ঢাকা,  শুক্রবার   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

এক যুগ পর হাওরের বুকে জমজমাট নৌকাবাইচ

রায়হান জামান,কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২১:৫৭, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এক যুগ পর হাওরের বুকে জমজমাট নৌকাবাইচ
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

একসঙ্গে ছুটছে সারি সারি নৌকা, ছন্দ মিলিয়ে বইঠা চালাচ্ছেন মাঝিরা। তীরে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাস, আর ঢাকঢোলের শব্দে মুখর ঘোড়াউত্রা নদী। দীর্ঘ প্রায় এক যুগ পর নিকলীতে নৌকাবাইচ ঘিরে যেন ফিরে এসেছে হাওরবাংলার চেনা সেই উৎসবের আবহ।

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীর দুই পাড় ও মাঝজুড়ে ছিল দর্শনার্থীদের সরব উপস্থিতি।

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিকলী উপজেলার বেড়িবাঁধ এলাকায় ঘোড়াউত্রা নদীতে এ নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়। যুবসমাজকে মাদক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রেখে খেলাধুলায় আগ্রহী করা এবং হাওরাঞ্চলের হারিয়ে যেতে বসা লোকজ ঐতিহ্য ধরে রাখার লক্ষ্যে নিকলী সম্মিলিত নাগরিক সমাজ এ আয়োজন করে।

নৌকাবাইচ দেখতে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও অন্যান্য জেলা ও উপজেলা থেকে মানুষ আসেন। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ নৌকা ভাড়া করে নদীর মাঝখান থেকে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন। এদিন নিকলীর বেড়িবাঁধ ও আশপাশের এলাকা পরিণত হয় উৎসবের মিলনমেলায়।

Advertisement

কটিয়াদী উপজেলার করগাঁও এলাকা থেকে ৩০ জনের সঙ্গে নৌকায় করে বাইচ দেখতে এসেছেন মোবারক মিয়া। ২৯ বছর বয়সী এই তরুণের আগে কখনো নৌকাবাইচ দেখা হয়নি। এবারই প্রথম। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নদীতে থাকার পরিকল্পনা থাকায় নৌকাতেই দুপুরের খাবারের আয়োজন করেন তাঁরা। রান্নাও হয়েছে নৌকায়।

বাইচ শুরু হতেই বদলে যায় ঘোড়াউত্রা নদীর পরিবেশ। ঢাকঢোলের তালে মাঝিদের হাঁকডাক আর একসঙ্গে বইঠা চালানোর ছন্দে জমে ওঠে প্রতিযোগিতা। জয়ের জন্য সর্বশক্তি দিয়ে বইঠা চালাতে থাকেন মাঝিরা। কখনো একটি নৌকা এগিয়ে যায়, পরক্ষণেই অন্যটি তাকে পেছনে ফেলে সামনে চলে আসে। দুই পাড়ের দর্শকদের হর্ষধ্বনি ও করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে নদীর চারপাশ। অনেকে মুঠোফোনে ধারণ করেন বাইচের দৃশ্য।

তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর বিজয়ী দলের হাতে প্রথম পুরস্কার হিসেবে তুলে দেওয়া হয় একটি ফ্রিজ। দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দল পায় টেলিভিশন এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলের হাতে তুলে দেওয়া হয় মোবাইল ফোন। পুরস্কার পাওয়ার পর বিজয়ী দল ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে দেখা যায় উচ্ছ্বাস।

হাওর-অধ্যুষিত নিকলী উপজেলার মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে নৌকার সম্পর্ক বহু পুরোনো। বর্ষায় বিস্তীর্ণ হাওর পানিতে তলিয়ে গেলে নৌকাই হয়ে ওঠে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। সেই নৌকাকে ঘিরেই যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে নৌকাবাইচের ঐতিহ্য। তবে আধুনিকতার প্রভাবে আগের মতো নিয়মিত এ আয়োজন না হওয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার এই লোকজ সংস্কৃতি।

স্থানীয় বাসিন্দা রাকিবুল ইসলাম বলেন, একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি উৎসব-আয়োজনে লোকজ সংস্কৃতির ছোঁয়া থাকত। জারি, সারি ও ভাটিয়ালি গান, লাঠিখেলা, কাবাডি ও নৌকাবাইচ ছিল মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। সময়ের সঙ্গে এসব আয়োজন অনেকটাই কমে গেছে। দীর্ঘদিন পর নৌকাবাইচের এমন আয়োজন নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

নৌকাবাইচ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনের সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল। নিকলী সম্মিলিত নাগরিক সমাজের সভাপতি ও নিকলী উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মানিক মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীম আরা, নিকলী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোকাররম সর্দার, কৃষকদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজী মাসুক মিয়া ও নিকলী সদর ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী বিএনপি নেতা মো. মিয়া হোসেনসহ অনেকে।

নৌকাবাইচ শুরুর প্রাক্কালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল বলেন, হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে নৌকার সম্পর্ক গভীর। তাই ঘোড়াউত্রা নদীর এই নৌকাবাইচ শুধু বিনোদনের আয়োজন নয়, লোকজ ঐতিহ্য ধরে রাখারও একটি প্রয়াস।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কিশোরগঞ্জ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!