ঢাকা,  শুক্রবার   ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]
শকুন আজ বিলুপ্তির পথে

মরার হগুন উড়ত্যাছে-গোয়াল ঘরে ধুমা দে

গাজী শাহাদত হোসেন ফিরোজী
প্রকাশিত: ১১:১৫, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
মরার হগুন উড়ত্যাছে-গোয়াল ঘরে ধুমা দে
শকুন আজ বিলুপ্তির পথে। ছবিঃ ডেইলি বাংলাদেশ

গ্রাম-বাংলার প্রতিটি আনাচে-কানাচে লুকিয়ে আছে রূপকথার গল্প। যার কিছুটা সত্যি হলেও অধিকাংশই ছিল কাল্পনিক। যদিও প্রবীণরা এর উপর বিশ্বাস রেখে তাদের জীবন পরিচালনা করত।


তেমনি এক অন্ধবিশ্বাস ছিল শকুনকে ঘিরে। আলোচিত এই পাখি যখন কোনো বাড়ির উপর দিয়ে অতিক্রম করত তখন দাদি-নানিরা বলত, ‘এই গেদি মরার হগুন উড়ত্যাছে-গোয়াল ঘরে ধুমা দে (শকুন উড়ছে, গোয়াল ঘরে ধোঁয়া দাও)। তাদের কথা তামিল করতে বউ-ছেলে-মেয়েরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠত। গোয়ালের গরু রক্ষায় তারা মাটির পাত্রে তুষের আগুন জ্বালিয়ে গোয়াল ঘরে ধোঁয়া দিত। কালের আবর্তে সেই অন্ধ বিশ্বাস আজ আর নেই। সেই শকুনও বিলুপ্তপ্রায়।


শকুন সাধারণত আকাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ওড়ে। দেখতে খুব সুন্দর- ব্যাপারটা ওরকম নয়। এদের মাথা, গলা ও ঘাড়ে কোনো পালক নেই। এরা প্রশস্ত ডানায় ভর করে উড়ে বেড়ায় আকাশের অনেক উপরে। অতীতে মরা প্রাণীর মাংস খেয়ে জীবনধারণ করা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সম্পন্ন সেই শকুন আজ বিলুপ্তির পথে।


কামারখন্দ উপজেলা বয়োবৃদ্ধ জসিম উদ্দিন (১০৪) জানায়, এরা অসুস্থ আর মৃতপ্রায় প্রাণীর চারিদিকে শিকারী পাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে প্রাণিটি মরার পর্যন্ত অপেক্ষা করে। চক্রাকারে ঘোরা এই পাখির কোনোটিকে মাটিতে নামতে দেখলে অন্যগুলো তাকে অনুসরণ করে হামলে পড়ত।


এরা কখনো এক জায়গায় বেশিক্ষণ অবস্থান করত না। বায়ুপ্রবাহের ওপর নির্ভর করে এদের চলাচল কমবেশি হতো। সাধারণত লোক চক্ষুর অন্তরালে বট, পাকুড়, ডুমুর প্রভৃতি বিশালাকার গাছে এসব প্রাণী বাসা বাঁধে। গুহা, পর্বতের চূড়া বা গাছের কোটরে এরা ১ থেকে ৩টি সাদা বা ফ্যাকাসে ডিম পাড়ে।


জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডাঃ এ কে এম আনোয়ারুল হক জানায়, বিশ্বে প্রায় ১৮ প্রজাতির শকুন দেখা যায়। তার মধ্যে বাংলাদেশে এখন প্রায় ৫ প্রজাতির শকুন দেখা যায়। এগুলো হলো বাংলা শকুন, সরুর ঠোঁটিশকুন, রাজশকুন, কালোশকুন, হিমালয়ান শকুন, ইউরেশীয় শকুন। ২ প্রজাতির অতিথি পাখি হিসেবে আমাদের দেশে আসে। এগুলোর মধ্যে হিমালয়ান শকুন, ইউরেশীয় শকুন।


শকুনই একমাত্র প্রাণী, যা রোগাক্রান্ত মৃত প্রাণি খেয়ে হজম করতে পারে। মানুষের পক্ষে যাকিছু ক্ষতিকর সেসব আবর্জনাই খেয়েই তারা পরিবেশকে পরিছন্ন রাখে। শুধু তাই নয়, অ্যানথ্রাক্স, যক্ষ্মা, খুরারোগের সংক্রমণ থেকে অবশিষ্ট জীবকুলকে রক্ষা করে বলে মেডিসিন গবেষক ড. লিন্ডসে তাঁর এক গবেষণায় প্রমাণ করেন। তার ওই গবেষণায় তিনি এটাও প্রমাণ করেছেন যে, বাংলাদেশে ডাইক্লোফেনাকের অতিরিক্ত ব্যবহারই শকুন বিলুপ্তির অন্যতম কারণ।


অতীতে আমাদের দেশে প্রচুর শকুন দেখা যেত। মৃতদেহ থেকে ক্ষতিকারক জীবাণু ছড়ানোর আগেই তা শেষ করতে পারে শকুন। কিন্তু শকুনের দল উড়ে এসে যখন মাটিতে পড়ে তখনই শুরু হয় তাদের উপর অন্য রকম অত্যাচার। কেউ ঢিল ছুড়ে, কেউ দড়ির ফাঁদ তৈরি করে বেঁধে রাখে, কেউ বা পা ভেঙে দেয়, আবার কেউ কেউ এদের পিটিয়ে হত্যা করে।


গ্রাম-বাংলার পরিবেশ রক্ষায় শকুন বাঁচিয়ে রাখা সবারই দায়িত্ব বলে সচেতন মহল মনে করেন। শকুনকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে প্রতিবছরই সেপ্টেম্বের মাসের প্রথম শনিবার আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস পালিত হয়ে থাকে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/সিরাজগঞ্জ
ট্যাগ: সিরাজগঞ্জ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!