Alexa সূরা বাকারা: ২২৮-২৩৬ নম্বর আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট ও ঘটনা (পর্ব-১০)

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২১ জানুয়ারি ২০২০,   মাঘ ৭ ১৪২৬,   ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

সূরা বাকারা: ২২৮-২৩৬ নম্বর আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট ও ঘটনা (পর্ব-১০)

মাওলানা ওমর ফারুক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:২৫ ১৩ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৭:২৮ ১৩ জানুয়ারি ২০২০

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

আমরা এখানে সূরা বাকারার ২২৮-২৩৬ নম্বর আয়াতসমূহের উল্লখযোগ্য শানেনুযুল (আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট) তুলে ধরছি-

আরো পড়ুন>>> সূরা বাকারা: ২১৫-২২৪ নম্বর আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট ও ঘটনা (পর্ব- ৯)

وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلاَثَةَ قُرُوَءٍ وَلاَ يَحِلُّ لَهُنَّ أَن يَكْتُمْنَ مَا خَلَقَ اللهُ فِي أَرْحَامِهِنَّ
অর্থ : আর তালাক প্রাপ্তা নারী নিজেকে অপেক্ষায় রাখবে তিন হায়েজ পর্যন্ত। আর যদি সে আল্লাহর প্রতি এবং আখেরাত দিবসের ওপর ঈমানদার হয়ে থাকে তাহলে যা তার জরায়ুতে সৃষ্টি করেছেন তা লুকিয়ে রাখা জায়েজ নয়। আর যদি সদ্ভাব বজায় রেখে চলতে চায় তাহলে তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার তাদের স্বামীরা সংরক্ষণ করে। আর পুরুষদের তেমন স্ত্রীদের ওপর অধিকার রয়েছে তেমনিভাবে স্ত্রীদেরও অধিকার রয়েছে পুরুষদের ওপর। আর আল্লাহ হচ্ছেন পরাক্রমশালী, বিজ্ঞ। (আয়াত-২২৮)।

শানে নুযুল : হজরত আসমা বিনতে ইয়াযিদ (রা.) বলেন, যখন রাসূল (সা.) এর যুগে আমি তালাকপ্রাপ্তা হলাম তখন তালাকপ্রাপ্তা নারীদের কোনো ইদ্দত ছিল না। এ প্রসঙ্গে উক্ত আয়াত নাজিল হয় (মুখতাসার ইবনে কাসীর : ২০২)।

الطَّلاَقُ مَرَّتَانِ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ وَلاَ يَحِلُّ لَكُمْ أَن تَأْخُذُواْ مِمَّا آتَيْتُمُوهُنَّ شَيْئًا
অর্থ : তালাকে-‘রাজঈ’ হলো দু’বার পর্যন্ত তারপর হয় নিয়মানুযায়ী রাখবে, না হয় সহৃদয়তার সঙ্গে বর্জন করবে। আর নিজের দেয়া সম্পদ থেকে কিছু ফিরিয়ে নেয়া তোমাদের জন্য জায়েজ নয় তাদের কাছ থেকে। কিন্তু যে ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই এ ব্যাপারে ভয় করে যে, তারা আল্লাহর নির্দেশ বজায় রাখতে পারবে না, অতঃপর যদি তোমাদের ভয় হয় যে, তারা উভয়েই আল্লাহর নির্দেশ বজায় রাখতে পারবে না, তাহলে সে ক্ষেত্রে স্ত্রী যদি বিনিময় দিয়ে অব্যাহতি নিয়ে নেয়, তবে উভয়েরই মধ্যে কারো কোন পাপ নেই। এই হলো আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা। কাজেই একে অতিক্রম করো না।
বস্তুত যারা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করবে, তারাই হলো জালেম। (আয়াত-২২৯)।

শানে নুযুল : ইসলামের প্রথম যুগে লোকেরা স্ত্রীদেরকে অসংখ্যবার তালাক দিত। এবং নারীদেরকে কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যে ইদ্দতের ভেতরে তাকে পুনরায় গ্রহণ করে নিত। একবার ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বলল, আমি তোমাকে তালাকও দেব না যে আমার থেকে বিচ্ছেদ হয়ে যাবে। আর কোনো দিন তোমার পাশেও আসব না। স্ত্রী জিজ্ঞাসা করল কীভাবে? স্বামী বলল, তোমাকে তালাক দিয়ে দেব যখনই ইদ্দত শেষ হয়ে যাবে ফিরিয়ে নেব। নারী গিয়ে রাসূল (সা.) এর দরবারে অভিযোগ করল তখন এ আয়াত নাজিল হলো।

হজরত ইবনে জুরাইয (রা.) বলেন, আলোচ্য আয়াত ছাবেত বিন কায়েস ও হাবিবা সম্পর্কে নাজিল হয়েছে। হাবিবা তার স্বামীর ব্যাপারে রাসূল (সা.) এর দরবারে অভিযোগ করলেন। তিনি ইরশাদ করলেন, তাহলে তুমি কি তোমার স্বামীর কাছ থেকে (মহর রূপে) নেয়া বাগানটি ফিরিয়ে দেবে? তিনি সম্মতি জানালেন, তখন নবী করিম (সা.) স্বামীকে ডেকে এ প্রস্তাব শুনালেন। স্বামী আরজ করলেন, সেটি কি আমার জন্য হালাল হবে? ইরশাদ করলেন, হ্যাঁ। স্বামী আরজ করলেন, তাহলে আমি তাই করে নিলাম। তখন এ আয়াত নাজিল হলো। (লুবাব, ইবনে জারীর)।

فَإِن طَلَّقَهَا فَلاَ تَحِلُّ لَهُ مِن بَعْدُ حَتَّىَ تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ
অর্থ : তার পর যদি সে স্ত্রীকে (তৃতীয়বার) তালাক দিয়ে দেয়, তবে সে স্ত্রী যে পর্যন্ত তাকে ছাড়া অপর কোনো স্বামীর সঙ্গে বিয়ে করে না নেবে, তার জন্য হালাল নয়। (আয়াত-২৩০)।

শানে নুযুল : ইমরাতে রেফায়া অর্থাৎ আযশা বিনতে আবদির রহমান এর প্রথম বিবাহ হয় তারই চাচতো ভাই রিফায়া বিন ওহাব বিন উতাইকের সঙ্গে। পরে  সে তাকে তালাক দিয়ে দেয় অতঃপর আব্দুর রহমান বিন সুবাইর কুরাবীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়, দ্বিতীয় স্বামীও তাকে তালাক দিয়ে দেয়। তখন তিনি রাসূলে করিম (সা.) এর খেদমতে এসে আরজ করেন ইয়া রাসূলুল্লাহ! আব্দুর রহমান আমাকে মিলনের পূর্বেই তালাক দিয়ে দিয়েছে এখন কি আমি পূর্বের স্বামী রেফায়ার কাছে বিবাহ বসতে পারব? হুজুর (সা.) বললেন যতক্ষণ না আব্দুর রহমান এর সঙ্গে তোমার মিলন হবে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যেতে পারবে না। এ প্রসঙ্গে উক্ত আয়াতটি নাজিল হয়। (বায়জাবী-১:১৫৫, মুখতাছার ইবনে কাছির-১:২০৮)।

وَإِذَا طَلَّقْتُمُ النَّسَاءَ فَبَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَأَمْسِكُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ أَوْ سَرِّحُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ
অর্থ : আর যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দাও, অতঃপর তারা নির্ধারিত ইদ্দত সমাপ্ত করে নেয়, তখন তোমরা নিয়ম অনুযায়ী তাদেরকে রেখে দাও, অথবা সহানুভূতির সঙ্গে তাদেরকে মুক্ত করে দাও। আর তোমরা তাদেরকে জালাতন ও বাড়াবাড়ি করার উদ্দেশ্যে আটকে রেখো না। আর যারা এমন করবে নিশ্চয়ই তারা নিজেদেরই ক্ষতি করবে। (আয়াত-২৩১)।

শানে নুযুল : ছাবেত বিন ইয়াসার নামক জনৈক আনছারী সাহাবি তার স্ত্রীকে এক তালাক দিয়ে দিলেন। অতঃপর ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার তিন দিন পূর্বে তাকে ফিরিয়ে নিলেন। অতঃপর তাকে পুনরায় দ্বিতীয় তালাক দিয়ে দিলেন এবং ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পূর্বে আরো এক তালাক দিয়ে দিলেন। যদ্দরুন বিবির প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল এভাবে তালাক দিয়ে তাকে কষ্ট দেয়াই ছিল উদ্দেশ্য ছিল এ প্রসঙ্গে উক্ত আয়াত নাজিল হয়।

وَلاَ تَتَّخِذُوَاْ آيَاتِ اللهِ هُزُوًا
অর্থ : আর আল্লাহর নির্দেশকে হাস্যকর বিষয়ে পরিণত করো না। (আয়াত-২৩১)।

শানে নুযুল : হজরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত। জাহেলিয়াতের যুগে কোনো কোনো লোক স্ত্রীকে তালাক দিয়ে অথবা বাদীকে মুক্ত করে দিয়ে পরে বলতো যে, আমি তো উপহাস করেছি মাত্র, তালাক দিয়ে দেয়া বা মুক্তি দিয়ে দেয়া কোনো উদ্দেশ্যই আমার ছিল না। তখন উক্ত আয়াত নাজিল হয়। এতে ফয়সালা দেয়া হয়েছে যে, বিয়ে বা তালাককে যদি কেউ তামাশা হিসাবেও সম্পাদন করে তবুও তা কার্যকরী হয়ে যাবে। এতে নিয়তের কথা গ্রহণযোগ্য হবে না। (মুখতাছার ইবনে কাছির-১:২১০, মাআরেফুল কোরআন-১২৮)।

وَإِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَبَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَلاَ تَعْضُلُوهُنَّ أَن يَنكِحْنَ
অর্থ : আর যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দাও তারপর তারাও নির্ধারিত ইদ্দত পূর্ণ করে নেয়, তাদেরকে পূর্ব স্বামীদের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বিয়ে করতে বাধা দান করো না। এ উপদেশ তাকেই দেয়া হয়েছে যে আল্লাহ ও কেয়ামত দিনের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে। এর মধ্যে তোমাদের জন্যে রয়েছে একান্ত পরিশুদ্ধতা ও অনেক পবিত্রতা। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না। (আয়াত-২৩২)।

শানে নুযুল : হজরত মাকাল ইবনে ইয়াসার (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি তার ভগ্নিকে জনৈক মুসলমান ব্যক্তির কাছে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর যুগে বিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি তার কাছে যতদিন জীবন যাপন করার করলেন। পরে তার স্বামী তাকে এক তালাক দেয়। ইদ্দত শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি তাকে ফিরিয়ে নেননি। কিন্তু এরপর স্বামীও তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন আর তার স্ত্রীও স্বামীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। তাই অন্যান্য প্রস্তাবকারীদের মধ্যেও তাকে আবার বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। তখন ভাই মাকাল (রা.) তাকে বলল হে ইতর! এই নারীর মাধ্যমে তোমাকে আমি সম্মান দিয়েছিলাম তাকে তোমার কাছে বিয়ে দিলাম কিন্তু তুমি তাকে তালাক দিয়ে দিলে। আল্লাহ কসম! তুমি আর কখনো তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে নিতে পারবে না। তোমার সঙ্গে সম্পর্ক শেষ। রাবী বলেন, আল্লাহ তায়ালা জানতেন এই স্ত্রীর প্রতি তার স্বামীর টানের কথা এবং এই স্বামীর প্রতি ওই নারীর টানের কথা। তখন আল্লাহ পাক উক্ত আয়াত নাজিল করেন।

মাকাল এ আয়াত শোনার পর বললেন, আমার পরওয়ারদিগারের আদেশ শুনেছি এবং তা শিরোধার্য করে নিচ্ছি এর পর তিনি উক্ত ভগ্নিপতিকে ডেকে আনলেন এবং বললেন, তোমরা কাছে আমি আমার বোনকে পুনরায় বিয়ে দিচ্ছি আর আমি তোমার সম্মান করছি।    (তিরমিযি-২:১১, মুখতাছার-১:২)।

لاَ جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِنَّ طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ مَا لَمْ تَمَسُّوْهُنُّ أَوْ تَفْرِضُوْا لَهُنَّ فَرِيْضَةً وَمَتِّعُوهُنَّ عَلَى الْمُوسِعِ قَدَرُهُ وَعَلَى الْمُقْتِرِ قَدْرُهُ مَتَاعًا بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُحْسِنِينَ.
অর্থ : যে পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের স্ত্রীকে স্পর্শ করেছো এবং তাদের জন্য মোহর ধার্য করেছো তাদেরকে তালাক দিলে তোমাদের কোনো পাপ নেই। আর (এমন পরিস্থিতে) তোমরা তাদের সংস্থানের ব্যবস্থা করবে। স্বচ্ছল তার সাধ্যমত এবং অস্বচ্ছল তার সামর্থ্য অনুযায়ী বিধিমত খরচপত্রের ব্যবস্থা করবে। যা নেককার লোকদের অবশ্যই কর্তব্য। (আয়াত-২৩৬)।

শানে নুযূল : যখন পূর্বের আয়াতে তালাকপ্রাপ্তা নারীদের প্রতি সাধ্য অনুযায়ী ও সামর্থ্য অনুযায়ী ইহসান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তখন জনৈক ব্যক্তি বলে উঠল তালাকপ্রাপ্ত নারীর প্রতি ইহসান করা মোস্তাহাব। অতএব না করলে তাতে কোনো গুনাহ হবে না। এ প্রসঙ্গে উক্ত আয়াত নাজিল হয়।

مَتَاعًا بِالْمَعْرُوفِ
অর্থ : আর তালাক প্রাপ্তা  নারীদের জন্য প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী খরচ দেয়া আবশ্যক পরহেজগারদের ওপর। (আয়াত-২৩৬)।

শানে নুযুল : যখন পূর্বের আয়াতে তালাক প্রাপ্তা নারীদের প্রতি সাধ্য অনুযায়ী ও সামর্থ অনুযায়ী ইহসান করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তখন জনৈক ব্যক্তি বলে উঠলো তালাক প্রাপ্তা নারীর প্রতি ইহসান করা মুস্তাহাব। অতএব, না করলে তাতে কোনো গোনাহ হবে না এ প্রসঙ্গে উক্ত আয়াত নাজিল হয়। চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে