ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

ভৈরবে সচল উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের জমিতে মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ, ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

নাজির আহমেদ আল-আমিন, ভৈরব (কিশোরগঞ্জ)
প্রকাশিত: ২১:০৩, ৩ নভেম্বর ২০২৬
ভৈরবে সচল উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের জমিতে মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ, ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী
ভৈরব বাজারে অবস্থিত উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

কিশোরগঞ্জের ভৈরব বাজার উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রায় ৪৬ শতাংশ জমিতে মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি চালু রেখেই অবশিষ্ট জায়গায় মার্কেট নির্মাণের কথা বলা হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালের জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাঁদের দাবি, মার্কেট নির্মাণ না করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির অবকাঠামো সম্প্রসারণ করে আধুনিক হাসপাতালে রূপান্তর করা হোক।

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন ভৈরবের সচেতন নাগরিকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গুরুত্বপূর্ণ এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাকিস্তান আমলে ভৈরব বাজার এলাকায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্বাধীনতার আগ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চলছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির জমি নিয়ে বিভিন্ন মহলের তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক ভিপি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোছা. মোস্তারি কাদেরীসহ কয়েকজন কর্মকর্তা ও স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পরিদর্শনে যান। এ সময় হাসপাতালের পেছনে থাকা একটি পুরোনো ভবন ভাঙার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। সচল স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিকে পরিত্যক্ত দেখিয়ে জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।

এর আগে প্রায় তিন মাস আগে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও একটি প্রতিনিধি দল উপজেলা ভূমি অফিসে গিয়ে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের জমির মালিকানা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। প্রায় এক সপ্তাহ আগে জেলা পরিষদের প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবারও ভৈরবে এসে জায়গাটি পরিদর্শন করেন। পরে ৩ নভেম্বর সকালে স্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা স্বাস্থ্যকেন্দ্র এলাকায় যান।

সাংবাদিকেরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সেখান থেকে চলে যান। পরে হাসপাতালের সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে দুই জায়গায় রাখা বিপুলসংখ্যক নতুন ইট দেখা যায়। স্থানীয়দের ধারণা, সেখানে প্রায় ১০ হাজার ইট রাখা হয়েছে। এ ছাড়া হাসপাতালের পেছনের পুরোনো ভবনটির কিছু অংশ ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, মার্কেট নির্মাণের জন্য এসব ইট আনা হয়েছে। এমনকি নির্মাণকাজ শুরুর আগেই এক শাটারের প্রতিটি দোকান ৩৫ লাখ টাকা করে বিক্রির কথা বিভিন্ন মানুষের কাছে শুনেছেন তিনি। তবে দোকান বিক্রির বিষয়ে কোনো লিখিত বা আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ভৈরব উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার জারকা বেগম বলেন, সকালে হাসপাতালে এসে তিনি শ্রমিকদের ইট আনতে দেখেন। পরে জেলা পরিষদের প্রশাসক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও কয়েকজন নেতাকর্মী সেখানে উপস্থিত হন। এ সময় হাসপাতালের পেছনের পুরোনো ভবনটি ভাঙার চেষ্টা করা হয়।

তিনি বলেন, প্রতিদিন গড়ে শতাধিক সাধারণ রোগী ও গর্ভবতী নারী এখান থেকে চিকিৎসাসেবা নেন। তাই হাসপাতালটি আরও উন্নত করে আধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ভৈরব উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নামে বিএস খতিয়ান নম্বর-৪-এর ৯০১৭ দাগে প্রায় ৪৬ শতাংশ জমি স্বাস্থ্য বিভাগের নামে রেকর্ড রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিত ওই জমির ভূমি উন্নয়ন করও পরিশোধ করছে। তবে সিএস খতিয়ানে জমিটি জেলা পরিষদের নামে রেকর্ড করা। ফলে জমির মালিকানা নিয়ে পুরোনো ও বর্তমান রেকর্ডে ভিন্নতা রয়েছে।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এএইচএম আজিমুল হক বলেন, প্রায় তিন মাস আগে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জমিটির বিষয়ে জানতে এসেছিলেন। তখন দেখা যায়, বিএস খতিয়ানে জমিটি স্বাস্থ্য বিভাগের নামে রেকর্ড রয়েছে এবং স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করছে। তবে সিএস খতিয়ানে জমিটি জেলা পরিষদের নামে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছ থেকে তিনি জেনেছেন, ২০১৯ সালে আন্তমন্ত্রণালয়ের একটি সভার কার্যবিবরণীতে পরিত্যক্ত উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো জেলা পরিষদের অধীনে নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সে অনুযায়ী সচল হাসপাতালটি রেখে অবশিষ্ট জায়গা জেলা পরিষদের অধীনে নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় ছিল। তবে সেখানে মার্কেট নির্মাণের বিষয়ে তাঁকে কিছু জানানো হয়নি।

ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কিশোর কুমার ধর বলেন, বিষয়টি তিনি কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জনকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন। ভৈরব বাজার উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি স্বাধীনতার আগে থেকে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন শতাধিক রোগী এখান থেকে বহির্বিভাগের চিকিৎসাসেবা নেন।

তিনি জানান, বর্তমানে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে একজন মেডিকেল অফিসার, একজন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, একজন মিডওয়াইফ, একজন ফার্মাসিস্ট ও একজন অফিস সহায়ক কর্মরত রয়েছেন। ভৈরব পৌরসভার বাজার এলাকায় ১৫ হাজারের বেশি মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র এটি। পাশাপাশি পৌরসভা সেখানে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করে।

ডা. কিশোর কুমার ধর আরও বলেন, হাসপাতালের অব্যবহৃত পুরোনো ভবন ভেঙে নতুন স্থাপনা নির্মাণের উদ্দেশ্যে কিছু ইট রাখা হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্যসেবার স্বার্থে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটিকে আধুনিক চিকিৎসার উপযোগী করে গড়ে তোলা জরুরি। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম সেখানে ২০ শয্যার একটি ডায়াবেটিক হাসপাতাল স্থাপনের চেষ্টা করছেন বলেও জানান তিনি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে.এম. মামুনুর রশীদ বলেন, জেলা পরিষদের কর্মকর্তারা সেখানে এসেছিলেন বলে তিনি শুনেছেন। ২০১৯ সালের আন্তমন্ত্রণালয়ের সভায় পরিত্যক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো জেলা পরিষদের অধীনে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে ভৈরব বাজার উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি সচল রয়েছে। এ বিষয়ে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে তাঁকে কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখানো হয়নি।

কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বিষয়টি তাঁকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. মোস্তারি কাদেরী বলেন, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি সচল রেখেই অবশিষ্ট জায়গায় জেলা পরিষদের উদ্যোগে মার্কেট নির্মাণ করা হবে। এখনো কাউকে দোকান বা জায়গা লিজ দেওয়া হয়নি। নির্মাণকাজের জন্য ইট আনা হয়েছে। জায়গাটি স্বাস্থ্য বিভাগের নামে রেকর্ড রয়েছে বলেও তিনি স্বীকার করেন। তবে জোরপূর্বক জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জেলা পরিষদের প্রশাসক ভিপি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেলকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে তা আইনগত প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করতে হবে। তবে কোনোভাবেই দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসা একটি সচল স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম ব্যাহত করা যাবে না। বরং অবকাঠামো সম্প্রসারণ, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল বৃদ্ধি এবং আধুনিক সরঞ্জাম নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠানটিকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপান্তর করা প্রয়োজন।

তাঁদের মতে, ভৈরবের গুরুত্বপূর্ণ বাজার এলাকায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসেন। সেখানে বাণিজ্যিক মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ জনস্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। বিশেষ করে ২০ শয্যার ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলার মধ্যে মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এলাকাবাসীর প্রশ্ন, যেখানে প্রতিদিন শতাধিক মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন, সেখানে অবকাঠামো উন্নয়নের পরিবর্তে মার্কেট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? তাঁদের প্রত্যাশা, জমির মালিকানা ও জনস্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ পুনর্বিবেচনা করবে এবং উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটিকে আধুনিক হাসপাতালে রূপান্তরের ব্যবস্থা নেবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/ভৈরব/এমকে
ট্যাগ: কিশোরগঞ্জ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!