নক্ষত্রের রাত

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৫ জুন ২০২১,   আষাঢ় ২ ১৪২৮,   ০৩ জ্বিলকদ ১৪৪২

নক্ষত্রের রাত

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২৩:১৫ ১৮ মে ২০২১   আপডেট: ২৩:১৬ ১৮ মে ২০২১

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

মানুষের স্মৃতিগুলো আসলেই অদ্ভুত। মস্তিষ্কের কোনো গভীর নির্জনে হিম হয়ে বসে থাকে। মনেই হয় না যে, কখনও  তারা সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারে। কিন্তু ঠিকই অকস্মাৎ অনির্দেশ্য কোনো এক অভিজ্ঞানের অভিঘাতে নির্ঝরের কলতান হয়ে বেরিয়ে আসে। এটা ঠিক যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্মৃতিগুলো পরম্পরাহীন। স্বপ্নের মত। 

কোনোক্রমেই এদেরকে ক্রম-পরিবর্তনশীল সময়ের ঘড়িতে স্থাপন করা সম্ভব নয়। গুরুত্ব অনুসারে তো নয়ই। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি বাদ দিয়ে এই মুহূর্তে শুধুমাত্র মনে পড়ছে একটি দিনের একটি খণ্ডিত দৃশ্যপট। বাকী সকল কিছুই অস্পষ্ট।
   
আজ ১৮ মে। আমার কোর্স ১২তম দীর্ঘমেয়াদী কোর্স। ১৯৮৫ সালের এইদিনে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমীতে (বিএমএ) অনুষ্ঠিত পাসিং আউট প্যারেডের মধ্যদিয়ে শুরু হয়েছিল আমাদের সামরিক জীবন। ১৯ মে ১৯৮৫ সাল হতে। দিনটিকে স্মরণ করে আমার চাকরিজীবনের শুরুর দিকের একটি খণ্ডিত স্মৃতি শেয়ার করছি আপনাদের সাথে। সম্ভবত ব্যর্থতার স্মৃতি!

আমি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট। আমার ইউনিটের নাম ৫ সিগন্যাল ব্যাটালিয়ন, চট্টগ্রাম সেনানিবাস। সেনানিবাস থেকে উত্তরে অবস্থিত হাটহাজারী এলাকায় ‘টেম্পল হিল’ (আসলে নাম অন্য। মূলত একটা টিলা। সামরিক ম্যাপে ট্রিগ হাইট ৫০ ফুট দেয়া আছে।)। এর উপরে একটা মন্দির আছে। মন্দিরের চারপাশটা নানা ধরণের ফুলের গাছ দিয়ে সাজানো। ফুলের গন্ধে রাত দশটার দিকেই আমাদের চোখে নিবিড় ঘুম চলে আসে। আমরা এটাকে মার্ক করেছি ‘টেম্পল হিল’ নামে। শীতকালীন প্রশিক্ষণ যৌথ প্রশিক্ষণ।
আমার ইউনিটের উপ-অধিনায়ক মেজর মুহিব। উনি প্রমাণ ছাড়া অধীত বিদ্যায় বিশ্বাস করেন না। ফিল্ড পর্যায়ে যোগাযোগের জন্যে বাংলাদেশে সেনাবাহিনীতে সে সময়ে ব্যবহৃত হত ফিল্ড টেলিফোন তার WD-1/TT। এর মাধ্যমে ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত টেলিযোগাযোগ প্রদান করা সম্ভব। অনুশীলনের তৃতীয় অথবা চতুর্থ রাত। রাত বারোটার দিকে তিনি আমাকে তার তাবুতে ডাকলেন। ঘুমাতে যাবার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। আমিও। আমাকে বললেন, ‘আসাদ, একটা পিক-আপে করে কয়েক ড্রাম তার এবং একটা ফিল্ড টেলিফোন নাও। রাস্তায় তার বিছাতে বিছাতে এগিয়ে যাবে। প্রতি কিলোমিটার অতিক্রম করার পর তুমি ফিল্ড এক্সচেঞ্জে রিং করে জানাবে তুমি কতদূর গিয়েছ। তবে সাবধান। গাড়ি ড্রাইভার চালাবে। তুমি ভুলেও ড্রাইভিং সিটে বসবে না।’

আমি এমনিতেও গাড়ি চালাতে আগ্রহী নই। দুইদিন পূর্বে এই প্রশিক্ষণ এলাকাতেই এম-৩৮ নামক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালের একটা জীপ চালানোর চেষ্টা করেছিলাম। প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে। ভাল লাগেনি। গাড়ির দ্বিতীয় আসনধারী হিসেবেই আমার আনন্দ বেশি। যে কোনো ধরণের চিন্তাভাবনার ভেতরে নিমজ্জিত থাকা যায়। চারপাশের প্রকৃতি অবলোকন করা যায়। পূজার মৌসুম চলছে। সম্ভবত লক্ষ্মী পূজা। চারদিক থেকে মাইকে পূজার গান ভেসে আসছে। ভক্তিমূলক গান। আকাশে প্রবল জ্যোৎস্না। নক্ষত্রে ছেয়ে আছে রাতের আকাশ। গান শুনতে শুনতে আমি অতীন্দ্রিয়লোকে হারিয়ে যাই। তন্দ্রাচ্ছন্নতা আমাকে আক্রমণ করে। মনে হয় যে, গাড়ির দ্বিতীয় আসনে বসেই আমি ঘুমিয়ে পড়তে পারি। চিরকালের জন্যে। কোনো ধরণের পিছুটান ছাড়া। গাড়িটি যদি দুর্ঘটনায় পতিত হয়, তবে কোর্ট অব ইনকোয়ারি হবে। ইউনিট কর্তৃপক্ষ ড্রাইভারকে আর আমাকে শাস্তি দেবেন। আমাকে দোষের ৫০% অংশভাগী হতে হবে। তারপরেও ভয় আমার ভেতরে কোনো ভাবনার সৃষ্টি করে না।

আমি ড্রাইভারকে নিয়ে চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়কে নেমে গেলাম। রাতের অন্ধকারে বড় বড় ট্রাক আসছে-যাচ্ছে। মেজর মুহিব আমাকে নির্দেশ দিয়ে তাবুর ভেতরে ঢুকলেন। ঠোঁটের কোণায় ক্রূর হাসি। এই প্রায়ান্ধকারেও বোঝা যাচ্ছে। ভেতরে ঢুকেই তিনি কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। সকাল সাড়ে চারটার দিকে তাকে ঘুম থেকে উঠতে হবে। ইউনিটের সকল অফিসারেরা স্ট্যান্ড টু’তে ঠিকমত হাজির হয়েছে কিনা তা চেক করার জন্যে। 

উল্লেখ্য, প্রতিদিন সূর্যোদয়ের পূর্বে সুবহে সাদেকের সময়ে ইউনিটের সকল সদস্যরা নির্ধারিত স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে পেরিমিটার ডিফেন্সের অংশ হিসেবে। সম্পূর্ণ সশস্ত্র অবস্থায়। যেকোনো দিক হতে আসা শত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণকে মোকাবেলা করার জন্যে। উল্লেখ্য, পৃথিবীর সকল কনভেনশনাল সেনাবাহিনীই আলো অন্ধকারের এই দ্বন্দ্বের সময়ে শত্রুর প্রতিরক্ষা অবস্থানের উপরে আক্রমণ করে থাকে। ব্যতিক্রম খুব কমই আছে। আমার ফিরতে ফিরতে হয়তো বা সকাল হয়ে যাবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ব বিদ্যালয়ের কাছাকাছি আসার পর গাড়ি নিয়ে মহাসড়ক থেকে এলজিইডির রাস্তায় নেমে গেলাম। মোটামুটি একটা সরল পথে। অন্তত ৩০ কিলোমিটার গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করলাম। একটা নদীর সমান্তরালে। প্রতি এক কিলোমিটার এরিয়াল ডিসটেন্স অতিক্রম করার পিক আপ থামানো হচ্ছিল। ব্যাকসিট থেকে ফিল্ড টেলিফোনের হ্যান্ড জেনারেটর ঘুরিয়ে ব্যাটালিয়ন সদরদপ্তরে স্থাপিত এক্সচেঞ্জের অপারেটরের সঙ্গে কথা বলি। সে কাউকে জানায় কিনা, তা আমি জানি না।

রাত তিনটের দিকে আমরা নদীর পাড় ঘেঁষে চলা মাটির  রাস্তার উপরে আসলাম। চারদিকে নির্জন। রাত খুবই গভীর। মাইকে পূজার গান আর বাজছে না। জলের বয়ে চলা শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।  দ্বিতীয় আসনে বসে থাকতে থাকতে আমার চোখে প্রবল ঘুম চলে এসেছে। আমি ড্রাইভারকে বললাম, ‘তুমি সেকেন্ড সিটে বস। আমি গাড়ি চালাব। ‘ড্রাইভার অবাক।’ বলল, ‘স্যার, আপনি গাড়ি চালাতে পারেন? আপনাকে তো উপ অধিনায়ক স্যার গাড়ি চালাতে নিষেধ করে দিলেন।’ আমি তাকে বললাম, ‘হ্যাঁ, তিনদিন আগে আমি গাড়ি চালানো শিখেছি। টেম্পল হিল এলাকায়। তোমাকে এটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।’

অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে দ্বিতীয় আসনে গিয়ে বসল। আমি ড্রাইভিং আসনে। মাটির রাস্তা দিয়ে আমার গাড়ি চালাতে ভালই লাগছিল। যদিও আমি ভাল গাড়ি চালাতে পারি না, তবুও আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে এই গভীর রাতে। অনেকক্ষণ মোহচ্ছন্নতার ভেতরে গাড়ি চালাতে চালাতে আমি হয়তবা ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। ড্রাইভারের ডাকে তন্দ্রা কেটে গেলো। ‘স্যার, গাড়ির বাম দিকের চাকা নদীর পানির ভেতরে ঢুকে গেছে।’ দ্রুত গাড়ি থেকে নামলাম। জোয়ারের জল নদীর পাড় পর্যন্ত উঠে এসেছে। এটি সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা। নিয়মিত জোয়ার-ভাটা হয়। আমি জানতাম না। ড্রাইভার জানালো গাড়ি সরাতে গেলে খালের জলের ভেতরে ডুবে যাবে।

উপায়ান্তর না দেখে আমি ফিল্ড টেলিফোনের অপারেটরকে বললাম ব্যাটালিয়ন সদর দফতরের এক্সচেঞ্জের সাথে সংযোগ করাতে। রাত তখন সাড়ে তিন অথবা চার ঘটিকা। আমরা প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করেছি। এডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন হান্নান। তাকে ঘুম থেকে তুলে জানাতেই তিনি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। বললেন, ‘তোমাকে তো এখন পুরো ব্যাটালিয়ন নিয়ে গিয়ে উদ্ধার করে আনতে হবে।’ আমি নিশ্চুপ। রাত চারটার দিকে কোয়ার্টার মাস্টার ক্যাপ্টেন জামান স্যার এলেন। ব্যাটালিয়নের ইলেক্ট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল সেকশন নিয়ে। গাড়ি ও আমাদেরকে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে। 

‘দেয়ালির আলো মেখে নক্ষত্র গিয়েছে পুড়ে কাল সারারাত 
কাল সারারাত তার পাখা ঝরে পড়েছে বাতাসে 
চরের বলিতে তাকে চিকিচিকি মাছের মতন মনে হয় 
মনে হয় হৃদয়ের আলো পেলে সে উজ্জ্বল হতো। 
সারারাত ধরে তার পাখাখসা শব্দ আসে কানে  
মনে হয় দুর হতে নক্ষত্রের তামাম উইল 
উলোট-পালোট হয়ে পড়ে আছে আমার বাগানে।’ – শক্তি চট্টোপাধ্যায়

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআর