দ্য প্লেগ (দ্বিতীয় পর্ব)

ঢাকা, সোমবার   ১৭ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৩ ১৪২৮,   ০৪ শাওয়াল ১৪৪২

দ্য প্লেগ (দ্বিতীয় পর্ব)

মূলঃ আলবেয়ার কামু  

অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:৪১ ১৬ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৩:১৮ ৬ মে ২০২১

দ্য প্লেগ 

দ্য প্লেগ 

এপ্রিল মাসের ১৬ তারিখের সকাল। সার্জারি কক্ষ হতে বের হবার সময়ে ডাক্তার বার্নার্ড রিও তার পায়ের নীচে নরম কিছু একটা অনুভব করল। সিঁড়িতে নামার পথের জায়গায়। একটা মৃত ইঁদুর। মুহুর্তের উত্তেজনায় সে সেটাকে পা দিয়ে একদিকে সরিয়ে দিল। অতঃপর কোনধরণের ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই নীচ তলার দিকে এগিয়ে গেল। তবে মহাসড়কে উঠার সময়ে তার মনে হল যে, মৃত ইঁদুরটির কোনক্রমেই সিঁড়িতে নামার স্থানে থাকার কথা নয়। সুতরাং সে ফিরে গেল এবং বিল্ডিং এর প্রহরী মিঃ মিশেলকে বলল সেটাকে ওখান থেকে সরিয়ে ফেলতে। মিঃ মিশেল সিঁড়ির কাছে মৃত ইঁদুরের অবস্থানের বিষয়ে প্রবল বিস্ময় প্রকাশ করলেন। এর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত ডক্টর রিও বুঝতেই পারছিল তার সদ্য আবিষ্কারের অদ্ভুত প্রকৃতি সম্পর্কে। তবে ব্যক্তিগতভাবে সে মনে করেছিল যে, সিঁড়ির দোরগোড়ায় একটা মৃত ইঁদুরের পড়ে থাকার বিষয়টা অস্বাভাবিক। এই পর্যন্তই। কিন্তু প্রহরী মিশেল খুবই রেগে গেল এবং রাখঢাক না করেই বলল, “ওখানে কোন ইঁদুর থাকার প্রশ্নই উঠে না।“ কাজেই বৃথাই ডাক্তার তাকে নিশ্চিত করার চেষ্টা করল যে, আসলেই সেখানে একটা ইঁদুর ছিল এবং সম্ভবত তা ছিল  মৃত।

“এই বিল্ডিং এ কোন ইঁদুর নেই,” মিশেল জোর দিয়ে পুনরাবৃত্তি করল।

অবশ্য ইঁদুরটাকে দেখার পর মিশেল খুবই অবাক হল এবং বলল যে, হয়ত বা কেউ সেটাকে বাইরে থেকে এনে এখানে ফেলে গিয়েছে। সম্ভবত কোন বাচ্চাছেলে। কৌতুক করার উদ্দেশ্যে এটা করেছে।  

সেদিন বিকেলে ডাক্তার রিও বিল্ডিংটির প্রবেশদ্বারের কাছে দাঁড়িয়েছিল। নিজের এপার্টমেন্টে উঠার পূর্বে পকেটে চাবি হাতড়াচ্ছিল সে। ঠিক এই সময়েই সে দেখতে পেল যে, একটা বড় আকারের ইঁদুর তার দিকে ছুটে আসছে। গমনপথের অন্ধকার প্রান্ত হতে। খুবই অগোছালোভাবে এগিয়ে আসছিল সেটা। তার শরীরের লোমগুলো ছিল ভেজা। রিওর কাছাকাছি এসে ইঁদুরটি থামল এবং নিজের শরীরের ভারসাম্য ঠিক করার চেষ্টা করল। তারপর আরেকটু এগিয়ে আসল ডাক্তারের দিকে। পুনরায় থামল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের চারপাশ দিয়ে ঘুর্ণন দিয়ে একদিকে কাঁত হয়ে পড়ে গেল। ইঁদুরটির মুখ সামান্য খোলা ছিল। সেখান থেকে রক্ত ঝরছিল। কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষন করার পর ডাক্তার রিও উপরের তলায় উঠে গেল। ইঁদুরটি নিয়ে কোন চিন্তা করছিল না সে। রক্ত ঝরার দৃশ্যটি তার চিন্তাকে অন্য একটা বিষয়ের দিকে ধাবিত করেছিল। এই বিষয়টা নিয়েই সে সারাদিন চিন্তা করেছিল।

ডাক্তারের স্ত্রী বিগত কয়েক বছর যাবৎ অসুস্থতায় ভুগছিল। পরদিন সকালে সে তাকে পাহাড়ের ভেতরে অবস্থিত  একটি স্বাস্থ্যনিবাসে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বাসায় ফেরার পর রিও দেখতে পেলো তার স্ত্রী বিছানায় শুয়ে আছে। অবসর নিচ্ছে, ঠিক যেভাবে রিও তাকে উপদেশ দিয়েছিল অবসর নিতে। পরেদিনের ক্লান্তিকর ভ্রমণের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে। রিওকে দেখে সে মৃদু হাসল। 
“আজ আমি খুবই ভাল বোধ করছি,” স্ত্রী বলল।

স্ত্রীর মুখের দিকে তাকাল রিও। স্ত্রীও পাশের ল্যাম্পের আলোতে মুখ ফিরিয়ে রিও’র পানে তাকাল। তার বয়স তিরিশ বছর। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা তার মুখের উপরে একটা মলিন ছাপ ফেলে দিয়েছিল। তারপরেও রিও’র মনে হলো যে, স্ত্রীকে খুবই অল্পবয়সী লাগছে। ঠিক যেন ছোট্ট একটা শিশু। 

“এখন একটু ঘুমানোর চেষ্টা কর,” তাকে পরামর্শ দিল। “নার্স আসবে এগারোটায়। তোমাকে দুপুরের ট্রেন ধরতে হবে।“স্ত্রীর ভেজা কপালে সে চুমু দিল। স্ত্রীর মৃদু হাসি তাকে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিল।

পরের দিন, ১৭ এপ্রিল তারিখে, সকাল আটটার সময়ে বাসা হতে বের হবার সময়ে প্রহরী মিশেল তার মনযোগ আকর্ষণ করল। 
“কয়েকটা দুষ্ট ছেলে,” সে বলল, “তিনটা মৃত ইঁদুর হলঘরের ভেতরে ফেলে গেছে।“ এটাও জানাতেও সে  ভুলল না যে, ইঁদুরগুলোকে কেউ একজন শক্ত স্প্রিং দিয়ে তৈরী ফাঁদ পেতে ধরেছিল এবং সেগুলোর মুখ দিয়ে অনবরত রক্ত ঝরছিল।

প্রহরী দরজার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল হাত দিয়ে ইঁদুরগুলোর পা ধরে। এই সময়ে সে সারাক্ষণই সে রাস্তার উপরে পথচারীদের দিকে তাকাচ্ছিল, যাতে সেই দুষ্কৃতিকারী শিশুদেরকে ধরতে সমর্থ হয়। তাদের অসচেতন মূহুর্তের মৃদু হাসি বা  মুখের অভিব্যক্তি ব্যবহার করে। 

“আমি ওদেরকে ধরবই,” মিশেল আশান্বিতভাবে বলল। 

হঠাত করে রিও সিদ্ধান্ত নিল শহরের প্রান্ত এলাকা দিয়ে ঘুরে আসতে। সেখানে তার গরীব রোগীরা বাস করে। এই বিলম্বিত সকালে গাড়ি নিয়ে সেই এলাকায় গেল। রোগী দেখার নাম করে। পথিমধ্যে সে ফুটপাতের পাশে সারি করে রাখা ময়লা ফেলার ডাস্টবিনগুলোর দিকে তাকাল। এক জায়গায় শুধুমাত্র একটা রাস্তার পাশেই সে ডজন খানেক মৃত ইঁদুর দেখতে পেল। সেগুলোকে কেউ সব্জি ও অন্যান্য আবর্জনার উপরে ফেলে রেখে গিয়েছিল।

সে তার প্রথম রোগীর বাড়িতে গেল। দীর্ঘকাল ধরে এই রোগী এজমা রোগে ভুগছিল। রিও তাকে দেখতে পেল  একটা রুমের ভেতরে শুয়ে থাকতে। রুমটিকে একইসাথে ডাইনিং রুম ও বেডরুম হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। রোগী লোকটির চেহারা কঠিন ও মুখের আকৃতি এবড়ো-থেবড়ো ধরণের। স্পেনদেশীয়। রিও ঘরে প্রবেশ করার সময়ে সে উঠে বসার চেষ্টা করল। হাঁপাতে হাঁপাতে এবং সাঁসাঁ করে নিঃশ্বাস নিতে নিতে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে, তার শ্বাস নিতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল। এই সময়ে তার স্ত্রী এক গামলা জল নিয়ে আসল।

“ডাক্তার,” লোকটি বলল, যখন রিও ইনজেকশন পুশ করছিল,“ ওরা বের হয়ে আসছে, তুমি কি লক্ষ্য করেছ?”

“ইঁদুরের কথা বলতে চাচ্ছে সে,” তার স্ত্রী ব্যাখ্যা করল। “আমাদের উল্টোদিকের বাসায় তিনটে পাওয়া গেছে।’’
“ওরা বের হয়ে আসছে। তুমি সেগুলোকে দেখতে পাবে ডাস্টবিনগুলোতে।“

কিছুক্ষণ অবস্থান করার পরেই রিও আবিষ্কার করতে সমর্থ হল যে, ইঁদুর নিয়ে এই এলাকায় প্রবল আলোচনা চলছে। পুরো এলাকা ঘুরে দেখার পর সে গাড়ি চালিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরে এল।

“উপরে তোমার জন্যে একটা টেলিগ্রাম আছে,” মিঃ মিশেল জানালো।
 ডাক্তার তাকে জিজ্ঞেস করল সে আর কোন ইঁদুর দেখেছে কিনা। 

“না, দারোয়ান উত্তর করল, ”আর একটাও দেখিনি আমি। তবে  আমি কড়া নজর রাখছি।’’

টেলিগ্রাম থেকে রিও জানতে পারল যে, পরের দিন তার মা আসবেন। তিনি রিও’র স্ত্রীর সাময়িক অনুপস্থিতির সময়ে ছেলের সংসার দেখেশুনে রাখবেন। ঘরে ঢুকতেই রিও দেখতে পেল যে, নার্স চলে এসেছে। নিবিড় দৃষ্টিতে সে  স্ত্রীর দিকে তাকাল। স্ত্রী দর্জি দিয়ে বানানো একটা জামা পরেছিল। রিও খেয়াল করল যে, সে ঠোঁটে লাল লিপস্টিক দিয়েছে। রিও তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল এবং বলল, “চমৎকার, তোমাকে অসাধারণ লাগছে।’’

কয়েক মিনিট পর সে স্ত্রীকে একটা স্লিপিং কারের (শয়ন যান) ভেতরে শুইয়ে দিল। স্ত্রী কারের কুঠুরিটির চারদিকে তাকিয়ে বলল, “এটা আমাদের জন্যে খুবই ব্যয়বহুল, তাই না?”

“এটা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না,” রিও উত্তর করল।

“এই যে ইঁদুরের গল্প শুনছি, এগুলো কি?” স্ত্রী বলল।

“আমি তোমকে ব্যাখ্যা করতে পারব না। অবশ্যই এটা একটা অদ্ভুত সমস্যা। তবে আমি নিশ্চিত যে, এটা দ্রুতই  শেষ হয়ে যাবে।“
তারপর সে স্ত্রীকে অনুরোধ করল তাকে ক্ষমা করে দেয়ার জন্যে। অনুভব করে যে, তার উচিৎ ছিল স্ত্রীকে আরও ভালভাবে দেখাশুনা করার। এ বিষয়ে সে আসলেই কিছুটা অমনোযোগী ছিল। স্ত্রী মাথা নাড়ল, রিও’র কথার প্রতিবাদ করার উদ্দেশ্যে।

তখন সে বলল, “যাই হোক, তুমি ফিরে আসার পর সবকিছুই আরও ভাল হবে। আমরা সবকিছুই নতুন করে শুরু করব।’’

“অবশ্যই,” স্ত্রীর চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। কিন্তু সে মাথা ঘুরিয়ে নিল। রিওর মনে হল যে, কারের জানালা দিয়ে সে বাইরের প্লাটফর্মের দিকে তাকিয়ে আছে। সেখানে কয়েকজন লোক পরস্পরের সাথে ধাক্কাধাক্কি করছিল। দ্রুত চলে যাওয়ার জন্যে। গাড়ির হিসহিস ধ্বনি ইতিমধ্যেই তাদের কানে পৌঁছে গিয়েছিল।

রিও ভদ্রভাবে স্ত্রীকে তার প্রথম নাম ধরে ডাকল। স্ত্রী ফিরে তাকালে সে দেখতে পেল তার মুখ ভিজে গেছে অশ্রুতে। 
“কেঁদো না,” সে বিড়বিড় করে বলল।

অশ্রুর পেছন থেকে স্ত্রীর মুখে মৃদু হাসি ফিরে আসল। যদিও কিছুটা অস্থির। রিও একটা দীর্ঘশ্বাস টানল।

“এখন যাও। সবকিছু দ্রুতই ঠিক হয়ে যাবে।’’
স্ত্রীকে মূহুর্তের জন্যে নিজের বাহুর ভেতরে জড়াল। তারপর প্লাটফর্ম থেকে সরে গেল। এই মূহুর্তে সে শুধুমাত্র স্ত্রীর মৃদু হাসি দেখতে পাচ্ছিল। জানালার ভেতর দিয়ে।

“প্লিজ প্রিয়া,” সে বলল, “নিজের যত্ন নেবে।’’
স্ত্রী তাকে শুনতে পেল না।

স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ত্যাগ করে বের হবার ফটকের কাছে পৌঁছুতেই রিও দেখতে পেল পুলিশের ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ ওথোনকে। তিনি ছোট একটি বালককে হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন। সে তাকে জিজ্ঞেস করল যে, তিনি চলে যাচ্ছেন কিনা। দীর্ঘদেহী ও কাল বর্ণের মিঃ ওথোনের অভিব্যক্তির ভেতরে এমন কিছু ছিল, যার কারণে নগরের লোকজন তাকে খুবই কঠিন মানুষ, এমনকি আজরাইলের সহকারী বলেও মনে করত।

“কোন ইঁদুরগুলো?” সে বলল।
সেই মূহুর্তেই রিও দেখতে পেল যে, ট্রেনের একজন পোর্টার এক বাক্সভর্তি মরা ইঁদুর বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। 

দ্য প্লেগ (প্রথম পর্ব)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ/এসআর