দ্য প্লেগ (তৃতীয় পর্ব)
সেদিন বিকেলে রোগীদেরকে পরামর্শ দিতে যাবার মূহুর্তে এক যুবক রিও’র সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসল। যুবকটি সকালেও এসেছিল বলে সে মনে করতে পারল।একজন সাংবাদিক। নাম রেয়মন্ড র্যাম্বার্ট। ছোটখাটো গড়নের, চারকোণা কাঁধের। মুখে দৃঢ় আত্নবিশ্বাস। দেখে মনে হয় সে যেকোন পরিস্থিতিতে স্থির ও সিদ্ধান্তে অটল থাকতে সক্ষম। স্পোর্টসের জামা পরেছিল সে।
বিষয়ান্তরে না গিয়ে যুবক সরাসরি আলোচনা শুরু করল। যুবকের একটি পত্রিকা আছে, যা প্যারিসের প্রথম সারির একটা পত্রিকা। সেটিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এই শহরের আরব জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার উপরে একটি প্রতিবেদন তৈরির জন্যে। বিশেষ করে এদের স্যানিটারি পরিস্থিতি নিয়ে।
রিও তাকে জানাল যে, তাদের পরিস্থিতি খুব একটা অবস্থা ভাল নয়। তবে এর পূর্বেই সে তাকে জিজ্ঞেস করল যে, সে তার পত্রিকায় নিরপেক্ষভাবে সত্য প্রকাশ করতে সক্ষম কিনা।
“নিশ্চয়ই,” র্যাম্বার্ট উত্তর করল।
“আমি বলতে চাচ্ছি। “রিও পুনরায় ব্যাখ্যা করল, “তুমি কি তোমার পত্রিকায় শর্তহীনভাবে বিরাজমান অব্যবস্থার নিন্দা জানাতে পারবে?”
“শর্তহীন ভাবে? না, অতদূর পর্যন্ত আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না। তবে পরিস্থিতি নিশ্চয়ই এখনও ততটা খারাপ নয়?”
“না,” রিও শান্তভাবে বলল, “ঠিক বলেছেন। পরিস্থিতি এখনও ততটা খারাপ নয়।”
আসলে প্রশ্নটা করার দরকার না থাকলেও সে প্রশ্নটি সে করলো র্যাম্বার্ট তার সঙ্গে কোন চাতুরী করছে কিনা তা বোঝার জন্যে।
“আমার কাছে এখন পর্যন্ত তেমন কোন তথ্য নেই, যা আমি তোমার প্রতিবেদনের জন্যে প্রদান করতে পারি,” রিও যোগ করল।
“তুমি Saint-Just এর ভাষায় কথা বলছ, ডাক্তার,” সাংবাদিক বলল।
বিতর্কে না গিয়ে রিও তাকে জানাল যে, Saint-Just এর ভাষা সম্পর্কে তার কোন ধারণা নেই। সে যে ভাষা ব্যবহার করেছে, তা পৃথিবীর যেকোন মানুষের ভাষা। একইসাথে সে তাকে জানাতে ভুলল না যে, পৃথিবী সম্পর্কে ইতিমধ্যেই তার অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। তবে এখনও সে তার আশেপাশের লোকজনকে যথেষ্টই পছন্দ করে। এবং বর্তমান পর্যন্ত তাকে কোন অবিচার মেনে নিতে বা সত্যের সাথে আপোষ করতে হয়নি। কথাগুলো বলার সময়ে ডাক্তারের কাঁধ নিরালম্বভাবে ঝুলে ছিল। র্যাম্বার্ট নিশ্চুপ হয়ে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সে, “মনে হয় আমি তোমাকে বুঝতে পারছি,” বলে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। রিও দরজা পর্যন্ত তার সাথে এগিয়ে এলো।
“তুমি বিষয়টাকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছ বলে আমি খুশি হলাম,” সে বলল।
“হ্যা, হ্যা। আমি বুঝতে পেরেছি, বুঝতে পেরেছি,” র্যাম্বার্ট পুনরাবৃত্তি করল। রিও’র কাছে মনে হলো সাংবাদিকের কথার স্বরে কিছুটা অধৈর্য প্রকাশিত হচ্ছে।
“দুঃখিত। আমি তোমার জন্যে হয়তো বা অসুবিধার সৃষ্টি করলাম, “র্যাম্বার্ট শেষবারের মত বলল।
র্যাম্বার্টের সাথে হাত মিলানোর সময়ে রিও জানাল যে, সে যদি খবরের কাগজের জন্যে সত্যিই ভিন্ন ধরণের সংবাদ সংগ্রহের জন্যে বের হয়ে থেকে থাকে, তবে সে তাকে শহরে বর্তমানে যে বিস্ময়কর সংখ্যায় মৃত ইঁদুর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, সে সম্পর্কে বলতে পারে।
র্যাম্বার্ট উচ্ছ্বসিত ভাবে বলল, “অবশ্যই, আমি এ সম্পর্কেই জানতে আগ্রহী।”
বিকেল ৫ টার দিকে রিও আরেকবার নগর পরিভ্রমণে বের হল। যাবার পথে, সিঁড়ির উপরে রিও’র সাথে দেখা হল অন্য এক যুবকের সাথে। গাঁট্টাগোট্টা ধরণের শরীরের। মুখমন্ডলটি অনেক বড়। সারামুখে গভীর ভাঁজ। চোখের ভ্রু এতোই ঘন যে ঝোপের মত দেখতে লাগে। এর সাথে ইতিপূর্বেও রিও’র সাক্ষাৎ হয়েছে। একবার অথবা দু’বার। প্রথমবার তার সাথে দেখা হয়েছিল রিওদের বাসস্থানের উপরের তলার এপার্টমেন্টে। কয়েকজন পুরুষ স্প্যানিশ ডান্সারদের সাথে। যুবকের নাম জ্যা ত্যারু।
সিগারেটে ফুঁক দিতে দিতে যুবক সিঁড়ির উপরে পড়ে থাকা সামনের একটা মৃত ইঁদুরের ফুলে উঠা শরীরের দিকে তাকিয়ে ছিল। রিও’কে দেখার পর সে উপরের দিকে তাকাল। তার বাদামী চোখের দৃষ্টি কিছুক্ষণের জন্যে ডাক্তারের উপরে নিবদ্ধ হল। তারপর মন্তব্য করল যে, ইঁদুরদের এভাবে মরে যাওয়ার বিষয়টা আসলেই অদ্ভুত। বিশেষ করে গর্তের ভেতর থেকে বের হয়ে এসে খোলা জায়গায় মৃত্যবরণ করার বিষয়টি।
‘খুবই অদ্ভুত,” রিও সম্মতি জানাল, ‘বিষয়টি স্নায়ুর উপরে প্রবল চাপ সৃষ্টি করে।
“ঠিক বলেছ, ডাক্তার। আমরা ইতিপূর্বে কখনই এই ধরণের ঘটনা ঘটতে দেখিনি। ব্যক্তিগতভাবে আমি এটাকে কৌতূহলোদ্দীপক বলেই মনে করি।’’
ত্যারু আঙুল দিয়ে নিজের মাথার ভেতরে চালনা ও কপালকে পরিষ্কার করতে করতে পুনরায় মৃত ইঁদুরটির দিকে তাকাল। ওটা ততক্ষণে স্থির হয়ে গেছে। সে রিও’র দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
“কিন্তু ডাক্তার, এটা তো আমাদের সমস্যা নয়। এটা দারোয়ানের সমস্যা, তাই নয় কি?”
তার কথা শেষ না হতেই দারোয়ান পাশে এসে দাঁড়াল। সে একটু দূরেই দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাকে যথেষ্টই ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। তার স্বাভাবিক লালচে মুখটাকে মনে হচ্ছিল পাংশুটে ও রক্তহীন।
“হ্যা, আমি জানি,” বৃদ্ধ লোকটি রিও’কে বলল। সেই তাকে ইঁদুর বিষয়ক সর্বশেষ ঘটনার কথা জানিয়েছিল।
“আমি এগুলোকে প্রতিবারেই দেখতে পাই দুই বা তিনটা করে। তবে অবাক করার মতো হলো যে, এই ঘটনা শুধুমাত্র আমাদের বাড়িতে ঘটছে না। এই রাস্তার সকল বাড়িতেই একই ঘটনা ঘটছে।’’
মিশেলকে উদ্বিগ্ন ও হতাশ বলে মনে হল। সে নিজের অজান্তেই ঘাড় চুলকাচ্ছিল। রিও তাকে জিজ্ঞেস করল যে, সে অসুস্থ্যবোধ করছে কিনা। কিন্তু দারোয়ান কোনক্রমেই তা স্বীকার করল না। নিজের সম্পর্কে তার মত হলো যে, সে মৃত ইঁদুরগুলোর কথা ভেবে কিছুটা চিন্তিত আছে। এই চিন্তা থেকে তার মুক্তি পাওয়া তখনই সম্ভব হবে, যখন সেগুলো গর্তগুলো হতে বের হয়ে এসে যেখানে সেখানে মরে যাওয়া বন্ধ করবে।
পরের দিন সকাল। এপ্রিলের ১৮ তারিখ। রিও তার মাকে স্টেশন থেকে বাসায় নিয়ে আসছিল। সে দেখল মিঃ মিশেল তখনও ইঁদুর নিয়ে ব্যস্ত এবং বাসার নীচের ভূগর্ভস্থ কক্ষ হতে শুরু করে চিলেকোঠা পর্যন্ত সিঁড়িতে অনেকগুলো মৃত ইঁদুর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। অন্তত দশ বারটা হবে। এমনকি সে সড়কের পাশে রাখা বাসস্থানের ডাস্টবিনগুলোকেও দেখতে পেল ইঁদুরে পরিপূর্ণ। তবে রিও’র মা বিষয়টিকে সহজভাবেই গ্রহণ করলেন বলে মনে হল।
“কিছু কিছু সময়ে আমি ইঁদুরের মরে যাওয়া অপছন্দ করি না,” অনুভূতিহীনভাবে তিনি বললেন। একজন রূপালী চুলের খর্বকায় আকৃতির মহিলা। আপাতভাবে নম্র চোখের।
“তোমার কাছে আসতে পেরে আমি খুবই খুশী হয়েছি, বার্নার্ড,” তিনি যোগ করলেন। “বিড়ালের বিষয়টি নিয়ে আমার তেমন যায়-আসে না।’’
রিও সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। মা বাসায় থাকলে তার জন্যে সকলকিছুই সহজ হয়ে যায়।
যাই হোক, সে মিউনিসিপ্যাল অফিসে টেলিফোন করল। কীট-মূষিকাদি ধ্বংসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে। একে সে পূর্ব হতেই চিনে। নাম মারসিয়ার। তাকে সে জিজ্ঞেস করল যে, এলাকার ইঁদুরেরা গর্ত হতে বের আসছে এবং খোলা জায়গায় তারা মরে যাচ্ছে – এ সম্পর্কে সে জানে কিনা। রিও দেখলো যে মারসিয়ার এ সম্পর্কে সবই জানে। সত্য বলতে কি সে রিও’র উপরে বিরক্তই হলো এবং তাকে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি কি মনে কর যে, এটা গুরুতর কোন ব্যাপার?”
রিও তাকে কোন নিশ্চিত মতামত দিতে পারলো না। তবে জানাল যে, স্যানিটারি সার্ভিসের উচিৎ বিষয়টা নিয়ে কিছু একটা করা। মারসিয়ার তার সাথে একমত প্রকাশ করলো। এবং বললো, “তুমি যদি সত্যিই মনে কর যে এটা আসলেই বড় সমস্যা, তাহলে এ বিষয়ে আমি একটা সরকারী নির্দেশও জারী করতে পারি।’’
“অবশ্যই এটা বড় ধরণের সমস্যা,” রিও উত্তর করল। আজ সকালেই তার বাসার অস্থায়ী কাজের বুয়া তাকে জানিয়েছে যে, তার স্বামীর ফ্যাক্টরি হতে কয়েক শত মৃত ইঁদুর সংগ্রহ করা হয়েছে।
বলতে গেলে এই সময় হতেই শহরের নাগরিকেরা প্রথম অস্বস্তি প্রদর্শন করতে শুরু করলো। এপ্রিল মাসের ১৮ তারিখ থেকেই প্রচুর সংখ্যায় মৃত ইঁদুর পাওয়া যেতে থাকলো ফ্যাক্টরী ও ওয়্যারহাউজগুলোতে। কিছু কিছু সময়ে বেশকিছু সংখ্যক ইঁদুরকে মেরে ফেলাও শুরু করা হলো। নাগরিকদের মানসিক যন্ত্রনাকে দূর করার জন্যে। শহরতলী থেকে শুরু করে শহরের কেন্দ্রস্থল পর্যন্ত, যেসব গলিতে ডাক্তার কর্তব্য পালনের জন্যে গমনাগমন করে থাকে, তার প্রত্যেকটা রাস্তায় ইঁদুরগুলোকে জমা করা হচ্ছিল ডাস্টবিনের ভেতরে। এর বাইরেও রাস্তার পাশের নর্দমার ভেতরে দীর্ঘ লাইন দিয়ে সেগুলোকে পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছিল।
সেদিন বিকেলের পত্রিকা বিষয়টিকে নিয়ে খবর ছাপল। প্রশ্ন তুলল নগরপিতারা এবিষয়ে কিছু করছেন কিনা। এবং কি ধরণের জরুরী ব্যবস্থা তারা গ্রহন করেছেন এই বিরক্তিকর উপদ্রব থেকে মুক্তি পেতে। বাস্তবে মিউনিসিপ্যালিটি কর্তৃপক্ষ এ সংক্রান্ত কোন কার্যক্রমই সেই সময় পর্যন্ত গ্রহণ করেনি। তবে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে একটা সভা ডেকেছিল। পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করার জন্যে। এরপর শহরের স্যানিটারি কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদান করা হল প্রতিদিন ভোরে মৃত ইঁদুরগুলোকে সংগ্রহ করে চুল্লীতে পুড়িয়ে ফেলার জন্যে। দুটো ট্রাক ব্যবহার করে। কিন্তু অব্যবহিত পরের দিনগুলোতে পরিস্থিতি ক্রমশ আরও খারাপ হতে শুরু করল।
চতুর্থ দিন থেকে ইঁদুরগুলো বের হয়ে এসে মরতে লাগল। বেইসমেন্ট, ভূগর্ভস্থ কুঠুরী ও নর্দমার অন্ধকার হতে সেগুলো সূর্যের আলোতে আগমন করতে থাকল দলে দলে। সাগরের লম্বা ঢেঊয়ের মত সারি বেঁধে। পরিশেষে অসহায় নর্তকীর মতো এক আঙুলে ভর দিয়ে ঘুরপাক খেয়ে পথচারীদের পায়ের কাছে আছড়ে পড়তে লাগলো। মৃত হিসেবে। রাতের বেলায় নগরের অলিতে-গলিতে ইঁদুরদের ক্ষীণ মৃত্যু চিৎকার স্পষ্টভাবে শোনা যেতে লাগল। সকালের আলোতে শরীরগুলো আবিষ্কৃত হল নর্দমার ভেতরে। সারিবদ্ধভাবে সেগুলো মরে পড়েছিল। প্রতিটা মৃত ইঁদুরের মুখেই ছিল রক্তের ছোপ। লাল ফুলের মত।
নর্দমার শেষ প্রান্তেও দেখা গেল কিছু ইঁদুরকে। ইতিমধ্যেই সেগুলো ফুলে উঠেছিল এবং তাদের শরীর পচতে শুরু করেছিল। অবশিষ্ট ইঁদুরগুলোকে পাওয়া গেল শক্ত ও স্থবির হিসেবে। শুধু অলিতে-গলিতে নয়, শহরের ব্যস্ততম এলাকাগুলোতেও দেখা গেল ছোট ছোট মৃত ইঁদুরের স্তূপ। সর্বত্র, সিঁড়ি হতে অবতরনের পথে, বাড়ির বাসস্থানের পেছনের উঠোনে।
কিছু সংখ্যক ইঁদুরকে দেখা গেল সরকারী অফিসের হলঘর, স্কুলের খেলার মাঠ, এমনকি হোটেলের বারান্দাতে। এখানে এসে সেগুলো একাকী মরে গেল। আমাদের নগরের মানুষেরা অবাক হয়ে দেখতে পেল শহরের ব্যস্ত কেন্দ্র যেমন, প্যারেড স্কোয়ার, বুলেভার্ড, সরোবরের পার্শ্ববর্তী এলাকা – সবখানেই বীভৎস ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইঁদুরেরা মরে পড়ে আছে। বিন্দুর মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে।
শহরকে প্রতিদিন সকালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার পর সামান্য সময় বিরতি দিয়ে পুনরায় ইঁদুরগুলো আসতে শুরু করল এবং সারাদিন ধরে এদের সংখ্যা বাড়তে থাকল। রাতে পথে থাকা মানুষেরা প্রতিনিয়ত তাদের পায়ের নীচে গোলাকার ঈষদুষ্ণ নরম শরীরের স্পর্শ অনুভব করতে লাগল। ঠিক যেন পৃথিবী নিজের শরীরের ভেতরে লুকিয়ে রাখা রসিকতা দিয়ে অন্ত্রদেশের ঘরবাড়ীগুলোকে উগড়ে দিচ্ছিল পৃথিবীপৃষ্ঠের উপরে। ফোঁড়া থেকে নির্গত ক্লেদের মত। বর্তমান পর্যন্ত আমাদের শান্ত ছোট শহরের ভয়ার্ত অবস্থা যদি আপনি কল্পনা করেন, তাহলে আপনি আপনি বুঝতে পারবেন যে ওটার অন্তঃস্থল পর্যন্ত কেঁপে গিয়েছিল। আকস্মিক কোন আঘাতে। এটাকে তুলনা করা যেতে পারে একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের হঠাৎ করে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার সাথে, যখন তার রক্তের প্রবাহ দাবানলের মত শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ে।
ব্যাপারটি এতটাই বিস্তৃত হয়ে গিয়েছিল যে, নগরের তথ্যকেন্দ্র (যারা প্রতিটা বিষয়য়েই তাৎক্ষণিক ও যথাযথ উত্তর দিয়ে থাকে) পর্যন্ত এদের সঠিক সংখ্যা বলতে পারলো না। তারা তাদের দৈনন্দিন ঘোষনাই শুরু করলো এভাবে যে, ২৫ এপ্রিল তারিখ সারাদিনে অন্ততপক্ষে ৬,২৩১টি ইঁদুর সংগ্রহ করে পুড়ে ফেলা হয়েছে। এই ধরণের পরিবেশনা বিষয়টির অধিকতর বিস্তৃতি ও বাস্তব অবস্থা আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরত। এই বিশাল সংখ্যা সাধারণ মানুষের স্নায়ুর উপরে প্রবল ধাক্কা সৃষ্টি করতেও সমর্থ ছিল। ফলে জনসাধারণ শুধুমাত্র দৈবের উপরে নির্ভর করা শুরু করে দিল। তারা মেনে নিল যে, পুরো ব্যাপারটাই অদ্ভুত। এর উৎস ও বিস্তৃতি সম্পর্কে প্রকৃত ধারণালাভ করা অসম্ভব। শুধুমাত্র সেই স্পেনীয় রোগী, যাকে এজমার রোগী হিসেবে রিও চিকিৎসা করছিল, সে তার হাত ঘষতে ঘষতে মুখ টিপে হাসতে হাসতে বললো, “তারা বেরিয়ে আসছে, তারা বেরিয়ে আসছে।”
২৮ এপ্রিল তারিখে তথ্যকেন্দ্র থেকে ঘোষণা করা হল যে, উক্ত দিনে ৮,০০০ ইঁদুর সংগ্রহ করা হয়েছে। খবরটি পুরো শহরকে শোকার্ত করে তুলল। নাগরিকরা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানাল। তারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ঢিলেমি করার অভিযোগ আনল। সমুদ্র উপকূলে যাদের বাড়ি ছিল, তারা সেখানে চলে যাওয়ার জন্যে মনঃস্থির করল। কিন্তু পরদিনই তথ্যকেন্দ্র হতে জানানো হল যে, হঠাৎ ইঁদুর মরে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে এবং স্যানিটারি কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র কয়েকটা ইঁদুর সংগ্রহ করতে সমর্থ হয়েছে। সবাই তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।