ঢাকা,  মঙ্গলবার   ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ধর্ম ]

আসর থেকে মাগরিব: দোয়া, জিকির ও আত্মশুদ্ধির বিশেষ সময়

মো. মামুন কবীর মো. মামুন কবীর
প্রকাশিত: ১৫:৪৬, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আসর থেকে মাগরিব: দোয়া, জিকির ও আত্মশুদ্ধির বিশেষ সময়
আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত, বিশেষ করে জুমার দিনে সূর্যাস্তের আগের সময়টি দোয়া, জিকির, তওবা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে কাটানো যেতে পারে। ছবি: প্রতীকী

দিনের কর্মব্যস্ততা যখন শেষের দিকে, তখন অনেকের কাছে আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়টি অন্য সময়ের মতোই সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু একজন মুমিনের জন্য এ সময়টি হতে পারে আত্মশুদ্ধি, তওবা, জিকির ও দোয়ার এক মূল্যবান সুযোগ। বিশেষ করে জুমার দিনে আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়কে দোয়া কবুলের বিশেষ সময় হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে হাদিসে। তাই এ সময়কে অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় না করে আল্লাহর স্মরণ ও দোয়ায় কাটানো কল্যাণকর।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে তার কাছে দোয়া করার আহ্বান জানিয়েছেন। সূরা আল-বাকারার ১৮৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আমি তো নিকটেই। আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দিই, যখন সে আমাকে আহ্বান করে।’ এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, বান্দা যখন আন্তরিকভাবে আল্লাহকে ডাকে, তখন আল্লাহ তার আহ্বান সম্পর্কে অবগত থাকেন এবং তার জন্য কল্যাণের ব্যবস্থা করেন।

দোয়ার জন্য বিশেষ সময়

Advertisement

দোয়া মুমিনের অন্যতম শক্তিশালী ইবাদত। মানুষ যখন নিজের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করে আল্লাহর কাছে হাত তোলে, তখন সে তার রবের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করে। সুখ-দুঃখ, বিপদ-আপদ, অভাব-অনটন কিংবা ভবিষ্যতের প্রত্যাশা সবকিছুই আল্লাহর কাছে তুলে ধরা যায়।

জুমার দিনের বিশেষ সময় সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম নামাজরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন। এ বিষয়ে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা ও সাহাবিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে অনেক আলেম জুমার দিনের শেষ সময়কে বিশেষ করে আসরের পর সূর্যাস্তের আগের সময়কে দোয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। ফলে জুমার দিনে আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়টিকে ইবাদত ও দোয়ায় কাজে লাগানো মুমিনের জন্য একটি সুন্দর আমল হতে পারে।

আসরের পর কী কী আমল করা যায়

আসর নামাজ আদায়ের পর একজন মুসলিম প্রথমে নামাজ-পরবর্তী মাসনুন জিকির ও দোয়া করতে পারেন। এরপর নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কোরআন তিলাওয়াত, ইস্তিগফার, দরুদ ও বিভিন্ন জিকিরে সময় কাটানো যায়।

ইস্তিগফার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল। বলা যায়-

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ

উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহ।
অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

ইস্তিগফারের মাধ্যমে বান্দা নিজের ভুল ও গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়। পবিত্র কোরআনে নুহ (আ.) তার সম্প্রদায়কে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সূরা নুহে ইস্তিগফারের বিভিন্ন কল্যাণের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

বেশি বেশি দরুদ পড়ুন

জুমার দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। তাই আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়ের একটি অংশ দরুদ পাঠে ব্যয় করা যেতে পারে।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর প্রতি সালাত পাঠান। হে মুমিনগণ, তোমরাও তার প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করো।’ (সূরা আল-আহজাব, ৫৬)

দরুদ পাঠ শুধু মুখের উচ্চারণ নয়; এর মাধ্যমে একজন মুসলিম রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রকাশ করেন।

কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির

আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময় কোরআন তিলাওয়াতের জন্যও ব্যবহার করা যায়। অল্প সময় হলেও কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করা, অর্থ বোঝার চেষ্টা করা এবং নিজের জীবনে তার শিক্ষা প্রয়োগের সংকল্প করা উপকারী।

আল্লাহ বলেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ (সূরা আর-রাদ, ২৮)

তাই মানসিক অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা ও নানা ব্যস্ততার মধ্যেও জিকির মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ করে দেয়।

নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও দোয়া

দোয়ার সময় শুধু নিজের প্রয়োজনের কথা না বলে বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং পুরো মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা উচিত। অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থতা, বিপদগ্রস্ত মানুষের মুক্তি, অভাবীদের রিজিক এবং মৃতদের জন্য মাগফিরাত কামনা করা যায়।

অন্যের অনুপস্থিতিতে তার জন্য দোয়া করলে ফেরেশতা তার জন্য অনুরূপ কল্যাণের দোয়া করেন এ মর্মে সহিহ মুসলিমে হাদিস রয়েছে।

তওবা ও আত্মশুদ্ধির সময়

আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময় নিজের জীবন নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবারও সুযোগ। সারাদিনে কোনো ভুল হয়েছে কি না, কারও সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে কি না, কারও হক নষ্ট হয়েছে কি না এসব নিয়ে আত্মসমালোচনা করা যেতে পারে।

শুধু মুখে ইস্তিগফার নয়, গুনাহ থেকে ফিরে আসার দৃঢ় সংকল্পই হলো তওবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারও অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা সম্ভব হলে ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগও নিতে হবে।

দোয়া কবুল না হওয়ার ব্যাপারে হতাশ হওয়া যাবে না

অনেক সময় মানুষ দোয়া করে দ্রুত ফল না পেলে হতাশ হয়ে যায়। কিন্তু ইসলামে দোয়ার ক্ষেত্রে এমন অধৈর্য হওয়া নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বান্দার দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ সে তাড়াহুড়া করে এ কথা না বলে যে, ‘আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হয়নি।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

তাই দোয়া করে ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। কারণ মানুষ যা চায়, তা সবসময় তার জন্য কল্যাণকর নাও হতে পারে। আল্লাহই জানেন কোনটি বান্দার জন্য উত্তম।

দোয়ার সঙ্গে আমলও জরুরি

শুধু দোয়া করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বৈধ উপায়ে প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করতে হবে। রিজিকের জন্য দোয়ার পাশাপাশি হালাল পথে কাজ করতে হবে। অসুস্থতার সময় সুস্থতার জন্য দোয়ার পাশাপাশি চিকিৎসা নিতে হবে। বিপদ থেকে মুক্তির জন্য দোয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সতর্কতাও অবলম্বন করতে হবে।

ইসলাম মানুষকে দোয়া ও প্রচেষ্টা দুটির সমন্বয় শেখায়।

সূর্যাস্তের আগে বিশেষ মনোযোগ

বিশেষ করে জুমার দিনে আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়কে অবহেলা না করে সুযোগ অনুযায়ী ইবাদতে কাটানো যেতে পারে। মোবাইল ফোন, অপ্রয়োজনীয় আড্ডা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় না দিয়ে কিছু সময় নিরিবিলি বসে আল্লাহর কাছে নিজের কথা বলা যেতে পারে।

মাগরিবের সময় ঘনিয়ে এলে নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য দীর্ঘ দোয়া করা যায়। দোয়ার ভাষা আরবি হতেই হবে এমন নয়; আল্লাহ বান্দার অন্তরের ভাষা ও অবস্থা জানেন। তবে মাসনুন দোয়াগুলো শেখা ও পড়া উত্তম।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত প্রতিদিনের পুরো সময়কে নিশ্চিতভাবে দোয়া কবুলের নির্দিষ্ট সময় বলা ঠিক নয়। তবে জুমার দিনের আসরের পর সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়কে দোয়ার বিশেষ সময় হিসেবে গ্রহণ করার পক্ষে হাদিসের দলিল ও আলেমদের ব্যাখ্যা রয়েছে। তাই এ সময়কে ইবাদত, জিকির, তওবা ও দোয়ায় কাজে লাগানো একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত সুন্দর অভ্যাস হতে পারে।

দিনের শেষ প্রহরে কয়েক মিনিটের আন্তরিক দোয়া হয়তো মানুষের জীবনে তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তন চোখে দেখাবে না। কিন্তু একজন মুমিনের বিশ্বাস হলোআল্লাহর কাছে করা কোনো আন্তরিক দোয়াই বৃথা যায় না। কখনো চাওয়া জিনিস দেওয়া হয়, কখনো বিপদ দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়, আবার কখনো তার প্রতিদান আখিরাতের জন্য সংরক্ষিত থাকে। তাই আসর থেকে মাগরিববিশেষ করে জুমার দিনে আল্লাহর দরবারে ফিরে আসার এই সুযোগটি কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!