ঢাকা,  রোববার   ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

চার দশকের পথচলা: কোন পথে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ?

মো. বায়েজিদ মুন্সি মো. বায়েজিদ মুন্সি
প্রকাশিত: ১৬:৩৯, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চার দশকের পথচলা: কোন পথে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ?
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ

প্রতিষ্ঠার চার দশক পার হলেও প্রধান শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জাতীয় রাজনীতিতে বড় কোনো নির্বাচনী বিজয় বা সংসদীয় প্রভাব অর্জনে মেলেনি কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। সবশেষ জাতীয় নির্বাচনে ২৫৯ আসনে প্রার্থী দিলেও জয় মিলেছে মাত্র একটি আসনে; জামানত হারিয়েছেন অধিকাংশ প্রার্থী।

এতে ইতিহাসের প্রথমবারের মতো দলের জন্য সংসদে প্রবেশের পথ খুললেও ভোটের হিসাব বলছে, জাতীয় পর্যায়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে তাদের পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ পথ। এ বাস্তবতায় সাংগঠনিক শক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সামনে রেখে এগোচ্ছে দলটি। আগামী ১০ বছরের মধ্যে দলকে একটি শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।

Advertisement

দলটির নেতারা বলছেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে দলকে একটি ভালো অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গত ৫৫ বছরে দেশের মানুষ আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকে একাধিকবার ক্ষমতায় বসিয়ে দেখেছে, এখন জামায়াতে ইসলামীর রূপও দেখছে; কিন্তু ইসলামী আন্দোলনকে দেখেনি। আশা করছি, আগামী দিনে দেশের জনগণ ইসলামী আন্দোলনকে বেছে নেবে।

১৯৮৭ সালের ১৩ মার্চ চরমোনাইর তৎকালীন পীর সৈয়দ ফজলুল করীম ‘ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন’ নামে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও ১৯৯১ সাল থেকে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দলে অনৈক্য ও ভাঙন দেখা দিলে এটি সৈয়দ ফজলুল করীমের নেতৃত্বে একক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়।

দলের নামে ‘শাসনতন্ত্র’ শব্দ থাকায় ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন জটিলতার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে এ শব্দ বাদ দিয়ে নাম রাখা হয় ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’। এরপর দলটি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হয়ে ‘হাতপাখা’ প্রতীক লাভ করে।

দলটির অঙ্গসংগঠনের মধ্যে রয়েছে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ, ইসলামী যুব আন্দোলন, ইসলামী শ্রমিক আন্দোলন বাংলাদেশ, ইসলামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম পরিষদ, ইসলামী আইনজীবী পরিষদ, জাতীয় শিক্ষক ফোরাম এবং জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদ।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বর্তমান আমীর সৈয়দ রেজাউল করীম, নায়েবে আমীর সৈয়দ ফয়জুল করীম এবং মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন গাজী আতাউর রহমান।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ গড়ে ওয়ান বক্স পলিসির মাধ্যমে ইসলামপন্থি শক্তিকে এক করার অপ্রাণ চেষ্টা চালায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। নির্বাচনের আগে দলটির জোট-রাজনীতি নিয়ে আলোচনাও ছিল ব্যাপক। কিন্তু শরীআহ আইনের বাস্তবায়ন ও নির্বাচনী আসন ভাগাভাগি ইস্যুতে জামায়াতের সঙ্গে দলটির সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়। নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে নির্বাচনের প্রায় এক মাস আগে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করে দলটি।

১৬ জানুয়ারি ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ থেকে বেরিয়ে ২৫৯ আসনে দলীয় প্রার্থীদের এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেয় তারা। নির্বাচনে এত আসনে প্রার্থী দিলেও জয় মিলেছে মাত্র একটি আসনে এবং জামানত হারিয়েছেন অধিকাংশ প্রার্থী। তবে সব আসনের চিত্র এক ছিল না। বরিশাল-৫ আসনে ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমীর সৈয়দ ফয়জুল করীম ৯৫ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন। বরিশাল-৬ আসনেও তিনি পান ৫৫ হাজারের বেশি ভোট। অর্থাৎ কিছু এলাকায় দলটির প্রার্থীরা শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, যা ভবিষ্যতের জন্য দলটির ‘মডেল’ হতে পারে।

এ ছাড়া দল প্রতিষ্ঠার ৩৯ বছর পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরগুনা-১ আসনে হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী বিজয়ী হয়ে সংসদে প্রথমবারের মতো দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেন। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি এবং ভবিষ্যতে দলটির সাংগঠনিক বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী আকবর বলেন, ইসলামপ্রেমী মানুষের একটি অংশ জামায়াতে ইসলামীর ওপর হতাশ হয়ে ইসলামী আন্দোলনকে সমর্থন দিচ্ছে। এই অংশের একটি বড় অংশ সাধারণ শ্রমিক শ্রেণির—যাঁদের মধ্যে রিকশাচালক, সিএনজিচালক, দিনমজুর, ছোট ব্যবসায়ী ও ফুটপাতের বিক্রেতারা রয়েছেন। এ ছাড়া দুটি বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অসহিষ্ণুতা এবং জাতীয় পার্টির ব্যর্থতাও ইসলামী শক্তির উত্থানে অবদান রাখছে।

তিনি আরও বলেন, ইসলামী আন্দোলন যেভাবে ধীরে ধীরে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করছে, তাতে মনে হয় আগামী দিনে তারা একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহকারী মহাসচিব মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ুম বলেন, ‘দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে আমরা আমাদের নীতি ও আদর্শে অটল থাকতে পেরেছি—এটি আমাদের অনেক বড় পাওয়া। জাতির কাছে দেওয়া অঙ্গীকার নিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি, আগামী ১০ বছরে দলটি একটি ভালো পর্যায়ে পৌঁছাবে। এ জন্য আমরা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘৫৫ বছরে মানুষ আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বিএনপিকে দেখেছে; এখন জামায়াতে ইসলামীকেও দেখছে। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনকে দেখেনি। আশা করছি, দেশের জনগণ আগামী দিনে ইসলামী আন্দোলনকে বেছে নেবে।’

দীর্ঘ ৪০ বছরে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অগ্রগতি সম্পর্কে দলটির মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৭ সালে, তবে এককভাবে এর যাত্রা শুরু হয় ২০০৮ সালে। এর আগে তারা কোনো নির্বাচনে অংশ নেননি বা গণমুখী ধারায় গড়ে ওঠেননি। দলটি হাতপাখা প্রতীক নিয়ে ২০০৮ সালে সক্রিয় হয়; সে হিসাবে মূলধারার রাজনীতিতে তাদের প্রবেশের বয়স মাত্র ১৮ বছর।

তিনি আরও বলেন, ক্ষমতার বাইরে থেকে কিংবা বড় কোনো দলের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া শুধু বাংলাদেশে নয়, এই উপমহাদেশে টিকে থাকা কঠিন। এর মধ্যেও সারা দেশের ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত তাদের সাংগঠনিক বিস্তৃতি রয়েছে। মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর একটি হিসেবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে এবং তারা পিছিয়ে নেই—বরং নির্বাচনের ফলাফল ক্রমেই ভালো হচ্ছে ও ভোট বাড়ছে। কোনো রাজনৈতিক জোটে না গিয়ে এককভাবে টিকে থাকাকেই তারা দলটির সবচেয়ে বড় সফলতা বলে মনে করেন।

লক্ষ্য বাস্তবায়নে দলটির পরিকল্পনা সম্পর্কে মহাসচিব বলেন, ‘ক্ষমতায় না গেলে আমরা আমাদের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে পারব না; সে জন্য আমরা পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ১০ বছরের পরিকল্পনাও আছে। তবে এই সময়ের মধ্যেই যে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো যাবে, বিষয়টি এমন নয়। দেখা গেছে, পাঁচ বছরেও সফলতা আসতে পারে, আবার ৫০ বছরও লাগতে পারে। পুরো বিষয়টি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।’

ডেইলি-বাংলাদেশ//এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!