ঢাকা,  মঙ্গলবার   ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

আকাশচুম্বি বিদ্যুৎ পরিচালন ঘাটতি

মো. শাহজাহান মো. শাহজাহান
প্রকাশিত: ১৬:২০, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আকাশচুম্বি বিদ্যুৎ পরিচালন ঘাটতি
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ

দেশের একমাত্র বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)-এর আর্থিক চাপ ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। সঞ্চালন অবকাঠামো সম্প্রসারণের নামে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন চললেও প্রত্যাশিত হারে আয় বাড়ছে না। ফলে পরিচালন ঘাটতি বাড়ছে এবং সরকারের ওপর আর্থিক দায় জমা হচ্ছে। পিজিসিবির আর্থিক প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বিশ্লেষণ করে এই চিত্র উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে পিজিসিবির মোট ঋণ ছিল ৩০ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। তখন সংরক্ষিত আয়ের উদ্বৃত্ত ছিল ৭৩৭ কোটি টাকা। পরের বছর ২০২২-২৩-এ ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ হাজার ১৬৪ কোটি টাকায়। একই সময়ে সংরক্ষিত আয় ঋণাত্মক হয়ে লোকসান হয় ৬৪৮ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঋণ আরও বেড়ে ৪৯ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকায় পৌঁছে এবং সংরক্ষিত লোকসান দাঁড়ায় ১ হাজার ২৭৭ কোটি টাকায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঋণের পরিমাণ ৫৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকায় উন্নীত হয় এবং সংরক্ষিত লোকসান ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকায় পৌঁছে। 

Advertisement

সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত ঋণের স্থিতি ৬৬ হাজার ৩৪১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সংরক্ষিত লোকসান তখনও ৯২১ কোটি টাকার ঘরে রয়েছে। মাত্র তিন বছরেই প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ঝুঁকি মাঝারি থেকে উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে মোট দায় প্রায় ৫৬ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল, যা আগের বছরের তুলনায় ৩০ দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি। মোট ঋণের প্রায় ৮৯ শতাংশই সরকারের সঙ্গে করা সাবসিডিয়ারি লোন অ্যাগ্রিমেন্ট ও লোন অ্যাগ্রিমেন্টের আওতায় নেওয়া।

দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে পিজিসিবি দেশী-বিদেশী ঋণে সঞ্চালন লাইন, সাবস্টেশন ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্থাপন করছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পটুয়াখালী-গোপালগঞ্জ, আমিনবাজার-গোপালগঞ্জ, দিনাজপুর এবং গাজীপুরের কালিয়াকৈরসহ বহু এলাকায় দীর্ঘ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ হয়েছে এই অর্থ দিয়ে। বর্তমানে সঞ্চালন লাইন ও অবকাঠামো উন্নয়নে ১৪টি প্রকল্প চলমান। এসব প্রকল্পে দেশী-বিদেশী ঋণ মিলিয়ে প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। অবকাঠামো সম্প্রসারণের এই ধারাবাহিকতা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটির আয় প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। ফলে পরিচালন ঘাটতি বাড়ছে এবং সরকারের জন্য আর্থিক দায় ও ঝুঁকি ঘনীভূত হচ্ছে।

পিজিসিবি ১৯৯৭ সালে দেশের একমাত্র বিদ্যুৎ সঞ্চালন সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে সঞ্চালন ট্যারিফ মাত্র পাঁচবার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ তিনবার এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন দুইবার ট্যারিফ নির্ধারণ করেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সঞ্চালন ট্যারিফ বাড়ানোর পর চলতি বছরের জুনে আবারো বৃদ্ধি করা হয়। দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার প্রায় পুরোটাই পিজিসিবির ওপর নির্ভরশীল। ফলে ব্যয় দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য কার্যকর প্রতিযোগিতামূলক বেঞ্চমার্ক নেই। পূর্ণ কস্ট রিকভারি নিশ্চিত না হলে ধারাবাহিক লোকসান অনিবার্য। এই ঘাটতি শেষ পর্যন্ত সরকারকেই ভর্তুকি দিয়ে পূরণ করতে হয়। কিন্তু ভর্তুকির অর্থ ঋণ হিসেবে দেখানোর কারণে পিজিসিবির ওপর ঋণের বোঝা ক্রমেই জমছে।
সরকারের কাছ থেকে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়ের জন্য প্রতি বছর অর্থ নেওয়া হয়। এর ৬০ শতাংশ ইকুইটি এবং ৪০ শতাংশ ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইকুইটি হিসেবে নেওয়া অর্থ ডিপোজিট ফর শেয়ার হিসেবে দেখানো হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারের অনুকূলে শেয়ার ইস্যু করতে হয়। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন ধীরগতির কারণে প্রত্যাশিত হারে আয় ও মুনাফা বাড়ছে না। অথচ প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ ইকুইটি নেওয়া হচ্ছে এবং এর বিপরীতে প্রচুর শেয়ার ইস্যু করতে হচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

পিজিসিবি সংশ্লিষ্টরা জানান, বড় অঙ্কের অবকাঠামো বিনিয়োগের বিপরীতে সঞ্চালন আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সঞ্চালন না হওয়ায় আয় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অবকাঠামো নির্মাণের পরও তা পর্যাপ্তভাবে ব্যবহার না হলেও পরিচালন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের গ্যাসভিত্তিক বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকেও প্রত্যাশিত পরিমাণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন হয়নি। দূরবর্তী কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ক্ষেত্রে ট্রান্সমিশন লস বেড়েছে। একদিকে সঞ্চালন আয় কমেছে, অন্যদিকে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় অব্যাহত রয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, পিজিসিবির আয়ের প্রধান উৎস হুইলিং বা সঞ্চালন চার্জ। এই চার্জ দিয়েই পরিচালন ব্যয় ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নির্বাহ করা হয়। কিন্তু গত কয়েক বছর হুইলিং চার্জ বাড়ানো হয়নি এবং বছরভিত্তিক সঞ্চালন প্রাক্কলনও পূরণ হয়নি। ব্যয় বাড়লেও আয় বাড়েনি। এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারজনিত ক্ষতি যুক্ত হয়েছে। ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে পিজিসিবির ৩ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বড় অঙ্কের বিদেশী ঋণ থাকায় বিনিময় হার পরিবর্তনের চাপ সরাসরি কোম্পানির আর্থিক অবস্থায় পড়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “সঞ্চালন অবকাঠামো সম্প্রসারণ জরুরি ছিল এবং এখনও রয়েছে। কিন্তু আর্থিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস না করলে এই বোঝা রাষ্ট্রের ওপর আরও বাড়বে। আমরা পূর্ণ কস্ট রিকভারি নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছি। হুইলিং চার্জ সমন্বয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কমানোর জন্যও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, “পিজিসিবির ঋণের বোঝা স্বীকার্য। কিন্তু অবকাঠামো ছাড়া বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আমরা সঞ্চালন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং আয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। সরকারের অর্থায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।”

বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, “পাওয়ার গ্রিডের আর্থিক চাপ নিয়ে আমরা সচেতন। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি কস্ট রিকভারি নিশ্চিত করতে ট্যারিফ সমন্বয় ও অন্যান্য সংস্কারের কাজ চলছে। সরকারের ইকুইটি ও ঋণের অনুপাত পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে যাতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যালেন্স শিট আরও শক্তিশালী হয়।”

পিজিসিবির পর্ষদে পরিচালক ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী বলেন, “পাওয়ার গ্রিডের বড় অঙ্কের বিদেশী ঋণ রয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হয়েছে। এই ঝুঁকি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তবে সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে পর্ষদে উদ্বেগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে এ অবস্থা থেকে বের করে আনতে আলোচনা চলছে এবং কিছু পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।”

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও পিজিসিবির চেয়ারম্যান ড. মো. রেজওয়ান খান বলেন, “সঞ্চালন ব্যবস্থায় সিস্টেম লস কমানোর চেষ্টা চলছে। আরও উন্নয়ন প্রয়োজন। কিন্তু শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না। এর পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ব্যয় বাড়বে আর আয় বাড়বে না।”

অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি খাত বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মো. তানভীর আহমেদ বলেন, “পিজিসিবির বর্তমান আর্থিক কাঠামো টেকসই নয়। বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে অবকাঠামো বানানো হচ্ছে কিন্তু রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা দুর্বল। হুইলিং চার্জ সময়মতো সমন্বয় না হওয়া এবং সঞ্চালন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া মূল সমস্যা। সরকারকে ইকুইটির অনুপাত বাড়িয়ে ঋণের চাপ কমাতে হবে। নইলে এই দায় শেষ পর্যন্ত বাজেটের ওপর পড়বে।”

আরেক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, “ট্রান্সমিশন লস এবং অব্যবহৃত অবকাঠামোর ব্যয় পিজিসিবির লোকসানের অন্যতম কারণ। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রত্যাশিত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় দূরবর্তী সঞ্চালনে লস বেড়েছে। এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও স্মার্ট গ্রিডের দিকে নজর দিতে হবে যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘাটতি কম হয়।”

সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর সম্প্রসারণ প্রয়োজনীয় হলেও এর আর্থিক ব্যবস্থাপনা টেকসই না হলে ঘাটতি আরও বাড়বে। পূর্ণ কস্ট রিকভারি, হুইলিং চার্জের সময়মতো সমন্বয়, সঞ্চালন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং সরকারের অর্থায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন—এসব বিষয় এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। পিজিসিবির আর্থিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস না করলে এই ঋণের বোঝা শুধু প্রতিষ্ঠানের নয়, রাষ্ট্রেরও হয়ে উঠবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ//এসআরএস/একেকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!