ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

বরখাস্ত প্রকৌশলী আরিফুরের দুর্নীতির মহোৎসব

অনুসন্ধানে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৮:৫৫, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বরখাস্ত প্রকৌশলী আরিফুরের দুর্নীতির মহোৎসব
বরখাস্ত প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুর রহমান

সম্প্রতি ডিএনসিসির কেনাকাটা সংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় থেকে জারি করা স্মারক নং-০০.০১.২৬০০.৬০৩.০১.০০৮.২৬ তারিখ ০১/০৯/২০২৬ (এবং সংশ্লিষ্ট অনুলিপি ০৮/০৯/২০২৬) অনুসারে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ওয়াকিটকি ক্রয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। 

স্মারকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য উপপরিচালক (অনুসন্ধান ও তদন্ত-১) মুহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেনকে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কমিশনের সিদ্ধান্তের আলোকে বিধি মোতাবেক অনুসন্ধান করে সুনির্দিষ্ট মতামতসহ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংযুক্ত রয়েছে বর্ণনামতে অভিযোগের ফটোকপি ১০ পাতা। এই নোটিশের মাধ্যমে ডিএনসিসির প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের তদন্ত নতুন গতি পেয়েছে।

Advertisement

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রকৌশল বিভাগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অনিয়ম আর দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক চিত্র সম্প্রতি জনসমক্ষে এসেছে। সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুর রহমানের সাময়িক বরখাস্তের ঘটনাটি শুধু দাপ্তরিক শাস্তি নয়, এটি নগর প্রশাসনের ভেতরের এক গভীর ক্ষতকে উন্মোচিত করেছে। দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা, ব্যাপকভিত্তিক অসদাচরণ, অদক্ষতা, সরাসরি দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় তহবিল তছরুপের মতো গুরুতর ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ডিএনসিসি কর্মচারী চাকরি বিধিমালা, ২০১৯-এর বিধি ৪৯-এর উপবিধি (ক), (খ), (ঘ), (ঙ) এবং (চ) মোতাবেক ডিএনসিসির সচিব মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের সই করা এক জরুরি অফিস আদেশের মাধ্যমে তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এই আদেশের পর থেকে ঢাকার স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। 

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকৌশলী আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগটি এসেছে রাষ্ট্রের কেনাকাটা সংক্রান্ত আইনি কাঠামোকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর মাধ্যমে। তিনি সরকারের ‘আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ-২০২৫’, ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬’ এবং ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০২৫’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় গাইডলাইন ও আইনগুলোর প্রতিটি ধারা ও শর্ত নজিরবিহীনভাবে লঙ্ঘন করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের যেকোনো বড় ধরনের উন্নয়ন কাজ বা কেনাকাটার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ই-টেন্ডারিং পদ্ধতি এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু আরিফুর রহমান নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে এমন এক ব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন, যেখানে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার কোনো সুযোগ ছিল না। তিনি এবং তার অনুগত সিন্ডিকেট মিলে দরপত্রের শর্তাবলী এমনভাবে সাজাতেন যাতে তাদের পূর্বনির্ধারিত নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ কাজ না পায়। ফলে মেগা প্রকল্প থেকে শুরু করে সাধারণ সংস্কার কাজ—সবখানেই রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা নয়-ছয় করা হয়েছে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত উপায়ে। 

এই পুরো সিন্ডিকেট বা প্রাতিষ্ঠানিক জালিয়াতির জাল কতটা সুদূরপ্রসারী ছিল, তা স্পষ্ট হয় ডিএনসিসির অঞ্চল-৫-এর বরখাস্ত হওয়া অন্য এক নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের কর্মকান্ডের দিকে তাকালে। প্রকৌশলী মিজানুর রহমান নিজেই নিয়মবহির্ভূতভাবে দরপত্র আহ্বান করতেন এবং নিজেই ‘হোপ’ বা অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ সেজে মোট ৪৮টি দরপত্রের অনুমোদন একহাতে দিয়ে দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রীয় কেনাকাটার ইতিহাসে এই ধরনের স্বৈরাচারী ও নিয়মবহির্ভূত কান্ড বিরল। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, সম্পূর্ণ অবৈধভাবে অনুমোদিত ৪৮টি দরপত্রের মধ্যে অন্তত ১৫টি বড় দরপত্রের চূড়ান্ত মূল্যায়নের সুপারিশ সরাসরি করেছিলেন মোহাম্মদ আরিফুর রহমান। সেই সময়ে আরিফুর রহমান প্রধান প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্বে ছিলেন। ফলে শীর্ষ পদে বসে অধস্তন কর্মকর্তাদের এমন বড় ধরনের জালিয়াতিকে শুধু প্রশ্রয়ই দেওয়া হয়নি, বরং নথিপত্রে নিজের স্বাক্ষরের মাধ্যমে সেগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। এই যোগসাজশ প্রমাণ করে যে, এটি কোনো একক অনিয়ম ছিল না, সিটি করপোরেশনের ভেতরে অত্যন্ত শক্ত ভিত্তি গেড়ে বসা একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের কাজ ছিল।

তহবিল তছরুপ এবং সরাসরি অর্থ আত্মসাতের ক্ষেত্রেও এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে। ঢাকার রাস্তাঘাট উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং ফুটপাত সংস্কারের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতের বাজেট বরাদ্দ থেকে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে টাকা তুলে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মাঠপর্যায়ে কোনো কাজই সম্পাদন করা হয়নি অথবা নামমাত্র কাজ করে নথিপত্রে শতভাগ কাজ শেষ হয়েছে মর্মে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়েছে। এরপর সেই ভুয়া প্রত্যয়নপত্রের ওপর ভিত্তি করে ঠিকাদারদের নামে কোটি কোটি টাকার সরকারি বিল পাস করে দেওয়া হতো, যার একটি বড় অংশ সরাসরি চলে যেত এই প্রকৌশলী ও তার সহযোগীদের পকেটে। এর বাইরেও, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর প্রকৃত খরচের চেয়ে কয়েকগুণ অতিরিক্ত প্রাক্কলন তৈরি করে সরকারের উন্নয়ন বাজেটকে লুটে নেওয়া হয়েছে।

এই প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতির বাইরেও আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে চরম পেশাগত অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতার নজির পাওয়া গেছে। ঢাকার মতো একটি মেগাসিটির মূল অবকাঠামো তদারকির দায়িত্ব যেখানে তার কাঁধে ছিল, সেখানে তিনি নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির চেয়ে নিজের আখের গোছাতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তার অবহেলা ও তদারকির অভাবে ডিএনসিসির শত শত কোটি টাকার প্রকল্পগুলো মাসের পর মাস ঝুলে থেকেছে, ফলে সাধারণ জনগণকে পোহাতে হয়েছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে কাজ করানোর ফলে নতুন তৈরি করা রাস্তা বা ড্রেন এক বর্ষা পার হওয়ার আগেই ভেঙে পড়েছে, যার ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বারবার একই কাজের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিতে হয়েছে। এই ধরনের আচরণকে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ তাদের অফিস আদেশে সরকারি চাকরি বিধির চরম লঙ্ঘন এবং গুরুতর ‘অসদাচরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর থেকেই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে নতুন তৎপরতা শুরু করেছেন এই প্রকৌশলী। তিনি ইতিমধ্যেই ডিএনসিসি প্রশাসকের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে এবং পুরো ঘটনাটিকে একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিয়ে লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, দাপ্তরিক তদন্তের গতি ধীর করতে এবং পুনরায় নিজেকে স্বপদে ফিরে আনতে তিনি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে জোর লবিং ও তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। তবে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ এবার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ধারায় আনুষ্ঠানিক ও পূর্ণাঙ্গ বিভাগীয় মামলা দায়েরের কাজ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে এই প্রকৌশলীর দুর্নীতির ব্যাপ্তি যেহেতু বিপুল অঙ্কের রাষ্ট্রীয় অর্থের সঙ্গে জড়িত, তাই দেশের সর্বোচ্চ দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ (দুদক) ইতিমধ্যেই এই ঘটনার সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধান শুরু করেছে। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার এবং পরিবারের সদস্যদের নামে অর্জিত বিপুল পরিমাণ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের খোঁজ মিলছে বলে জানা গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, প্লট এবং নামে-বেনামে ব্যাংকে জমা থাকা কোটি কোটি টাকার উৎস খতিয়ে দেখছেন দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা। এর মধ্যে গুলশানের এক্সেলসিয়র কনকর্ড ভবনটি বিশেষভাবে নজরে এসেছে। ভবনটির ঠিকানা হাউস-২০, রোড-৫৫, গুলশান। এখানে প্রকৌশলী আরিফুর রহমানের একটি আলিশান ফ্ল্যাট রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, কোনো ধরনের অবৈধ কাজ আর সহ্য করা হবে না। করদাতাদের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মন্তব্য করেছেন, সিটি করপোরেশনের মতো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে প্রকিউরমেন্ট দুর্নীতি জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। দুদকের তদন্ত স্বচ্ছ ও দ্রুত সম্পন্ন হওয়া জরুরি, যাতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হয়। 

এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ ও স্থপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নে নিম্নমানের কাজ ও অতিরিক্ত প্রাক্কলন শহরের ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করছে। জবাবদিহিতা না থাকলে এ ধরনের সিন্ডিকেট বারবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। 

বিষয়টি নিয়ে সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মানজিল মোরসেদ বলেন, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন লঙ্ঘন ও তহবিল তছরুপের অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু বিভাগীয় শাস্তি নয়, ফৌজদারি মামলাও দায়ের করা উচিত। সম্পদের উৎস যাচাই করে অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্তের বিধান প্রয়োগ করা জরুরি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/DB-N-04
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!