ঢাকা,  শনিবার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ জাতীয় ]

বিদেশে গিয়ে বিপদে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৩৫, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিদেশে গিয়ে বিপদে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকরা
সংগৃহীত ছবি

সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নারী শ্রমিক বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। তাদের বড় একটি অংশ গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গেলেও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান, চাকরির চুক্তিপত্র এবং নিয়োগকর্তা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকায় গন্তব্যে পৌঁছে নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন।

বিদেশে গিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, মজুরি না পাওয়া, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, পাসপোর্ট আটকে রাখা এবং গৃহবন্দি করে রাখার মতো অভিযোগ রয়েছে। অনেক নারী আবার দেশে ফিরছেন মরদেহ হয়ে।

Advertisement

সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে প্রায় ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিবছর প্রায় ১০০ নারী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে।

একই সময়ে বিদেশে নারী শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যা বাড়লেও তাদের নিরাপত্তা ও শ্রম অধিকার কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ সংসদে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন লাখের বেশি নারী কর্মীর বিদেশ যাওয়ার তথ্য তুলে ধরেন। তিনি নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতা, মজুরি বঞ্চনা ও চাকরির চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে ২৪ ঘণ্টার হটলাইন, সেফ হোম, বীমা সুবিধা এবং বিদেশি নিয়োগকর্তাদের তথ্য যাচাই আরও জোরদারের দাবি জানান।

জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, বিদেশে কর্মরত নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।

তিনি জানান, ১৬১৩৫ নম্বরে টোল-ফ্রি হটলাইন চালু রয়েছে। বিদেশে থাকা কর্মীরাও এই নম্বরে অভিযোগ জানাতে পারেন। অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলো সহায়তা করে।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৬২ হাজার ৩১৭ নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ হাজার ২১৪ জন বা প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি নারী কর্মী বিদেশে গেছেন।

এ সময়ে ৪৮টি দেশে ৪২ হাজারের বেশি নারী কর্মী গেছেন। তাদের ৯০ শতাংশের বেশি সৌদি আরব ও জর্দানে গেছেন। এর পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার হিসেবে জাপান, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য ও পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশেও নারী শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন। তাদের বড় একটি অংশ বিদেশে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন।

২০২১ সাল থেকে পাঁচ বছরে ৪১২ নারী অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। এর মধ্যে ৮৪ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যা উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) এক গবেষণায় দেশে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৯৪ শতাংশ নারী নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। ৪৭ শতাংশ জানিয়েছেন যৌন হয়রানির কথা।

এ ছাড়া ৯৭ শতাংশ নারী চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং একই সংখ্যক নারী সাপ্তাহিক ছুটি পাননি বলে জানিয়েছেন। ৮২ শতাংশ নারীকে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সীমা জহুর বলেন, নারী শ্রমিকরা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। কিন্তু তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। দালালদের প্রলোভনে পড়ে অনেক নারী বিদেশে গিয়ে প্রতিশ্রুত কাজ, বেতন ও কর্মপরিবেশ পাচ্ছেন না।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, বিদেশে যাওয়ার আগে নারী কর্মীদের ভাষা, কাজের দক্ষতা এবং গন্তব্য দেশের আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে গৃহকর্মের পাশাপাশি নার্সিং ও পরিচর্যার মতো পেশাতেও তাদের যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এম ইউ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!