ঢাকা,  বুধবার   ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

ডেঙ্গুর ছোবলে ঢাকা উত্তরের চেয়ে দক্ষিণে মৃত্যু বেশি

বায়েজীদ মুন্সী
প্রকাশিত: ২০:৫৪, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ডেঙ্গুর ছোবলে ঢাকা উত্তরের চেয়ে দক্ষিণে মৃত্যু বেশি
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ১৩০ জন। এর মধ্যে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনেই ৬২ জন।

চলতি বছরের শুরু থেকেই জেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ ছিল চোখে পড়ার মতো। জানুয়ারির শুরু থেকে এ পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৪৬ জনই ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে। বাকি ১৬ জন ঢাকা উত্তার সিটিতে। অর্থাৎ রাজধানীর উত্তর সিটির তুলনায় দক্ষিণে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৩ গুণ বেশি। পাশাপাশি আক্রান্তের দিক দিয়েও এগিয়ে রয়েছে ডিএসসিসি। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ০৮ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) পর্যন্ত দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ১৩০ জন। এর মধ্যে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনেই ৬২ জন। এছাড়া বরিশাল বিভাগে ১১ জন, চট্টগ্রামে ৮ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি কর্পোরেশনের বাইরে) ৭ জন, খুলনা বিভাগে ২৩ জন, ময়মনসিংহে ১৩ জন, রাজশাহীতে ৪ জন, রংপুরে একজন এবং সিলেটে একজন মারা গেছেন।

এদিকে চলতি বছরের শুরু থেকে ০৮ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) পর্যন্ত দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৪৫ হাজার ৪৭৫ জন। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ৫ হাজার ৮২৫ জন এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে রয়েছেন ৫ হাজার ৪২৩ জন। অর্থাৎ উত্তরের চেয়ে দক্ষিণে আক্রান্তের সংখ্যাও বেশি। এছাড়া বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬ হাজার ৮১১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৬ হাজার ৭৭২ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি কর্পোরেশনের বাইরে) ৬ হাজার ৯৬৬ জন, খুলনা বিভাগে ৭ হাজার ২৯৮ জন, ময়মনসিংহে ২ হাজার ৪৯৯ জন, রাজশাহীতে ২ হাজার ৫৫৭ জন, রংপুরে এক হাজার ১৬৮ জন এবং সিলেটে ২০৬ জন আক্রান্ত হয়েছে।

Advertisement

সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান ঢাকা উত্তর সিটির তুলনায় দক্ষিণের আক্রান্ত এবং মৃত্যুর তথ্য বেশি জানালেও বিষয়টি মানতে নারাজ ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান। তিনি বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের তুলনায় দক্ষিণ সিটিতে আক্রান্ত বা মৃত্যু বেশি বিষয়টি সঠিক নয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বাংলাদেশের একটি অন্যতম বড় হাসপাতাল যা, দক্ষিণ সিটিতে অবস্থিত।  রাজধানী তথা সারাদেশ থেকে এ প্রতিষ্ঠানে ডেঙ্গু রোগী আসে। দক্ষিণ সিটিতে এ হাসপাতালটি হওয়ায় এ হাসপাতালের সব তথ্য আমাদের মাথায় আসছে। বাস্তবে দক্ষিণে রোগীর সংখ্যা বেশি নয়। 

তিনি আরো বলেন, এডিস মশা প্রতিরোধে নিয়মিত ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে। অঞ্চলভিত্তিক ডেঙ্গু মনিটরিং টিম গঠনের মাধ্যমে মশকনিধন কর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, কীটনাশকের সঠিক পরিমাণ যাচাই, অভিযান চালানোসহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার বিষয়ে কাজ চলছে। 

ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরও বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের প্রতিটি ওয়ার্ডে দুটি টিম রয়েছে যারা সকালে এবং বিকেলে কাজ করছে। তাদের পরিচালনার জন্য একজন সুপাভাইজার রয়েছেন। সকালে একটি টিম গিয়ে লার্ভা টেস্ট করছে। যেখানে লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে সেখানে বিকেলে অন্য আরেকটি টিম গিয়ে ওষুধ দিচ্ছে। পাশাপাশি যে স্থাপনায় লার্ভা পাওয়া যায় তাদের সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক, কীটতত্ত্ববিদ, গবেষক ড. কবিরুল বাশার বলেন, দেশে ডেঙ্গুর বিস্তার এখন শুধু প্রাকৃতিক ঋতু পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না। মশার জীবনচক্র তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার ওপর যেমন নির্ভরশীল, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই ভেক্টরগুলোর প্রজনন মৌসুমও প্রসারিত হয়েছে। হালকা বৃষ্টিপাত মশার প্রজননস্থলগুলো পুনরায় সক্রিয় করে এবং প্রাপ্তবয়স্ক মশার আয়ু ও বিস্তার বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে অতি ভারি বৃষ্টি অনেক সময় মশার ডিম বা লার্ভাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এই জটিলতা বোঝার জন্য এবং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আবহাওয়াভিত্তিক পূর্বাভাস মডেল গড়ে তোলা আবশ্যক। 

তিনি বলেন, মশার ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণের একটি প্রধান উপায় হলো ব্রিডিং সোর্স ম্যানেজমেন্ট। যেসব পাত্রে পানি জমে থাকে; যেমন-ফুলের টব, প্লাস্টিকের কনটেইনার, পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণাধীন ভবনের পানির ট্যাংক, বহুতল ভবনের বেইসমেন্টে জমা পানি, ঘরের ভেতরে ড্রাম বা বালতিতে জমিয়ে রাখা পানি ইত্যাদি। এগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে বা নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। যেসব স্থানে পানি জমা থাকা অনিবার্য কিন্তু ফেলে দেওয়া বা পরিষ্কার করা যাচ্ছে না, সেগুলোতে কীটনাশক প্রয়োগের ব্যবস্থা নিতে হবে। এই কাজে শুধু সিটি করপোরেশন নয়, সাধারণ নাগরিকদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রত্যেক নাগরিক যেন নিজ বাড়ির আশপাশে এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ না রাখে, তা নিশ্চিত করতে হবে। 

এ দিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসব্যাপী বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর (শনিবার) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কর্মসূচি উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। 

গতকাল মঙ্গলবার এক সভায় ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় আগামী তিন মাসকে ঝুঁকিপূর্ণ সময় বিবেচনায় নিয়ে এ কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশকনিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে সমন্বিতভাবে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। কর্মসূচির আওতায় মহানগর এলাকায় সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন এবং জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকরা কার্যক্রম সমন্বয় করবেন। উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) স্থানীয় পর্যায়ের কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকবেন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/DB-N-03
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!