রিট মামলা কমাতে বিচারিক শৃঙ্খলা জরুরি: অ্যাটর্নি জেনারেল
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে চলতি বছর নতুন রিট মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যক্তিস্বার্থ ও ব্যক্তিগত বিরোধ নিয়ে রিট দায়েরের প্রবণতা বন্ধ করা গেলে মামলার চাপ আরও কমবে বলে মনে করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
তিনি বলেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আদালতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে রিট মামলার সংখ্যাও কমে আসবে। আদালতে শৃঙ্খলা থাকলে প্রকৃতপক্ষে মানুষ ন্যায়বিচার পায়।
.png)
সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬০টি। বছরের প্রথম তিন মাসে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত নতুন রিট মামলা দায়ের হয় ৪ হাজার ১১২টি। একই সময়ে নিষ্পত্তি হয় ২ হাজার ২১৩টি মামলা।
এরপর ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নতুন রিট মামলা দায়ের হয় ৪ হাজার ৭২৯টি। বিপরীতে এ সময়ে নিষ্পত্তি হয় ৯ হাজার ৫৯০টি রিট মামলা। অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রান্তিকে নতুন মামলা দায়েরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। জুন শেষে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৯টিতে।
হাইকোর্টে লক্ষাধিক রিট মামলা বিচারাধীন থাকার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, অনেক সময় পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশনের (জনস্বার্থ মামলা) নামে ব্যক্তিস্বার্থে রিট করা হয়। এসব মামলার উদ্দেশ্য অনেক ক্ষেত্রে আত্মপ্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। রিট করার পরপরই অনেকে গণমাধ্যমের সামনে উপস্থিত হন, যা অনাকাঙ্ক্ষিত।
তিনি বলেন, সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় হাইকোর্টের জন্য বাধ্যতামূলক। কোন ধরনের মামলা হাইকোর্ট গ্রহণ করতে পারবেন বা পারবেন না, সে বিষয়ে আপিল বিভাগের একাধিক রায়ে নীতিও নির্ধারিত হয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষ্য, প্রাইভেট ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট পিটিশন গ্রহণযোগ্য নয়—এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের অসংখ্য রায় রয়েছে। এরপরও বিভিন্ন সময়ে হাইকোর্টের কিছু বেঞ্চ প্রাইভেট ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট গ্রহণ করে আদেশ দিচ্ছেন। এতে বিচারিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। এই জায়গায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা গেলে রিট মামলার সংখ্যা কমবে।
ব্যক্তিগত বিরোধ নিয়ে রিটের প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, জমি দখল, জমির সীমানা নির্ধারণ কিংবা বিল-বাঁওড় নিয়ে বিরোধের মতো ব্যক্তিগত বিষয়েও সরাসরি হাইকোর্টে রিট করা হচ্ছে। অথচ এ ধরনের বিরোধের প্রতিকারের জন্য নিম্ন আদালতে মামলা করার সুযোগ রয়েছে। প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি হাইকোর্টে যাওয়ার কারণে রিট মামলার সংখ্যা বাড়ছে।
সংবিধানে পাঁচ ধরনের রিট
বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে হাইকোর্টে রিট করার সুযোগ রয়েছে। প্রচলিতভাবে রিটের পাঁচটি ধরন হলো—হেবিয়াস করপাস, ম্যান্ডামাস, সার্টিওরারি, প্রহিবিশন ও কো-ওয়ারেন্টো।
হেবিয়াস করপাস: কোনো ব্যক্তিকে আইনগত কারণ ছাড়া আটক করা হলে তাকে আদালতের সামনে হাজির করার নির্দেশ দিতে পারে হাইকোর্ট।
ম্যান্ডামাস: কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন না করলে সেই দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিতে পারে হাইকোর্ট।
সার্টিওরারি: কোনো বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল আইনবহির্ভূতভাবে আদেশ দিলে তা বাতিলের জন্য এ রিট করা যায়।
প্রহিবিশন: কোনো বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল আইনগত ক্ষমতার বাইরে গিয়ে কোনো মামলা পরিচালনা শুরু করলে সেই কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিতে পারে হাইকোর্ট।
কো-ওয়ারেন্টো: আইনগত যোগ্যতা ছাড়া কেউ কোনো সরকারি পদে থাকলে তার ওই পদে থাকার বৈধতা যাচাইয়ের জন্য এ রিট করা যায়।
জনস্বার্থে রিটের ভূমিকা
মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জনস্বার্থে রিটের আইনগত ভিত্তি আরও সুস্পষ্ট হয়। ওই রায়ে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনি প্রতিকার চাইতে পারে—এমন নীতির স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এরপর থেকে জনস্বার্থে রিট মামলা দেশের বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। নদী দখল, অবৈধ ইটভাটা, পাহাড় কাটা, জনস্বাস্থ্য ও নিরাপদ খাদ্য, দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ এবং নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার রক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে হাইকোর্টের রিটের মাধ্যমে আদেশ ও রায় এসেছে।
হাইকোর্টের বিভিন্ন রিট মামলার রায়ের মাধ্যমে দেশের নদীগুলোকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতিও দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির করা জনস্বার্থের রিটের রায় বা আদেশের সুফল পেয়েছেন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মানুষ।