কাননঘেরা বাড়ি
আমজাদের ধারণা স্মৃতি সত্যকে পূর্ণ ও স্থায়ীরূপে ধারণ করতে সক্ষম নয়। বরং নিয়ত পরিবর্তনশীল এই জগতে পুরাতন সত্যরা ক্রমশ নতুন সত্যের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। যুদ্ধে পরাজিত সৈন্যদলের মত। যাদের বীরত্বগাঁথা ক্রমেই ইতিহাস থেকে হারিয়ে যায় বিজয়ী বাহিনীর বীর্যগাঁথার আড়ালে। অথবা বিস্মৃতিই স্মৃতিগুলোকে রেখে আসে রূপকথার সাত সমুদ্দুর, তেরো নদীর ওপারে। অন্তহীন কোন জলাশয়ের তলার গহীন অন্ধ কুঠুরিতে। সেখান থেকে অতীতের খণ্ডাংশ বা সংযোগহীন কোন চিহ্ন ছাড়া আর কোন কিছুকেই বর্তমানে তুলে আনা সম্ভব হয় না। তারপরেও চন্দনবাইশার যমুনার তীরে বসলেই আমজাদের ভেতরে একটি প্রবল অতীতমুখীতা ভর করে। অতীতের খণ্ডাংশ বা সংযোগহীন চিহ্নগুলো তখন খোলস ভেঙে এক এক করে হাজির হতে থাকে তার চোখের সামনে। এই সময়ে কেউ যদি আমজাদের সামনে এসে দাঁড়াত, তাহলে আমি নিশ্চিত যে, আমজাদকে তার কাছে মনে হত ভিন্ন কোন পৃথিবীর মানুষ!
সুখনগরী গ্রামের শেষপ্রান্তে খরকা বিলের পাড় ঘেষে অবস্থিত ছিল আমজাদদের বাড়ি। উত্তর দক্ষিণে বিস্তৃত। শুধু আমজাদদের পরিবারের নয়। পুরো মেহসাব বংশ এই বাড়িতে বসবাস করত। সবমিলে আটটি শরীক। বিগত কয়েক শতাব্দী যাবত তারা এই বাড়িতেই বসবাস করে আসছিল। বাড়িটার আকৃতি ছিল চতুষ্কোণ। আয়তক্ষেত্রের ন্যায়। বিল পাড়ে হবার কারণে বাড়ির উঠোন ভূমি সমতল থেকে অন্তত পাঁচ ফুট উঁচুতে অবস্থিত ছিল। ফলে প্রতিবছর বন্যার সময়ে চারপাশের সবকিছু জলের নীচে ডুবে গেলেও বাড়ির উঠোনটা ভেসে থাকত জলের উপরে। দূর থেকে দেখলে সেটিকে নোঙর করা একটি প্রাচীন জাহাজ বলে ভ্রম হত। আমজাদের কাছে বাড়িটাকে তখন মনে হত হযরত নূহ (আঃ) এর জাহাজ। সেই বাড়িতে শুধু মানুষজন থাকত না। পশুপাখিও থাকত। বাড়ির সর্ব উত্তরের ঘরটিতে বাস করত আমজাদের চাচা। এখান থেকেই তিনি রাতের আঁধারে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন। বেশ কয়েক বছর ঘরটিতে কেউ বসবাস করত না। সর্বশেষ এই ঘরটিতে বসবাস করেছে আমজাদ। তার ছোটবোনের জন্মের সময় হতে। আমজাদের চন্দনবাইশাতে আগমনের পর থেকে ঘরটা এখন সম্পূর্ণ খালি ছিল।
আমজাদের মনে আছে খরকা বিল থেকে আসা প্রবল বাতাসে অন্ধকারের ভেতরে স্থান-কালের ভেদাভেদ মুছে যেত। তখন আমজাদ পরিষ্কার দেখতে পেত তার সেই হারিয়ে যাওয়া চাচাকে। নিজের অস্তিত্বের সমান্তরালে। ছায়ার মত। অবয়ব বোঝা গেলেও চেহারা স্পষ্ট বোঝা যেত না। আমজাদ দেখত যে, ঘরের ভেতরে তার থেকে মাত্র দুই তিন হাত দূরে গভীর মনোযোগ দিয়ে টিমটিমে হারিকেন বাতির আলোতে তার চাচা বই পড়ছেন। আমজাদ তাকে দেখতে পেলেও চাচা তাকে দেখতে পেতেন না। অথবা দেখতে পেলেও ভ্রূক্ষেপ করতেন না। আমজাদের মনে হত দুটো ভিন্ন সময়কাল পরস্পরের সমান্তরালে বয়ে চলেছে। পরস্পরের সাথে কোনরূপ সংঘর্ষ ছাড়াই। খরকাবিল পাড়ের বাড়িতে তার চাচা কোনদিনই আমজাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেননি। আমজাদও করেনি। অদ্ভুত কোন কারণে। কিন্তু চন্দবাইশাতে আমজাদের আগমনের পর থেকেই তিনি তার সাথে যোগাযোগের অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিরাতেই তার আগমন হয় মধ্যরাতে এবং তিনি তার শিয়রে অবস্থান করেন সুবহে সাদেকের পূর্ব পর্যন্ত।
আমজাদদের বাড়ির উত্তরদিকে ছিল একটা বিশাল তালগাছ। খরকা বিলের পাড় ঘেষে। তালগাছটাতে সারাবছর অসংখ্য বাবুই পাখির বাসা বাদুড়ের মতো ঝুলে থাকতো। খরকা বিলের উত্তরপ্রান্তের তাত্তাপাড়া গ্রাম, এমনকি হাটখোলা বাজারের নিকটবর্তী মাদারগঞ্জ থানা থেকে এই তালগাছ দেখেই বোঝা যেত আমজাদদের বাড়ির অস্তিত্ব। কারণ। তাদের গ্রামটি অনেক বিশাল বিশাল গাছপালা দিয়ে আচ্ছাদিত থাকলেও সেখানে কোন তালগাছ ছিল না। মাদারগঞ্জ আশেক মাহমুদ স্কুল থেকে আমজাদের কাছে তাদের বাড়ির তালগাছটাকে মনে হত কুতুবদিয়ার বাতিঘরের মত। সন্ধ্যের পর দিনের আলো নিভে গেলে গোধূলির প্রায়ান্ধকারে বা রাতের গভীর অন্ধকারের ভেতরে দিকচক্রবালের উপরে বাবরির মত ঝুঁটি নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত। ধ্রুবতারার মত। ফলে রাতের অন্ধকারেও আমজাদের পথ হারাবার কোন সম্ভাবনা ছিল না।
.png)
আমজাদের সেই ঘরটির চারদিকের দেয়ালে অনেকগুলো কবুতরের বাসা ছিল। জালালী কবুতর। এই কবুতরগুলোকে প্রথম এনেছিলেন ও প্রতিপালন করেছিলেন তার চাচা। তিনি চলে যাবার পর কবুতরগুলোও চলে গিয়েছিল। সম্ভবত তাদেরকে দেখাশুনা করার কেউ ছিল না বলে। কিন্তু আমজাদ সেই ঘরে বসবাস শুরু করার পর কবুতরগুলো পুনরায় ফিরে এসেছিল। তারপর থেকে আমজাদই তাদেরকে দেখাশুনা করত। সকাল বিকাল তাদেরকে খাবার দিত। প্রতিদিন খুব ভোরে এই কবুতরেরা দল বেঁধে উত্তরের গারো পাহাড় অথবা উত্তর পূর্বে সিলেটের হজরত শাহজালালের দরগার দিকে চলে যেত। ফিরে আসত সন্ধ্যায়। আমজাদ মনেপ্রানে বিশ্বাস করত যে, কবুতরগুলোও নীড়ে ফেরার জন্যে তাদের বাড়ির তালগাছটিকে ব্যবহার করতো।

বাড়িটার উঠোনের উত্তর প্রান্ত থেকে থেকে ময়মনসিংহের ও ভারতের আসাম রাজ্যের গারো পাহাড় দেখা যেতো। পুরো শরৎ কালের সময়টাতে। গ্রামের অন্য বাড়িগুলো থেকে যা দৃশ্যমান ছিল না। কারণ অন্যান্য বাড়িগুলো ভর্তি ছিল প্রায়ান্ধকার বাঁশবন দিয়ে। বাড়ির দক্ষিণ দিক জুড়ে ছিলো বিশাল প্রান্তর। দিগন্ত বিস্তৃত ধু-ধু প্রান্তর। রঙ কখনও সবুজ, কখনও রুপালী, কখনও ধূসর, কখনও হলুদ বা সোনালী। ঋতুতে ঋতুতে সততই পরিবর্তিত হতো এর রুপ। তালগাছের চূড়া থেকে কাঁসার থালার মত গোল দেখতে ছিলো সেই প্রান্তর। নীলাকাশ এসে মিশত দূরের গ্রামটার পেছনে। বৃত্তাকারে ঘুরে যাওয়া গ্রামটাকে তখন মনে হতো প্রান্তররূপী এক অপরুপ বাগানের চারিধারের হেজলাইন। বর্ষার কিছুদিন পূর্বে পাটগাছে ছেয়ে যেত প্রান্তর। ধুসর সবুজের ঢেউয়ে সারা দিনমান কাঁপত। পাটক্ষেতের ভেতর দিয়ে পায়ে চলা মেঠো পথ ছিল। এই পথ দিয়ে কাইজ্জার চরে যাওয়া যেত। সন্ধ্যার আগেই পাটক্ষেতের ভেতরে অন্ধকার নিবিড় হয়ে আসতো। চারদিক থেকে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকতে থাকত। আমজাদের মনে হত পাটক্ষেতের ভেতর থেকে কেউ একজন তাকে অনুসরণ করছে সর্বক্ষণ। নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে। আমজাদের সমস্ত চলাচল ছিল তার নখদর্পণে। তার অশরীরী অস্তিত্ব আমজাদ অনুভব করত। সন্ধার পর প্রবল দমকা বাতাস বয়ে যেত। খরকাবিল থেকে আমজাদদের বাড়ির উপর দিয়ে প্রান্তরের দিকে। পাট ক্ষেতের ভেতরে মট মট করে শব্দ হত। আমজাদ ভয়ে বিহ্বল হয়ে যেত। ভোরে তালগাছের মাথায় বাবুই পাখিদের কলকাকলি তার ভেতরের ভয়কে দূর করে দিত।
বর্ষায় বাড়ির উত্তরপাশের খরকা বিল মনোরম দৃশ্য ধারণ করত। ভরে যেত বানের জলে। বাড়ীটাকেও সেই সময়ে মনে হতো অপার্থিব। জলের ওপরে ভেসে থাকা কোন দ্বীপ। যমুনা বা সাগরের ভেতরে। চারিদিকে জল থৈ থৈ করত। বানের ঘোলা জলে মাথা জাগিয়ে থাকত শুধুমাত্র আমন ধানের মাথা। দূর থেকে মনে হতো ধূসর সবুজ রঙের ঢেউ। কোনদিন বিল জুড়ে শুরু হতো নৌকা বাইচের প্রতিযোগিতা। ৬০ থেকে ১৫০ ফুট লম্বা বাইচের নৌকাগুলো যখন একসাথে বৈঠা মেরে বিলের ওপার থেকে এপারের দিকে এগিয়ে আসতো, তখন নৌকার গায়েনদের গানের তালে তালে নাচতে থাকত মানুষগুলোর মন। তাত্তাপাড়া, গাবেরগ্রাম, খিলকাটি, চাঁদপুর - সবগুলো গ্রাম। শরতের প্রারম্ভে অথবা বর্ষার শেষের দিকে বানের জল সরে যেত। খরকা বিলের তখন স্বচ্ছ রূপ। শাপলা ফুলে ভরে থাকত খরকা বিলের চারপাশ। জল পুরোপুরি নেমে যাবার পর লাঙলের ফলার আঘাতে উপড়ে ফেলা হত বিলপাড়ের নরম মাটিকে। মৃত শামুক, ঝিনুক আর শালুক কুড়ানোর আনন্দে বের হয়ে যেত গ্রামের শিশু-কিশোর–কিশোরীরা। নতুন ফসলের বীজ রোপিত হত পূনর্বার। নতুন ফসলে ছেয়ে যেত নতুন সৃষ্ট প্রান্তর। হেমন্ত ঋতুতে পাকা ধানের রঙে সোনালী বর্ণ ধারণ করত প্রান্তর। শুরু হত ধান কাটার উৎসব। নবান্নের আনন্দে মেতে উঠত পুরো জনপদ। প্রান্তর ও বিলের সারা গায়ে তখন লেগে থাকত সোঁদা গন্ধ।
ক্লাস সেভেনে চন্দনবাইশায় চলে এসেছিল আমজাদ। এরপর থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে সুখনগরীতে আর বসবাস করা হয়নি তার। বছরে তিন চার বার বাড়িতে আসত। কয়েকদিন থেকেই আবার ফিরে যেত। প্রতিবারেই স্টিমারে বা নৌকায় করে চন্দন বাইশায় যাবার পথে নৌকায় করে খরকাবিল অতিক্রম করার সময়ে সে দেখতে পেত দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে তার বাড়ি ও গ্রাম। হৃদয় আকুল হত তার। তবে দৃষ্টির বাইরে চলে গেলেও আমজাদের অন্তর থেকে কখনই তা মিলিয়ে যেত না। অতীতের খণ্ডাংশ বা সংযোগহীন কোন চিহ্ন হিসেবে সারাক্ষণ মনের ভেতরে বিরাজ করত। একধরনের মায়াবী অভিজ্ঞতা ও গভীর অনুভূতি হিসেবে।
‘হাতের মুঠোয় ছিল একটা মস্তবড় নদী
নদীর মধ্যে ছিল আমার বাল্যকালের ভয়
ভয়ের পাশে সরলতার বাগান আর প্রাসাদ
হারিয়ে গেল,
সমস্তই হারিয়ে গেল!
নদীও নেই, ভয়ও নেই, কোথায় সেই
কাননঘেরা বাড়ি।’ - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়