকে প্রকাশ করা শিখতে আমি কতটা আগ্রহী!” প্রতিবারেই সে রিও’র সাথে দেখা হওয়ার পর বলত। 
সেই বিকেলে গ্র্যান্ডের অপস্রিয়মাণ অবয়বের দিকে তাকিয়ে রিও’র মনে হল যে, গ্র্যান্ড তাকে বলতে চেয়েছিল যে, সে বই অথবা সে ধরণের কিছু একটা লেখার সাথে সম্পর্কিত রয়েছে। অদ্ভুত কারণে ল্যাবরেটরিতে প্রবেশ করার  সময়েও নিশ্চিতভাবে তা পুনর্বার অনুভব করল। এই পর্যায়ে রিও কোনভাবেই একটা বিষয় বিশ্বাস করতে পারল না। তার মনে হলো যে, যেশহরে গ্র্যান্ডের মত নির্দোষ ধরণের মাথা পাগল লোক বসবাস করে, সে শহরে কি করে মহামারী ধরণের বিশাল মাপের বিপদ নেমে আসতে পারে? মহামারী সম্পর্কে তার পড়াশুনা থেকে  ইতিহাসের প্লেগ জর্জরিত কোন সমাজে এই ধরণের মাথাপাগল লোকের অস্তিত্ব সে খুঁজে পায়নি। সুতরাং সে উপসংহারে উপনীত হল যে, এই শহরের মানুষদের উপরে প্লেগের মত বিপর্যয় নেমে আসতে পারে না।

পরেরদিন রিও অনেক চেষ্টা করে নগর প্রধানের অফিসে একটি স্বাস্থ্য কমিটি গঠন করতে নগর কর্তৃপক্ষকে রাজী করাতে সমর্থ হল  ।
“এটা সত্য যে, শহরের লোকজন ঘাবড়ে যাচ্ছে,” ডাক্তার রিচার্ড স্বীকার করল। “তবে এটাও ঠিক যে শহরে বিভিন্ন ধরণের গুজব ছড়ানো হচ্ছে। নগর প্রধান আমাকে বলেছেন, 'তোমরা চাইলে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পার, তবে আমি চাচ্ছি না এবিষয়ে নাগরিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে।‘ তার ব্যক্তিগত ধারণা যে, এটা একটা ভুল বিপদসংকেত।”

রিও গাড়িতে করে ক্যাসেলকে মেয়রের অফিসে লিফট দিচ্ছিলো। “তুমি কি জান,” গাড়িতে উঠেই ক্যাসেল বলল, “যে, আমাদের পুরো জেলায় এক গ্রাম পরিমাণেও জীবাণুনাশক (serum) নেই?” 

“জানি। ঔষধের ডিপোতে টেলিফোন করেছিলাম। ডেপোর পরিচালককে মনে হল জীবাণুনাশকের প্রসঙ্গ আসায় খুবই অবাক হয়েছে। আমাকে তিনি জানিয়েছেন যে, সিরামগুলো প্যারিস থেকে আমদানি করতে হবে।” “সেগুলো কি তাড়াতাড়ি আসবে? আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।” “আমি গতকাল টেলিগ্রাম পাঠিয়েছি,” ডেপোর পরিচালক বলেছেন।

নগর প্রধান যথেষ্ট ভদ্রতার সাথেই তাদেরকে স্বাগত জানালেন। কিন্তু তাকে দেখে বোঝাই যাচ্ছিল তিনি রেগে আছেন। “আসুন, আমরা কাজ শুরু করি,’ তিনি সবার উদ্দেশ্যে বললেন। “সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের কি পর্যালোচনা করার দরকার আছে?”

রিচার্ড জানালো যে, সেটার দরকার হবে না। সে ও তার সহকর্মীরা সকলেই ঘটনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত রয়েছে। তাদের এখন একটাই প্রশ্ন। তা হলো কি কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

বয়স্ক ক্যাসেল প্রায় অভদ্র ভাবে বলে উঠলো, “প্রশ্ন? প্রশ্নটা হল যে আমাদেরকে জানতে হবে এটা আসলেই কি প্লেগ, নাকি প্লেগ নয়?” 
উপস্থিত দুই বা তিনজন ডাক্তার ক্যাসেলের কথার প্রতিবাদ করে উঠল। অন্যরা ইতস্তত করতে লাগলো। নগর প্রধান ভূমিকা দিয়ে শুরু করলেন। তাড়াহুড়ো করে দরজার দিকে তাকালেন নিশ্চিত হবার জন্যে যে, ক্যাসেলের অভদ্রজনোচিত মন্তব্য করিডোর থেকে কেউ শুনতে পায়নি।

রিচার্ড বলল যে, তার মতে এ বিষয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করার দরকার নেই। বর্তমান সময়ে সকলকে যা বলা যেতে পারে তা হলো, আমাদেরকে একটা বিশেষ ধরণের জ্বরের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে। এই জ্বরে কুঁচকিসংক্রান্ত সমস্যা আছে। এই সময়ে আমাদের আদৌ যৌক্তিক হবে না দ্রুত কোন উপসংহারে উপনীত হওয়া। 

বৃদ্ধ ক্যাসেল শান্তভাবে হলুদাভ গোঁফ চিবতে চিবতে ফ্যাঁকাসে কিন্তু উজ্জ্বল চোখে রিও’র দিকে তাকাল। তারপর কমিটির অন্য সকল সদস্যদের দিকে বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল যে, সে নিশ্চিতভাবে জানে যে, এটা প্লেগ। এটাও সে বললো যে, অফিসিয়ালি আমাদের সবার এটা স্বীকার করে নেয়া উচিৎ। শুধুমাত্র সেক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষ বাধ্য হবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। সে জানালো যে, তার সহকর্মীরা যেহেতু সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছেন, সেহেতু তারা রোগটিকে প্লেগ নয় বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। 

নগর প্রধানকে বিশৃঙ্খল মনে হল। তিনি ক্যাসেলের বক্তব্যকে যুক্তিহীন বলে মন্তব্য করলেন। ক্যাসেল প্রতি উত্তরে বলল, ”বক্তব্য যুক্তিহীন বা অন্যকিছু, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বিষয়টি নিয়ে আমাদের সবার  গভীরভাবে চিন্তা করা।”

রিও এতক্ষণ পর্যন্ত কিছুই বলেনি। তাকে মতামত দিতে বলা হল। সে বললো, “আমরা বর্তমানে মুখোমুখি হয়েছি টাইফয়েড ধরণের একটি জ্বরের সাথে। এই জ্বরের সাথে রোগীর বমি হয় এবং লিম্ফনোড ফুলে যায় (বাগীরোগ)। আমি বাগী বা ফোড়াগুলোকে অপারেশন করে পুঁজ নিরীক্ষা করে দেখেছি। আমাদের ল্যাবরেটরি বিশেষজ্ঞও বিশ্বাস করে যে, এগুলোর ভেতরে সে প্লেগের জীবাণু পেয়েছে। তবে সেই সাথে আমি নিজে এটাও বলতে চাই যে, এই জীবাণুতে বিশেষ কিছু মডিফিকেশন রয়েছে, যা প্লেগ জীবাণুর প্রচলিত বর্ণনার সাথে মিলে না।“ 
রিচার্ড বলল, “এ কারণেই আমাদের ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ নীতি অনুসরণ করা উচিৎ। আমাদের জন্যে যৌক্তিক হবে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রতিবেদনের জন্যে অপেক্ষা করা। এটা গত কয়েকদিন যাবত পরিচালিত হচ্ছে।”

“যখন একটা অণুজীব,” রিও বলল, সামান্য বিরতির পর মাত্র তিনদিনেই স্প্লিনকে চারগুণ বড় করে দেয়, স্নায়ু গ্রন্থিকে স্ফীত করে আপেলের মত করে ফেলে এবং  সারাক্ষণ যন্ত্রণা দিতে থাকে, তখন ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ নীতি আমার কাছে কখনই যৌক্তিক মনে হয় না। এই রোগের  সংক্রমণের কেন্দ্রও ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে, দৃঢ়তার সাথে এবং খুবই দ্রুতগতিতে এই রোগ বাড়ছে। আমরা যদি এখনই একে বন্ধ না করতে পারি, তবে আগামী দুই মাস শেষ হবার পূর্বেই এটা শহরের অর্ধেক মানুষের মৃত্যুর কারণ হবে। সেক্ষেত্রে আমরা একে যত কম গুরুত্ব দিয়ে প্লেগ বা বিরল জ্বরই বলি না কেন, তাতে কিছুই আসবে-যাবে না। আমাদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ হল শহরের অর্ধেক মানুষ মেরে ফেলার পূর্বেই ওটাকে প্রতিহত করা।

রিচার্ড বলল যে, এই ধরণের হতাশ একটি ছবি আঁকা আমাদের  উচিৎ নয়। তাছাড়া রোগটি সংক্রামক তা এখনও প্রমাণিত হয়নি। কারণ, দেখা গেছে এই সব রোগীদের আত্মীয়স্বজনরা একই ছাদের নীচে বসবাস করার পরেও আক্রান্ত হয়নি।

“কিন্তু অনেকেই মারা গেছে,” রিও প্রত্যুত্তর করল। “সংক্রমণ এখনও পূর্ণরূপ ধারণ করেনি। নতুবা গাণিতিক হারে এই সংক্রমণ হলে মৃত্যুর হার বিপদজনকভাবে বেড়ে যেত। সুতরাং এটা কখনই বিষণ্ণ ছবি আঁকার বিষয় নয়। বরং পূর্বসতর্কতা গ্রহণের প্রশ্ন।”

যাইহোক, রিচার্ড পুরো পরিস্থিতিকে নিজে যেভাবে অনুধাবন করে, সেভাবেই ব্যাখ্যা করল। সে জানালো যে, মহামারী নিজ থেকে না থামলে, একমাত্র তখনই তারা কঠোর প্রতিষেধক ব্যবহার করবে। যেমনটা স্বাস্থ্যবিধিতে লিখা আছে। উল্লেখ্য, কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্যে অফিসিয়ালি ঘোষণা করার প্রয়োজন রয়েছে যে, মহামারীর প্রাদুর্ভাব হয়েছে। কিন্তু যেহেতু মহামারী সংঘটনের কোন নিশ্চয়তা নেই, সেহেতু কোন তরান্বিত ব্যবস্থা গ্রহণই তারা অনুমোদন করতে ইচ্ছুক নয়। 

রিও তার যুক্তিতে অনড় থাকল। “বিষয় এটা নয় যে, স্বাস্থ্যবিধিতে প্রদত্ত ব্যবস্থাসমূহ কঠোর কিনা। বিষয় হল ব্যবস্থাটি অর্ধেক সংখ্যক জন্যগণের মৃত্যুকে ঠেকানোর জন্যে যথেষ্ট কিনা। বাকী সকল ব্যবস্থাই হল প্রশাসনিক কার্যক্রম। আমার মনে হয় না যে, কাউকে মনে করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে যে, আমাদের সংবিধানে এই ধরণের পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্যে নগর প্রধানকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে, যাতে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দেশনা প্রদান করতে পারেন।”

“অবশ্যই সত্য,” নগর প্রধান স্বীকার করলেন, “কিন্তু সেক্ষেত্রে আমার প্রয়োজন হবে আপনাদের নিকট হতে প্রফেশনাল ঘোষণা যে, বাস্তবেই এই মহামারী প্লেগ হতে সৃষ্ট।“ “আমরা যদি এই ঘোষণা না দেই,” রিও বলল,”তাহলে শহরের অর্ধেক জনসংখ্যা শেষ হয়ে যেতে পারে।“ রিচার্ড কিছুটা অস্থিরতা প্রদর্শন করল। ‘সত্য হল যে, আমাদের সহকর্মী বিশ্বাস করেন যে, এটা প্লেগ। লক্ষণ সম্পর্কে তার বর্ণনা তাই প্রমাণ করে,” সে বলল।

রিও উত্তর দিল যে, সে কোন ‘লক্ষণ’ বর্ণনা করেনি। সে শুধু বলেছে যা সে নিজ চোখে দেখেছে। যা সে দেখেছে, তা হল বাগীরোগ (buboes) ও উচ্চ জ্বর; সাথে প্রলাপ বকা। এই রোগে মানুষ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ডাক্তার রিচার্ড কি ঘোষণা করতে পারবেন যে, কঠোর প্রতিষেধক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলেও মহামারী নিঃশেষ হয়ে যাবে? 

রিচার্ড ইতস্তত করল এবং তারপর দৃষ্টিকে রিও’র উপরে নিবদ্ধ করল। বললো, “অনুগ্রহ করে অকপটে আমাকে বল, তুমি কি নিশ্চিত যে, ওটা প্লেগ?” 

“সমস্যাটাকে তুমি ভিন্নভাবে বর্ণনা করছ। আমি সেটাকে কি নামে ডাকি সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হল সময়,“ রিও বললো। 
“তাহলে কি তোমার মত হল যে,” নগর প্রধান তাদের দুইজনের কথার ভেতরে ঢুকলেন, “যদি প্লেগ নাও হয়ে থাকে, তবুও প্লেগের জন্যে নির্ধারিত কঠোর প্রতিষেধক ব্যবস্থা এখুনি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন?”

“আপনারা যদি আমার মতকে গ্রহণ করেন, তাহলে এটাই আমার সত্যিকারের মতকে প্রকাশ করে,“ রিও বললো। ডাক্তাররা সবাই স্বীকার করে নিল, রিচার্ডই তাদের মুখপাত্র। রিও নয়। 

“তার মানে আমরা দায়িত্ব গ্রহণ করছি এই বলে যে, এই মহামারিই প্লেগ,“ রিচার্ড বলল। এভাবেই সে বিষয়টিকে সাধারণ অনুমোদনের জন্যে উপস্থাপন করল।

“আমার কিছুই যায় আসে না,” রিও বলল,”আপনারা কীভাবে তা বর্ণনা করেন। আমার বক্তব্য হল, আমাদের এমন কিছু করা উচিৎ হবে না, যাতে শহরের অর্ধেক জনসংখ্যা বিলোপ হয়ে যায়।”

অনেক চোখ রাঙ্গানি এবং বাদ-প্রতিবাদের পর রিও কমিটি কক্ষ ত্যাগ করে বের হয়ে আসল। কয়েক মিনিট পর সে শহরের পেছন দিকের একটা রাস্তার উপরে গাড়ি চালাচ্ছিল। রাস্তা থেকে শুঁটকি মাছ ও পেশাবের গন্ধ আসছিল। একটা মহিলা যন্ত্রণায় চিৎকার করছিল। তার কটিসন্ধি হতে রক্ত ঝরছিল। মহিলাটি রিও’র দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।

দ্য প্লেগ (প্রথম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বিতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (তৃতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (চতুর্থ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চম পর্ব)

দ্য প্লেগ (ষষ্ঠ পর্ব)

দ্য প্লেগ (সপ্তম পর্ব)

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ