ঢাকা,  রোববার   ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ বিজ্ঞান বিস্ময় ]

মৃত্যুর পর মানুষ কোথায় যায়- বিজ্ঞান কি উত্তর দিতে পারবে?

আল মামুন রিটন
প্রকাশিত: ১৩:২৫, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মৃত্যুর পর মানুষ কোথায় যায়- বিজ্ঞান কি উত্তর দিতে পারবে?
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে একটা বিষয় স্পষ্ট: জীবন শুধু উপাদানের সমষ্টি নয়। এটা এক প্রবাহমান, সংগঠিত, তথ্যপূর্ণ সিস্টেম যা ভেঙে গেলে, তাকে ফিরিয়ে আনা মানে শুধু “জোড়া লাগানো” নয়, যেন পুরো গল্পটা আবার নতুন করে লেখা। আর সেই গল্পটাই এখনো আমাদের সবচেয়ে বড় অজান

গভীর রাত। আইসিইউ-এর নিস্তব্ধ কক্ষে হঠাৎ মনিটরের রেখা সোজা হয়ে যায়। ডাক্তাররা ধীরে মাথা নাড়েন। “তিনি আর নেই।” কিন্তু এখানেই কি সব শেষ? নাকি এখান থেকেই আসল প্রশ্নটা শুরু?

শরীরটা তো এখনো বিছানায় শুয়ে আছে। হাত, পা, চুল, চোখ— সবকিছু আগের মতোই। প্রতিটি কোষ, প্রতিটি অণু, প্রতিটি রাসায়নিক উপাদান এখনো সেখানে। 

Advertisement

তাহলে যে মানুষটা হাসতেন, কাঁদতেন, গল্প করতেন, ভালোবাসতেন—তিনি কোথায় গেলেন?

এই প্রশ্নটা আমরা সবাই কোনো না কোনো সময় ভেবেছি। আজ চলুন, একটু অন্যরকম এক যাত্রায় বেরিয়ে পড়ি।

-একটা শহরের গল্প। একটা অসাধারণ জটিল শহর। লাখ লাখ রাস্তা, অসংখ্য সংযোগ, আলো, সিগন্যাল, বিদ্যুৎ, তথ্যের প্রবাহ সবকিছু একসাথে নাচছে।

এখন যদি হঠাৎ সেই শহরের সমস্ত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা আর নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র একসাথে ভেঙে পড়ে… তখন কি শুধু ইট-পাথর জোড়া লাগালেই শহরটা আবার আগের মতো সচল হয়ে যাবে?

যাবে না। কারণ শহরটা শুধু ইট-পাথরের সমষ্টি নয়—এটা একটা জীবন্ত ব্যবস্থা। যেখানে তথ্য প্রবাহিত হয়, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, জীবন নাচে। মানবদেহও ঠিক তেমনই।

বাইরে থেকে দেখলে শরীরটা মনে হয় শুধু কোষ, প্রোটিন, পানি আর কিছু রাসায়নিকের সমষ্টি। কিন্তু ভেতরে আছে এক অবিশ্বাস্য জটিল নেটওয়ার্ক।

বিলিয়ন বিলিয়ন নিউরন একে অপরের সাথে কথা বলছে। স্মৃতি তৈরি হচ্ছে। অনুভূতি জাগছে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। আপনি যখন এই কথাগুলো পড়ছেন—আপনার মস্তিষ্কের ভেতরে লক্ষ লক্ষ সংযোগ একসাথে কাজ করছে।

আপনি “আপনি” হয়ে উঠছেন এই সংযোগগুলোর কারণেই।
আপনার প্রথম প্রেমের স্মৃতি, মায়ের মুখ, প্রিয় গানটার সুর, ভয়, স্বপ্ন, রাগ, ভালোবাসা—সবকিছু এই সূক্ষ্ম নেটওয়ার্কে বোনা।
মৃত্যু শুধু হৃদস্পন্দন বন্ধ করে না। এটা ধীরে ধীরে এই পুরো নেটওয়ার্কটাকে ভেঙে দেয়।

প্রথমে অক্সিজেন কমে যায়। তারপর কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপর নিউরনগুলো একে একে তাদের সংযোগ হারাতে শুরু করে। আর একসময়… সেই সূক্ষ্ম তথ্য-নেটওয়ার্ক—যেটা আপনার স্মৃতি, আপনার চেতনা, আপনার অভিজ্ঞতা—সবকিছুকে ধারণ করে—তা ভেঙে পড়ে।

উপাদানগুলো থেকে যায়। কিন্তু তাদের মধ্যে যে সুনির্দিষ্ট বিন্যাস, যে তথ্য, যে সংযোগ— সেটাই হারিয়ে যায়।

ভাবুন, একটা চমৎকার বই। একই কাগজ দিয়ে আপনি একটা হৃদয়ছোঁয়া উপন্যাস বানাতে পারেন… আবার সেই একই কাগজ ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দিতে পারেন।

দুই ক্ষেত্রেই উপাদান একই— কাগজ, কালি। কিন্তু অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা। মৃত্যুর পর মানবদেহের ক্ষেত্রেও তাই ঘটে। 

উপাদানগুলো থাকে, কিন্তু গল্পটা হারিয়ে যায়।

মৃত্যু কোনো এক মুহূর্তে হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা না। এটা একটা প্রক্রিয়া। প্রথম কয়েক মিনিটের মধ্যে কিছু কোষ এখনো বেঁচে থাকতে পারে। কিছু ফাংশন আংশিকভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। এই কারণেই CPR বা জরুরি চিকিৎসার মাধ্যমে অনেককে ফিরিয়ে আনা যায়।

কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সীমার পর ক্ষয় এতটাই গভীর হয়ে যায় যে, সেই সূক্ষ্ম নেটওয়ার্ক আর আগের মতো করে পুনর্গঠন করা সম্ভব হয় না। সময় এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে এসে অনেকে “আত্মা” ধারণাটার কথা ভাবেন। হয়তো এমন কিছু ছিল, যা শরীর ছেড়ে চলে গেছে।

বিজ্ঞান এখানে খুব সতর্ক। বিজ্ঞান বলে থাকে—“আমরা এখনো এমন কোনো সত্তাকে শনাক্ত করতে পারিনি, যাকে আলাদা করে ‘আত্মা’ হিসেবে মাপা বা পরীক্ষা করা যায়।”
এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।

বিজ্ঞান বলে না—“এটা নেই।”
বিজ্ঞান বলে—“আমরা এখনো এর প্রমাণ পাইনি।”

এই দুইয়ের মধ্যে ফারাক বিশাল। বিজ্ঞান কাজ করে পর্যবেক্ষণ দিয়ে, পরীক্ষা দিয়ে, পুনরাবৃত্ত ফলাফল দিয়ে। আপনি যদি কিছু দাবি করেন, সেটা এমনভাবে দেখাতে হবে যাতে অন্য কেউ একই শর্তে একই ফলাফল পায়। আর এখানেই “মৃত্যু” আর “জীবন” সবচেয়ে বড় রহস্য হয়ে দাঁড়ায়।

এখন সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন— বিজ্ঞান কি একদিন সেই মানুষটাকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারবে?

আমরা জানি কীভাবে জীবন থেমে যায়। আমরা বুঝতে পারি কোন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে মৃত্যু ঘটে। কিন্তু আমরা এখনো পুরোপুরি জানি না—কীভাবে সেই জটিল সংগঠনটা আবার শুরু করা যায়, একদম শুরু থেকে, একই মানুষ হিসেবে।

কারণ জীবন শুধু “কী দিয়ে তৈরি” এমন না, বরং “কীভাবে সংগঠিত” সেটা। আর সেই সংগঠনটা এতটাই জটিল, এতটাই সূক্ষ্ম, যে তা আবার নতুন করে বোনা মানে শুধু জোড়া লাগানো নয় পুরো গল্পটা আবার নতুন করে লেখা।

মনিটরের সেই সরল রেখাটা কেবল একটা যন্ত্রের সংকেত না। এটা আসলে একটা জটিল গল্পের শেষ লাইন। এমন একটা গল্প- যেখানে প্রতিটি স্মৃতি, প্রতিটি অনুভূতি, প্রতিটি সিদ্ধান্ত- সবকিছু একসাথে কাজ করছিল। আর সেই গল্পটা থেমে গেলে আমরা শুধু তার উপাদানগুলোকে দেখি। কিন্তু তার অর্থ —তা আর খুঁজে পাই না।

মৃত্যু কি শুধুই এক জৈবিক প্রক্রিয়ার সমাপ্তি? নাকি আমরা এখনো সেই প্রক্রিয়ার গভীরতম স্তরটা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি?

হয়তো ভবিষ্যতে বিজ্ঞান আরও এগোবে। হয়তো আমরা আরও সূক্ষ্মভাবে এই জটিলতাকে বুঝতে পারব। হয়তো এমন প্রযুক্তি আসবে, যা আজ কল্পনাতেও নেই।

কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে একটা বিষয় স্পষ্ট: জীবন শুধু উপাদানের সমষ্টি নয়। এটা এক প্রবাহমান, সংগঠিত, তথ্যপূর্ণ সিস্টেম যা ভেঙে গেলে, তাকে ফিরিয়ে আনা মানে শুধু “জোড়া লাগানো” নয়, যেন পুরো গল্পটা আবার নতুন করে লেখা। আর সেই গল্পটাই এখনো আমাদের সবচেয়ে বড় অজানা।

আপনি কী মনে করেন মৃত্যুর পরে মানুষটা কোথায় যায়? বিজ্ঞান কি একদিন উত্তর দিতে পারবে? 

লেখক : আল মামুন রিটন, বিজ্ঞান বিসয়ক লেখক

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!