ঢাকা,  শনিবার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ নারী নক্ষত্র ]

নারীর উপার্জন আত্মমর্যাদা ও সক্ষমতার ভিত্তি

জাহানারা নাসরিন
প্রকাশিত: ১৩:০৯, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নারীর উপার্জন আত্মমর্যাদা ও সক্ষমতার ভিত্তি
নারীর উপার্জনকে সংসারের জন্য অতিরিক্ত আয় হিসেবে না দেখে তার আত্মমর্যাদা ও সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখা দরকার। একজন নারী নিজের শ্রমের বিনিময়ে আয় করলে তিনি শুধু নিজের জীবনকে একটু সহজ করেন না, নিজের পছন্দ ও সিদ্ধান্তের জায়গাটিও শক্ত করেন।

শিক্ষা, দক্ষতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আত্মমর্যাদা একজন নারীকে সেই শক্তি দেয়। তাই মেয়েদের শুধু সংসার সামলানোর শিক্ষা নয়, জীবন সামলানোর শিক্ষাও প্রয়োজন। নিজের পছন্দ-অপছন্দ, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতন হওয়া কোনো স্বার্থপরতা নয়—এটি নিজের প্রতি দায়িত্ব।

একজন কর্মজীবী নারী সংসারের খরচে অবদান রাখলে তার কাজের মূল্য চোখে পড়ার মতো হয়ে ওঠে, কিন্তু তার মর্যাদা শুধু টাকা দেওয়ার কারণে নয়, মানুষ হিসেবে তার অবদান স্বীকার করার মধ্যেই আসল সম্মান। 

Advertisement

একজন নারীর স্বাবলম্বিতা শুধু নিজের উপার্জনের সক্ষমতা নয়; এটি নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া, নিজের অধিকার বোঝা এবং প্রয়োজনের সময়ে নিজের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর শক্তি। জীবনে কখনো কখনো এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি আসে, যেখানে নীরবে সহ্য করে যাওয়াই একমাত্র পথ নয়। বরং সচেতনতা, আত্মবিশ্বাস ও সাহস নিয়ে সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধিকার।

নারীর উপার্জন তাকে শুধু নিজের প্রয়োজন মেটানোর ক্ষমতা দেয় না, অনেক সময় সন্তান ও পরিবারের কঠিন সময়েও ভরসার জায়গা তৈরি করে। স্বামীর আয় বন্ধ হয়ে গেলে, সংসারে বিপদ এলে কিংবা হঠাৎ বড় কোনো খরচ সামনে এলে একজন উপার্জনকারী নারী পরিবারের জন্য শক্ত সহায়তা হয়ে দাঁড়াতে পারেন। 

একজন স্বাবলম্বী নারী অন্য কারও বিরুদ্ধে দাঁড়ান না; তিনি প্রয়োজন হলে নিজের পক্ষে দাঁড়াতে শেখেন। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে নেওয়াই সাহস। কারণ একজন নারী কারও বোঝা নন—তিনি নিজেই নিজের জীবনের শক্ত ভিত।

  • একই সঙ্গে নিজের উপার্জন থাকলে সমাজের প্রচলিত কিছু অন্যায় কথা বা চাপকে তিনি আগের চেয়ে দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করতে পারেন। উপার্জনকারী নারী সাধারণত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং পারিবারিক পরিকল্পনা নিয়ে নিজের মত প্রকাশের আরও সুযোগ পান। 

বাংলাদেশের ২০০৭ থেকে ২০১৭–১৮ সালের BDHS তথ্য বিশ্লেষণ করা একটি গবেষণায় নারীর পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায় সামগ্রিক উন্নতির চিত্র পাওয়া গেছে। 

তবে নারীর হাতে টাকা থাকলেই যে সব শোষণ শেষ হয়ে যাবে, এমন ধারণাও ঠিক নয়। কারণ অর্থনৈতিক ক্ষমতার পাশাপাশি শিক্ষার সুযোগ, আইনি অধিকার, পারিবারিক সম্মান, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং নিজের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতাও প্রয়োজন।

যে নারী নিজের শ্রমে আয় করেন, তার সামনে জীবনের কঠিন সময়ে বিকল্প পথ খোলা থাকে। তিনি প্রয়োজনের সময় অন্যের করুণার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকেন না। 

নিজের আয় অনেক সময় একজন নারীকে অন্যায় মেনে নেওয়ার বদলে প্রশ্ন করতে এবং নিজের অধিকারের কথা বলতে সাহস দেয়। তাই নারীর উপার্জনকে শুধু অর্থনৈতিক বিষয় হিসেবে দেখলে এর সামাজিক গুরুত্ব অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়।

একজন নারীর নিজের উপার্জন শুধু সংসারে কিছু টাকা যোগ করার বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আত্মসম্মান, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং নিজের জীবনের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ।  

বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের নিয়ে Marcel Fafchamps ও Christopher Udry-এর গবেষণায় দেখা গেছে, নিজের অর্জিত আয় নারীর পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতে পারে, বিশেষ করে যখন সেই কাজ স্বামীর কাজের ওপর নির্ভরশীল নয়। ২০০৯ সালে Journal of Development Economics-এ প্রকাশিত ওই গবেষণায় বাংলাদেশের গ্রামীণ তথ্য ব্যবহার করে আয়, কর্মসংস্থান ও নারীর স্বায়ত্তশাসনের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়। 

অর্থাৎ নিজের উপার্জনের সঙ্গে নিজের মতামতের মূল্যও বাড়তে পারে। একজন নারী যখন নিজের চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্য অন্তত কিছু অর্থ নিজে জোগাড় করতে পারেন, তখন তার আত্মবিশ্বাসও শক্ত হয়। এই আত্মবিশ্বাসই ধীরে ধীরে তাকে পারিবারিক ও সামাজিক অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার মানসিক শক্তি দেয়।

  • অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা অনেক সময় মানুষকে এমন সম্পর্কেও আটকে রাখে, যেখানে সে সম্মান বা নিরাপত্তা পাচ্ছে না। নিজের আয় থাকলে একজন নারী অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করার পাশাপাশি প্রয়োজনে নিরাপদ আশ্রয়, আইনি সহায়তা বা নতুন জীবনের ব্যবস্থা করার কিছুটা সুযোগ পান। 

২০২২ সালে Trauma, Violence, & Abuse জার্নালে প্রকাশিত Isabel Eggers del Campo ও Janina Isabel Steinert-এর ১৯টি র‌্যান্ডমাইজড নিয়ন্ত্রিত গবেষণার মেটা-অ্যানালাইসিসে মোট ৪৪,৭৭২ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন সামগ্রিকভাবে শারীরিক, যৌন ও মানসিক সঙ্গী-সহিংসতার ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে সব পরিস্থিতিতে একই ফল পাওয়া যায় না, তাই উপার্জনের পাশাপাশি নিরাপত্তা, সামাজিক সচেতনতা ও সহায়ক পরিবেশও জরুরি। 

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও গবেষণায় দেখা গেছে, শ্রমবাজারে প্রবেশের পর কম শিক্ষা বা অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া নারীদের ক্ষেত্রে কিছু পরিস্থিতিতে পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তবে কর্মজীবী নারীকে নিরাপদ কর্মপরিবেশ না দিলে বা তার আয় অন্য কেউ জোর করে নিয়ন্ত্রণ করলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার উদ্দেশ্য অনেকটাই দুর্বল হয়ে যায়। 

  • ২০০৮ সালে Seema Vyas ও Charlotte Watts-এর Journal of International Development-এ প্রকাশিত পর্যালোচনায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ৪১টি এলাকার গবেষণা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নারীর শিক্ষা ও পারিবারিক সম্পদের সঙ্গে সহিংসতার ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে, যদিও নারীর আয় ও সহিংসতার সম্পর্ক সব গবেষণায় একরকম ছিল না।

তাই নারীর উপার্জনকে সংসারের জন্য অতিরিক্ত আয় হিসেবে না দেখে তার আত্মমর্যাদা ও সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখা দরকার। একজন নারী নিজের শ্রমের বিনিময়ে আয় করলে তিনি শুধু নিজের জীবনকে একটু সহজ করেন না, নিজের পছন্দ ও সিদ্ধান্তের জায়গাটিও শক্ত করেন। 

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস দিতে পারে এবং প্রয়োজনে বিকল্প পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে প্রকৃত মুক্তির জন্য চাকরি বা ব্যবসার পাশাপাশি শিক্ষা, নিরাপত্তা, আইনি অধিকার, পারিবারিক সম্মান এবং নিজের উপার্জনের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি। যে সমাজ নারীর হাতে উপার্জনের সুযোগ দেয় এবং সেই উপার্জনের মর্যাদা দেয়, সে সমাজ নারীর আত্মবিশ্বাসকে শক্ত করে এবং শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর পথটিও প্রশস্ত করে।

সৌজন্য : SAM Motivation

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!