ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

এতো ইলিশ যাচ্ছে কোথায়: দাম আকাশচুম্বি!

বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৯:২০, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এতো ইলিশ যাচ্ছে কোথায়: দাম আকাশচুম্বি!
জালে উঠছে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ

ইলিশ। বাঙালির জাতীয় মাছ। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা আর বঙ্গোপসাগরের রূপালি শস্য। প্রতিবছর বর্ষা এলেই জেলেরা জাল ফেলেন আশা নিয়ে। এবারও সেই আশায় সাগর-নদীতে নেমেছেন হাজার হাজার জেলে। কোথাও কোথাও জালে উঠছে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় এক ট্রলারে একবারে ৪৬ মণ ইলিশ ধরা পড়েছে। কলাপাড়ায় আরেক ট্রলারে এসেছে প্রায় ৮০ মণ। চট্টগ্রাম উপকূলে জুলাই মাসেই ধরা পড়েছে প্রায় ৩৫ লাখ ইলিশ, যার ওজন দেড় হাজার টনেরও বেশি। তবু ঢাকার বাজারে ইলিশের সরবরাহ যেন শুকিয়ে গেছে। যা আসছে, তার দাম আকাশচুম্বি। এক কেজির ওপরের ইলিশ ৩২০০ টাকা, আধা কেজির মাছ ১৮০০ টাকা। মধ্যবিত্ত তো দূরের কথা, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ইলিশ এখন শুধু স্বপ্ন।

কারওয়ান বাজারের আড়তে দুপুরের রোদে দাঁড়িয়ে মাছ বিক্রেতা শুক্কুর আলী বলছিলেন, “বিশ বছর ধরে এই ব্যবসা করছি। এত দাম আগে কখনো দেখিনি। এক কেজির ইলিশ এখন ২৪০০ টাকার নিচে নেই। গত বছর একই মাছ ১৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এবার ৪০০-৫০০ টাকা বেশি। ক্রেতারা দাম শুনেই চলে যান। বিক্রি কমে গেছে অনেক।” তাঁর দোকানে দুইটি ঝুড়িতে সাজানো ছোট ইলিশ। ২৫০ গ্রামের মাছগুলোয় চাহিদা বেশি, কারণ এক কেজির মাছ এখন অনেকের নাগালের বাইরে।

Advertisement

ক্রেতা আলতাফ হোসেন এসেছিলেন এক কেজির ইলিশ কিনতে। দাম শুনে হতাশ হয়ে বললেন, “এ বছর দ্বিতীয়বার এসেছি ইলিশ কিনতে। আগেরবার ১৮০০ টাকায় কিনেছিলাম। এখন ২৪০০ চাইছে। বাজেট নেই। দুটো ৭৫০ গ্রামের মাছ নিলাম। এক কেজির মাছ আর আমার সাধ্যের মধ্যে নেই।” আলতাফের মতো অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার এখন ইলিশকে উৎসবের বিশেষ খাবার হিসেবেই দেখছেন। সাধারণ দিনে টেবিলে ইলিশ তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে।

চাঁদপুরের বড়স্টেশন মাছঘাট দেশের সবচেয়ে বড় ইলিশের পাইকারি বাজার। তিন বছর আগে জুলাই থেকে প্রতিদিন গড়ে ২০০০ মণ ইলিশ আসত। গত বছর সেই পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০০ মণ। এবার গড়ে মাত্র ২৫০ মণ। চাঁদপুর মাছ ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল বারী জমাদার ৩০ বছরের অভিজ্ঞতায় বলছেন, “এত কম সরবরাহ আগে কখনো দেখিনি। নদীতে মাছ নেই বললেই চলে। দূষণ, জাটকা ধরা, ছোট মেশের জাল আর নদীর তলদেশে চর পড়ে যাওয়া—এসব কারণে ইলিশ কমে গেছে। সাগর থেকে যেসব ট্রলার আসে, বেশিরভাগই ২০-৩০ মণের বেশি নিয়ে ফিরতে পারছে না।”

জেলেদের অবস্থাও ভালো নয়। ভোলার এক জেলে আলমগীর বলছিলেন, “পাঁচ বছর পর একসঙ্গে এত বড় চালান পেয়েছি। ৪৬ মণ ইলিশ নিলামে সাড়ে ৪৮ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন এমন হয় না। অনেক দিন শূন্য হাতে ফিরতে হয়। জ্বালানির দাম বেড়েছে, খরচ বেড়েছে। মাছ কম ধরলে লোকসান।” চট্টগ্রামের আনোয়ারায় নৌকা মালিক দিদারুল ইসলাম জানান, প্রতিটি নৌকায় প্রতিদিন প্রায় ৪০ লিটার ডিজেল লাগে। ডিজেলের দাম বাড়ায় খরচ বেড়েছে। আবহাওয়াও অনুকূল নয়। ফলে মাছের দামে এর প্রভাব পড়ছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার টনে পৌঁছেছিল। পরের বছর ৭ শতাংশ কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার টন হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও ১২ শতাংশ কমে প্রায় ৫ লাখ টনে নেমে আসে। এবার ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, উৎপাদন আরও ৩০-৪০ শতাংশ কমতে পারে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকরা বলছেন, ইলিশের ডিম ছাড়ার পরিমাণ কমেছে, রেনু পোনা কমছে, জাটকা বাঁচার হারও নিম্নমুখী। নদীতে জুপ্ল্যাংকটন ও ফাইটোপ্ল্যাংকটনের ঘাটতি, দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট।

এ অবস্থায় ভারত থেকে হাজার হাজার টন ইলিশ ঢুকছে দেশের বাজারে। বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৭ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে আগস্টেই এসেছে ৩ লাখ ২৩ হাজার কেজির বেশি। মোট আমদানি মূল্য প্রায় ৭ কোটি টাকা। ব্যবসায়ীদের হিসাবে ভারত থেকে এলসির মাধ্যমে আসা ইলিশের কেজিপ্রতি ঘোষিত মূল্য ২৫২ টাকা। শুল্ক, ট্রাক ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৫১৪ টাকা। অথচ যশোর, বেনাপোলসহ বিভিন্ন বাজারে এসব মাছ বিক্রি হচ্ছে ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকা কেজি দরে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলোকে ‘পদ্মার ইলিশ’ বা ‘বরিশালের ইলিশ’ বলে চালানো হচ্ছে। স্থানীয় ১.২ থেকে ১.৩ কেজি ওজনের দেশি ইলিশ এখন ৩৩০০ থেকে ৩৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, “ভারত থেকে ইলিশ আমদানির সঠিক কারণ এ মুহূর্তে নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে বাজারে এসব মাছ স্থানীয় বলে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। আমরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি।” জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও বিষয়টি নজরে রাখছে বলে জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহ কমার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে জাটকা ধরা, মা ইলিশ সংরক্ষণে ব্যর্থতা, নদীর নাব্যতা হ্রাস, দূষণ এবং অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ছোট নৌকায় ধরা ইলিশের কেজিপ্রতি মোট খরচ প্রায় ৮১৩ টাকা, মাঝারি নৌকায় ৮৪৬ টাকা এবং বড় ট্রলারে ৮২৮ টাকা। অথচ বাজারে দাম উঠছে ৮৫০ থেকে ৩০০০ টাকারও বেশি।

ঢাকার পূর্ব রামপুরা বউবাজারে এক ক্রেতা রেহানা বেগম বলছিলেন, “আগে বছরে অন্তত চার-পাঁচবার ইলিশ কিনতাম। এখন একবারই কিনতে পারি উৎসবে। আধা কেজির মাছ ১৮০০ টাকা। পরিবারে পাঁচজন। এক বেলা খাওয়ার জন্যই অনেক টাকা চলে যায়।” মগবাজারের আরেক ক্রেতা করিম মিয়া বলেন, “মধ্যবিত্তের জন্য ইলিশ এখন বিলাসিতা। নিম্নমধ্যবিত্ত তো আরও দূরে।”

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগামী ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন দেশব্যাপী ইলিশ আহরণ, পরিবহণ, মজুত ও বিক্রি নিষিদ্ধ থাকবে। মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান চালানো হবে এবং জেলেদের ভিজিএফ সহায়তা দেওয়া হবে। মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “উৎপাদন বাড়াতে সংরক্ষণই একমাত্র পথ। জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষা করতে না পারলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”

ইলিশ গবেষক ও মৎস্য বিশেষজ্ঞ ড. আনিসুর রহমান বলেন, “ইলিশের প্রজননক্ষেত্র ও অভিপ্রয়াণ পথ রক্ষা করতে হবে। নদী দূষণ কমাতে হবে। জাটকা ধরা বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারে আমদানিকৃত ইলিশের সঠিক লেবেলিং নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ক্রেতারা প্রতারিত না হন।”

বাস্তবতা হলো, সাগরে-নদীতে মাঝেমধ্যে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়লেও সামগ্রিক সরবরাহ কমেছে। উৎপাদন টানা দুই বছর ধরে নিম্নমুখী। জ্বালানি খরচ, পরিবহণ ব্যয় আর মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা মিলিয়ে দাম বেড়েছে আকাশচুম্বি পর্যায়ে। ভারত থেকে হাজার হাজার টন ইলিশ এলেও তা মূলত কম দামে এসে উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের পাতে ইলিশ উঠছে কমেই। জাতীয় মাছ এখন অনেকের কাছে শুধু স্মৃতি ও স্বপ্ন হয়ে উঠেছে।

জেলেরা বলছেন, মাছ থাকলেও লাভ কম। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ কম বলে দাম বাড়ছে। ক্রেতারা বলছেন, সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে। এই চক্র ভাঙতে না পারলে আগামীতে ইলিশ আরও দূরে সরে যাবে সাধারণ মানুষের নাগাল থেকে। রূপালি শস্যের এই সংকট শুধু বাজারের নয়, জাতীয় সম্পদেরও সংকট।

ডেইলি-বাংলাদেশ//এমএ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!