সংকটে এনসিপির স্বতন্ত্র রাজনীতির ভবিষ্যৎ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন ধারার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তরুণ নেতৃত্ব, রাষ্ট্র সংস্কার, জবাবদিহি, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে একটি ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’—এসব স্লোগানকে সামনে রেখে যাত্রা শুরু করে দলটি। কিন্তু এককভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার বুলি আওড়ালেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেয় দলটির নেতারা। বর্তমানে দলটি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের শরিক হিসেবে জাতীয় সংসদে ৮ সদস্য নিয়ে নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে বড় কোনো দলের ছায়ায় থাকলে স্বতন্ত্র রাজনৈতির ভবিষ্যৎ সংকটে পড়ার আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, জোট গড়ে ভোটে গিয়ে এনসিপি সংসদীয় রাজনীতিতে দৃশ্যমান অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বড় কোনো দলের ছায়ায় থাকলে এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে এনসিপির। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির নেতারাই দলটির উদ্যোক্তা ছিলেন। আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণাপত্রে প্রচলিত আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে একটি নতুন ও মধ্যপন্থি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। মধ্যপন্থার নীতির কথা বলে এলেও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এনসিপি যে জোটে যুক্ত হয়েছে, তা কোনোভাবেই মধ্যপন্থার জোট নয়। জোটের অধিকাংশ দল, বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ইসলামী শাসন চায়। ফলে এনসিপির মধ্যপন্থার ঘোষণা এবং নির্বাচনী জোটের বাস্তব কার্যক্রমের মধ্যে বেশ বৈপরীত্য লক্ষ্য করা গেছে।
.png)
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এনসিপি ছয়টি আসনে সরাসরি জয় পায়। পরবর্তী সময়ে সংরক্ষিত নারী আসনসহ সংসদে দলটির মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় আট জনে। অন্যদিকে ৮টি সংরক্ষিত আসনসহ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আসন ৭৬টি। জামায়াত প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় রয়েছে। আর এনসিপি বিরোধী জোটের অন্যতম শরিক। এ ছাড়া এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মনোনীত করা হয়। অর্থাৎ জোটে গিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে দৃশ্যমান অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে দলটি। তবে নির্বাচনের আগে ও পরে দলটির সামনে নতুন কিছু রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়।
নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে জোট করা নিয়ে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব একধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়ে। জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তে বাম ও মধ্যপন্থী ঘরানার অন্তত ১৭ জন নেতা দলটি থেকে পদত্যাগ করেন। তবু শীর্ষ নেতৃত্ব জোটের সিদ্ধান্তেই অটল থাকে। এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা নেতাদের বড় অংশ এখন তিনটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছেন। প্ল্যাটফর্মগুলো হলো নেটওয়ার্ক ফর পিপল’স অ্যাকশন বা এনপিএ, অল্টারনেটিভস এবং গণবিপ্লবী উদ্যোগ। এর বাইরে এনসিপির সাবেক নেতা তাসনিম জারা, খালেদ সাইফুল্লাহ ও মুশফিক উস সালেহীন আলাদাভাবে সক্রিয় আছেন। এসব নেতার দলে ফেরার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। এছাড়া দেশের বিভিন্নস্থানে দলটির নেতাকর্মীরা নানা অপকর্ম ও অবৈধ অর্থ উপার্জনে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে উঠে আসে। সবশেষ এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়-এর উপদেষ্টা থাকাকালীন সময়ে দেশ থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং ঢাকা ওয়াসা, এলজিইডি ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনে কর্মকর্তা নিয়োগে মোট ১৮৭ কোটি টাকা, ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডারে কমিশন নেয়া এবং নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। আসিফের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ গুরুত্বের সাথে অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সার্বিক পরিস্থিতিতে এখন বড় প্রশ্ন উঠেছে আগামী দিনের রাজনীতিতে এনসিপি কি স্বতন্ত্র একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, নাকি বড় রাজনৈতিক জোটের ওপর নির্ভরশীল একটি ছোট দলে পরিণত হবে?
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, এনসিপি এখন সংসদে আছে, কিন্তু সংসদে থাকা আর রাজনৈতিক বিকল্প হয়ে ওঠা এক বিষয় না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর এনসিপির নেতাদের যে গ্রহণযোগ্যতা ছিল, সেখানে অবনমন ঘটেছে। রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, সংসদে জায়গা পেলেও ‘বিকল্প’ হয়ে ওঠার লড়াইটি এনসিপির জন্য বেশ কঠিন। তাছাড়া এনসিপি মধ্যপন্থার নীতির কথা বলে রাজনীতি শুরু করলেও এমন একটি দলের সাথে জোট করেছে যারা গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ইসলামী শাসনে বিশ্বাসী। যা কোনোভাবেই মধ্যমপন্থার জোট নয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ের গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, অনেক প্রতিশ্রুতি আর আদর্শিক বার্তা দিয়ে গঠিত এনসিপি এখন ভাটির টানে। দলটির জামায়াতের সঙ্গে জোট তরুণ শীর্ষ নেতাদের অনেকেই মেনে নিতে না পেরে দল ছেড়েছেন। দলটি শুরু থেকেই একের পর এক ভুল করে রাজনীতির বিশুদ্ধতা হারিয়ে ফেলছে। তিনি বলেন, দলটির একটি অংশ নীতি-নৈতিকতার দিক দিয়ে কলুষিত হয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতে যেন অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে রেহাই পাওয়া যায় এবং নিরাপত্তা পাওয়া যায় এ কারণেই একটি বড় দলের সঙ্গে থাকতে চাচ্ছে। এক্ষেত্রে বিএনপির সাথে বোঝপড়া না হওয়ায় জামায়াতই বর্তমানে দ্বিতীয় বড় দল। সে কারণে জামায়াতের সঙ্গেই মিলিত হয়েছে। তিনি বলেন, এনসিপির দরকার ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানো। তবে এনসিপির নিজের পায়ে দাঁড়ানো আর সম্ভব হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন না এ রাজনৈতিক গবেষক।
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারির সাথে আলাপ হলে তিনি এ বিষয়টি মানতে রাজি নয়। এনসিপির এ নেতা বলেন, আমরা মূলত একক দল জামায়ায়েতে ইসলামীর সাথে জোটে যাইনি। আমরা ১১ দলীয় জোটে গিয়েছি। এতে দল হিসেবে এনসিপির স্বকিয়তায় কোন ভাটা পড়েনি। বরং দল আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং সংসদে আমরা প্রতিনিধিত্ব করছি।
এনসিপিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে এখন কি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে? এ প্রশ্নের জবাবে নাসির উদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, এনসিপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বা এককভাবে নিজেদের স্বাধীন রাজনৈতিক অস্তিত্ব বজায় রেখে লড়াই করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশাপাশি আমরা এখন সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে মনোযোগ দিচ্ছি। এজন্য সর্বস্তরে দলকে সুসংগঠিত করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
অবশ্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিপির এক নেতা বলেন, দল প্রতিষ্ঠার কয়েকদিনের মাথায় আমাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে। নতুন অবস্থায় সাংগঠনিকভাবে আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলাম না। জোট না হলে সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকা নিয়ে আমরা সন্দিহান ছিলাম। এ ছাড়া সংস্কার বাস্তবায়নে বিএনপির অনীহা একটা শঙ্কা তৈরি করেছিল, যেটা এখন দেখা যাচ্ছে। সব কিছু মিলিয়ে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটা জোট হওয়া অনিবার্য ছিল। তিনি বলেন, আমাদের দাবি এবং জামায়াতের দাবি একই ছিল। তাই আমরা জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হয়েছি। এতে আমাদের নিজেদের গতিতে একটু ভাটা পড়েছে। তার মানে এই নয়, আমরা জামায়াতের ওপর ভর করে চলছি।