ছেলেবেলার আনন্দ ছুঁয়ে যাক প্রজন্মের মননে
আজ ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬। বাবা-মায়ের কাছে শুনেছি – ১৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাতে ঘড়ির কাঁটা যখন ১২টা ছুঁইছুঁই, তখন ঢংঢং শব্দে ঘড়ি জানান দিল রাত ১২টা। আর ঠিক তখনই আমি চিৎকার দিয়ে পৃথিবীতে আমার আগমন বার্তা জানাই।
আমার জন্মক্ষণ নিয়ে একটা প্রশ্ন আমার মাথায় সবসময় ঘুরপাক খেতো। সমাধান বাতলে দেন বাবা। বললেন, “দ্যাখো মা, তোমার, জন্ম হয়েছে ঠিক রাত ১২টায়। ঘড়ির কাঁটা ক্রস করেনি, করলেই তো তোমার জন্মদিন ১৬ সেপ্টেম্বর ধরা হতো।” সেই থেকে বুঝে নিলাম এক অদ্ভুত ক্ষণে আমার জন্ম - ১৫ সেপ্টেম্বর, ঠিক রাত ১২টায়।
জন্মদিন এলেই আমি খুব নস্টালজিয়ায় ভুগি - ছেলেবেলার মজার মজার দিনগুলো মানসপটে ভেসে ওঠে। আহা ছেলেবেলা! কী আনন্দ, কী আনন্দ! কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই, বিধি-নিষেধ নেই! শুধু মজা আর মজা।
.png)
আমাদের ছেলেবেলায় জন্মদিনে কেক কাটতেই হবে, এমন কোনো বাঁধাধরা নিয়ম ছিল না। মাকে দেখতাম, প্রতি বার জন্মদিন এলে নিত্য নতুন আইডিয়া দিয়ে মা দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতেন। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীরা আসতেন। ছোট বড় সবাই বিভিন্ন পর্বে-প্রতিযোগিতায়, খেলাধুলায় অংশ নিচ্ছেন, পুরস্কার পাচ্ছেন। রীতিমতো আনন্দঘন মিলন মেলা। বাসায় ফিরতেন তাঁরা একরাশ আনন্দ-অনুভূতি নিয়ে।
জন্মদিনে যাঁরাই আসতেন, সবাই হাতে করে বই উপহার নিয়ে আসতেন। আমরা ৩ ভাইবোন তো মহাখুশী। সবাই জানতেন Sabih-ul Alam ‘সবিহ্-উল আলম পরিবারে' Sabih-ul Alam বই-ই হলো সেরা উপহার। বিভিন্ন বিশেষ দিনেও বই হতো উপহার। এত্তো এত্তো বই পেয়ে আমরা একটা লাইব্রেরী গড়ে তুললাম, নাম দিলাম ‘নাকসু লাইব্রেরী’।
‘নাকসু’ মানে আমাদের ৩ ভাইবোনের নামের আদ্যক্ষর দিয়ে, নায়কের 'না’ কবিতার' ‘ক’ আর সুমনের ‘সু’। নাকসু লাইব্রেরী এতোটাই পরিচিতি পেলো যে, আমাদের ৩ জনকে সবাই ‘নাকসু’ নামে ডাকতো ও চিনতো। নাকসু লাইব্রেরীতে সব বিষয়ের বই-ই ছিল। বাবা-মাও বই উপহার দিতেন।
নাকসু লাইব্রেরী থেকে অনেকেই বই ধার নিয়ে পড়তেন। আমরা যখন চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকায় পাকাপাকি ভাবে চলে আসি, তখন নাকসু লাইব্রেরীর বই অনেককে উপহার দিয়েছি।
এখন তো কাউকে বিশেষ দিনে বই উপহার দেয়ার কথা ভাবাই যায় না! ১৯৮৯ সালে আমার যখন বিয়ে হয়, তখন আমি ‘কুরআন শরীফ’ থেকে শুরু করে প্রচুর বই উপহার পাই, যেটা আমার ছেলেবেলাকে ক্ষণিকের জন্য উসকে দেয়।
আমি সেই বইগুলো দিয়ে আবারও একটি লাইব্রেরী গড়ি। আসলে বই এর চেয়ে ভালো বন্ধু আর নেই। বই মনের বন্ধ জানালাকে খুলে দেয় । বইপ্রীতির জন্য আমি স্কুল-কলেজ জীবনেই পরিচিত হই - ম্যাক্সিম গোর্কি, জুলভার্ন, মহাশ্বেতা দেবী, আশাপূর্ণা দেবী, লীলা মজুমদার, পার্ল এস বাক, উইলিয়াম শেকসপিয়র, স্যার আর্থার কোনান ডয়েল, আর এল স্টিভেনসন, মেরি শেলি, মার্ক টোয়েন, আলেকজান্ডার দ্যুমা, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, ন্যুট হ্যামসুন, লেভ টলস্টয়, ফিওদর দস্তয়ভস্কি, ভিক্টর হ্যুগো, হ্যারিয়েট বিচারস্টো, উইলিয়াম সিডনী পোর্টার, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মানিক বন্দোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, সমরেশ মজুমদার, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায়, মৈত্রেয়ী দেবী প্রমুখদের লেখার সঙ্গে । পাশাপাশি আমাদের দেশের সব প্রথিতযশা লেখক সাহিত্যিক তো আছেনই। আরও অনেক নাম এ মুহূর্তে স্মৃতিতে আসছে না।
ভিক্টর হ্যুগোর ‘লা_মিজারেবল’; বইটি কতো বার পড়ে কত কেঁদেছি, তার ইয়ত্তা নেই। আসলে একেবারে ছেলেবেলা থেকেই বই আমাদের মানস গঠনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল, যেটা পরে বুঝেছি।
আমাদের বাবা-মা’র কাছে কৃতজ্ঞ কারণ, আমাদের লেখাপড়ার পাশাপাশি ‘আউট বুক’ পড়ায় খুব উৎসাহ দিতেন। আমরা ঘুমাতে যেতাম বই নিয়ে । পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও ভীষণ অনুপ্রাণিত করতেন আমাদের। আমরা সবকিছুতেই অংশ নিতাম।
বাবা-মা বুঝিয়েছিলেন, অংশগ্রহণ করাটাই বড়, বিজয়ী হওয়া বা পুরস্কার পাওয়াটা বড় কথা নয়। অংশগ্রহণ করতেও সাহস লাগে। তো সেই সাহসে বলীয়ান হয়ে, সর্বোপরি বাবা-মায়ের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সব রকম সৃজনশীল কাজকর্ম যেমন- ছবি আঁকা, নাচ, গান, আবৃত্তি, কুইজ কম্পিটিশন, রচনা প্রতিযোগিতা, হাতের লেখা প্রতিযোগিতা অভিনয়, খেলাধুলা, গল্প বলা সব কিছুই চালিয়ে গেছি পড়াশোনার পাশাপাশি।
আমরা ৩ ভাইবোন দেয়াল পত্রিকা বানাতাম, ঈদ কার্ড বানাতাম আরো কতো কিছু যে করতাম। তখন আমাদের কোনো কিছুরই বাহুল্য ছিলো না, কিন্তু সৃজনশীলতায় বাধা ছিলো না। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা আমাদের আনন্দ ঠিকই খুঁজে নিতাম।
আমাদের ছেলেবেলার সেই আনন্দ ছুঁয়ে যাক এ প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের মননে।
লেখক : নওশেবা সবিহ্ক কবিতা, সম্পাদক, টইটম্বুর