শয্যাসংকটে গাছ তলায় শিশুদের চিকিৎসা
ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু ও তাদের স্বজনেরা। ৪৫ শয্যার ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে ২০৪ শিশু। শয্যা তো দূরের কথা, মেঝেতেও জায়গা মিলছে না অনেকের। বাধ্য হয়ে অসুস্থ শিশুদের নিয়ে হাসপাতালের সামনের গাছতলায় আশ্রয় নিচ্ছেন অভিভাবকেরা।
ওয়ার্ডজুড়ে অতিরিক্ত গরম ও গাদাগাদি পরিবেশের পাশাপাশি রয়েছে খাবার পানির সংকট, অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ বাইরে থেকে কেনার অভিযোগ। কারও শিশুর হাতে চলছে স্যালাইন, কেউ অপেক্ষা করছেন চিকিৎসা ও ওষুধের জন্য।
হাসপাতালের শিশু বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স তাজনেহার জানান, ভর্তি হওয়া শিশুদের অধিকাংশই শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি-কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত।
পঞ্চগড়ের বিউটি বেগম তাঁর ১৭ মাস বয়সী নাতিকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জন্ম থেকেই শিশুটি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছে। এবার টাইফয়েড ও জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। বিউটি বেগম বলেন, ওয়ার্ডের ভেতরে প্রচণ্ড গরম ও ভিড়। একটি বিছানায় দুই থেকে তিনটি শিশুকে রাখা হচ্ছে। কান্নাকাটি ও গরমে শিশুরা ভেতরে থাকতে চায় না। তাই বেশির ভাগ সময় নাতিকে বাইরে খোলা বাতাসে রাখতে হয়। স্যালাইন ও ইনজেকশন দেওয়ার সময় শুধু ভেতরে নেওয়া হয়।
হাসপাতালের পরিবেশ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তার অভিযোগ, রোগীর তুলনায় শৌচাগার কম। নারী-পুরুষকে একই শৌচাগার ব্যবহার করতে হচ্ছে। খাবার পানিরও সংকট রয়েছে। রাস্তার পাশের টিউবওয়েল থেকে পানি আনতে গেলেও অনেক সময় পাওয়া যায় না। তখন হোটেল থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়।
সদর উপজেলার আলী তাঁর অসুস্থ শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি বলেন, ওয়ার্ডের ভেতরে শোয়ার তো দূরের কথা, বসার জায়গাও পাওয়া যায় না। প্রচণ্ড গরম ও ভিড়ের কারণে শিশুরা সেখানে থাকতে চায় না।
শয্যা সংকটের পাশাপাশি হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন একাধিক অভিভাবক। বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড়পলাশবাড়ী এলাকার আবু বকর জানান, তাঁর শিশুসন্তান জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দুই দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। কিন্তু হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ পাননি। প্রয়োজনীয় সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে।
একই অভিযোগ ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ঢেপটিগুড়া গ্রামের কৃষক শরিফুল্লাহর। তিনি নাতিকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ভর্তির পর থেকে হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ পাননি। ইতিমধ্যে ৭০০ টাকার ওষুধ বাইরে থেকে কিনেছেন। ব্যবস্থাপত্রে আরও ওষুধ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোও বাইরে থেকে কিনতে হবে।
ভূল্লী উপজেলার লাউথুতি গ্রামের রুমা তাঁর দুই বছর বয়সী ছেলে রুহুল আমিনকে নিয়ে পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে রয়েছেন। শিশুটির ১০ থেকে ১২ দিন ধরে জ্বর। রুমা বলেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে বিনা মূল্যে কোনো ওষুধ পাননি। হাসপাতালে আসার আগেই ১ হাজার ৩০০ টাকার ওষুধ কিনেছিলেন। চিকিৎসকেরা সেগুলো বাদ দেওয়ার পর নতুন করে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার ওষুধ কিনতে হয়েছে।
একই ধরনের অভিযোগ করেন অর্নিতা আক্তার। তাঁর সন্তান প্রথমে জ্বরে আক্রান্ত হলেও পরে টাইফয়েড ধরা পড়ে। চার-পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে শিশুটি। অর্নিতা বলেন, পাঁচ দিনে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার বেশি ওষুধ কিনতে হয়েছে। হাসপাতালেও খাবার পানি পাওয়া যাচ্ছে না। টিউবওয়েলের হাতল বাঁধা থাকায় পানি তোলার সুযোগ নেই। দুটি শৌচাগারের একটিতে ময়লা জমে বন্ধ রয়েছে। অন্যটি সবাইকে ব্যবহার করতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিশুর বাবা অভিযোগ করেন, তাঁর ১৫ মাস বয়সী মেয়েকে গত সোমবার দিবাগত রাত ১টার দিকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী দুটি ক্যানুলা কিনে আনলেও একটি শিশুর শরীরে পরানোর পর অন্যটি ও নতুন টেপ নিজেদের কাছে রেখে দেওয়া হয়। পরে টেপ চাইলে নেই বলে জানানো হয়। ইনজেকশনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীও বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শিশু ওয়ার্ডের বাইরেও হাসপাতালের শৌচাগার ও পানি সরবরাহের অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেন বলেন, দুটি শৌচাগারে সমস্যা রয়েছে, অন্য চারটি চালু আছে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে আগামী এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ ও ফলোআপ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ফিরোজ জামান জুয়েল বলেন, সমস্যাগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলী ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগকে বিষয়গুলো জানানো হয়েছে। শৌচাগার ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ না পাওয়া এবং ক্যানুলা নিয়ে অভিভাবকদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজারকে জানানো হবে। ওষুধের বিষয়ে স্টোরকেও ডাকা হবে। পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে সুইপারদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।
রোগীর অতিরিক্ত চাপের কথা স্বীকার করে তত্ত্বাবধায়ক ফিরোজ জামান জুয়েল বলেন, ৪৫ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে কখনো ২৫০ জনের মতো শিশুও ভর্তি থাকে। প্রতিটি শিশুর সঙ্গে মা-বাবাও থাকেন। ফলে ওয়ার্ডে মানুষের চাপ আরও বেড়ে যায়।