অভিযোগ রয়েছে, পেশকার, কেরানি, দলিল লেখক ও দালালদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজন দলিল লেখকের দাবি, এভাবে প্রতি মাসে কোটি টাকার বেশি অর্থ আদায় করা হয়।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাব-রেজিস্ট্রার মো. মামুন সিকদার।
.png)
তিনি দাবি করেছেন, তাঁর কার্যালয়ে কোনো ধরনের ঘুষ বা অনিয়ম হয় না। ঘুষ গ্রহণের ভিডিও ফুটেজ দেখানোর পর তিনি জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে বিষয়টি জেলা রেজিস্ট্রারকে জানানোর পরামর্শ দেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ও স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভোলা সদর ছাড়াও দৌলতখানের বাংলাবাজার, বোরহানউদ্দিন, তজুমদ্দিন, শশীভূষণ ও দক্ষিণ আইচা সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, জেলার এসব কার্যালয়ে সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে এককভাবে দায়িত্ব পালন করে দলিল নিবন্ধন করেন সাব-রেজিস্ট্রার মামুন সিকদার।
দলিল করতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার অভিযোগ
ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের বাংলা বাজার এলাকার বাসিন্দা শরীফ তালুকদার অভিযোগ করেন, একটি সাফ-কবলা দলিল নিবন্ধনের জন্য সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে তাঁকে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়েছে।
শরীফ তালুকদারের ভাষ্য, ১ শতাংশ জমির মূল্য ১৬ লাখ টাকা দেখিয়ে সাফ-কবলা দলিল করার জন্য তিনি দলিল লেখক শরীফ পাটোয়ারীকে ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা দেন। পরে তাঁকে সাব-কবলার নকল ও সইমোহর দিয়ে দেওয়া হলেও মূল দলিল উত্তোলনের সময় তিনি দেখতে পান, সাফ-কবলার পরিবর্তে হেবা-বিল-এওয়াজ মূলে দলিল সম্পাদন করা হয়েছে।
তাঁর অভিযোগ, দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে প্রয়োজনীয় পারিবারিক সম্পর্ক না থাকলেও হেবা-বিল-এওয়াজ দলিল করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে অভিযোগ করলে তাঁর সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
পরে সাফ-কবলা দলিল নিতে গ্রহীতাকে আরও ৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়েছে বলে জানান আরেক ভুক্তভোগী রিয়াজ সিকদার। তাঁর দাবি, পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁকে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।
৬০ হাজার টাকা দেওয়ার অভিযোগ
চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ আইচা থানার চর মানিকা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ফরিদ উদ্দিন অভিযোগ করেন, ভাই-বোনের মধ্যে হেবা-বিল-এওয়াজ দলিল করার সময় তাঁকে অতিরিক্ত অর্থের জন্য দীর্ঘদিন ঘোরানো হয়।
ফরিদ উদ্দিনের দাবি, পরে সাব-রেজিস্ট্রারের কথিত সিন্ডিকেটের সদস্যদের মাধ্যমে দুই দফায় ৩০ হাজার টাকা করে মোট ৬০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তাঁর দলিল নিবন্ধন করা হয়।
তিনি বলেন, জেলায় সাব-রেজিস্ট্রারের সংখ্যা কম হওয়ায় দক্ষিণ আইচা কার্যালয়ে নিয়মিত অফিস হয় না। যেদিন অফিস হয়, সেদিনও চাহিদামতো অতিরিক্ত টাকা না দিলে দলিল নিবন্ধন করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ তাঁর।
দলিল লেখকদেরও অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দলিল লেখক বলেন, সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে দলিলের মূল্য অনুযায়ী অতিরিক্ত ০.৫ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দিতে হয়। এ ছাড়া কাগজপত্রে ছোটখাটো ত্রুটি দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
তাঁদের অভিযোগ, এসব অর্থ পেশকার বা কেরানির মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে পৌঁছানো হয়। ঘুষের বিষয়ে কেউ কথা বললে দলিল লেখকের সনদ বাতিলের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা। ফলে ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে চান না।
প্রতি মাসে কোটি টাকার বেশি আদায়ের অভিযোগ
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভোলার ছয়টি সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে দলিল নিবন্ধনের সময় সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সাব-রেজিস্ট্রার মামুন সিকদার যেদিন এসব কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন, সেদিন গড়ে ১৫০ থেকে ২০০টি দলিল নিবন্ধন হয়। প্রতিটি দলিলের মূল্যের ওপর ০.৫ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ ‘অফিস খরচ’ হিসেবে নেওয়া হয় বলে তাঁদের অভিযোগ। তাঁদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় মাসে কোটি টাকার বেশি অর্থ আদায় হয়ে থাকতে পারে।
তবে এই হিসাবের স্বাধীন কোনো সরকারি নথি বা নিরীক্ষিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের পাশাপাশি কাগজপত্রে ত্রুটি দেখিয়ে ফাইল আটকে রাখা, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য বা নামের অসংগতি, প্রয়োজনীয় টিআইএন সনদ কিংবা আয়কর রিটার্ন না থাকার অজুহাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া বেশি মূল্যের জমি কম মূল্যে দেখিয়ে সাফ-কবলা দলিল নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া এবং জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
নকল তুলতেও অতিরিক্ত অর্থের অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, হেবা দলিল নিবন্ধন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক মর্টগেজ দলিল এবং বালাম বই থেকে নকল বা সত্যায়িত অনুলিপি সংগ্রহের ক্ষেত্রেও সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে নকল বা অনুলিপি তুলতে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
যা বললেন সাব-রেজিস্ট্রার
এসব অভিযোগের বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রার মো. মামুন সিকদারের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি তাঁর কার্যালয়ে ঘুষ বা অনিয়মের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।
তবে অনুসন্ধানী দলের কাছে থাকা ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও ফুটেজ তাঁকে দেখানো হলে তিনি বলেন, ভিডিওতে যারা জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি অতিরিক্ত টাকা নিয়ে থাকলে বিষয়টি জেলা রেজিস্ট্রারকে জানাতে হবে। জেলা রেজিস্ট্রার তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তদন্তের দাবি ভুক্তভোগীদের
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের চাহিদামতো অর্থ না দিলে তাঁদের ফাইল দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয়। এতে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ চরম হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।
তাঁরা ভোলা জেলা ও সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ সংশ্লিষ্ট কার্যালয়গুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযান এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কর্মচারী, দলিল লেখক ও দালালদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার মো. আনিসুর রহমান বলেন, তিনি অসুস্থতার কারণে বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন। ঘুষ গ্রহণের ভিডিও এবং সাব-রেজিস্ট্রার মামুন সিকদারের বক্তব্য তাঁর নজরে এসেছে। ছুটি শেষে অফিসে ফিরে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।