আখের গোছানো হলেই বিএনপিকে বড় ধাক্কা দেবে জামায়াত
দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্ক কখনো জোট, কখনো আবার পারস্পরিক স্বার্থের সমীকরণে আবর্তিত হয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সমীকরণে এখন যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। সাম্প্রতিক নির্বাচনী রাজনীতিতে স্পষ্ট হয়েছে দুই দলের পৃথক সাংগঠনিক শক্তি, ভোটের হিসাব এবং ক্ষমতার অংশীদারিত্বের প্রশ্ন। বর্তমানে ৮ দফা দাবিতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। তবে সাংগঠনিক শক্তি আরও সুসংহত ও আসন প্রাপ্তিতে সম্ভাব্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের আগে জামায়াতে ইসলামী সরকার পতনের মতো জোরালো আন্দোলনে যাবে না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, জাতীয় রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী বড় ধরনের আসনভিত্তিক শক্তি অর্জন করতে পারলে বিএনপির সঙ্গে দলটির সম্পর্কের ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার সম্ভাবনা তৈরি হলেই বিএনপিকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করতে বা দলটির ওপর বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে জামায়াত।
.png)
বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘ। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে চারদলীয় জোটের অংশ হিসেবে জামায়াত সংসদে ১৭টি আসন পেয়েছিল। এর আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দলটির সর্বোচ্চ আসন ছিল ১৮টি। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও তাদের শরিকরা মোট ২১২টি আসন পায়। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট জয়লাভ করে ৭৭টি আসনে। এর মধ্যে বিএনপি এককভাবে পায় ২০৯টি, আর জামায়াতে ইসলামী পায় ৬৮টি। অর্থাৎ নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে আসনসংখ্যার ব্যবধান যথেষ্ট বড় হলেও জামায়াতের উল্লেখযোগ্য উত্থান দেখা গেছে।
এদিকে বিএনপি সরকার গঠনের পর গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সার সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে দেশ পরিচালনায় চরম চাপের মুখে রয়েছে। এরই মধ্যে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, তেল-গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ, দুর্নীতি, দখলবাজি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে লংমার্চসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোট। আগামী দিনে সংসদীয় আসনগুলোতে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে জামায়াত তাদের ৮ দফা দাবিকে প্রয়োজনে এক দফায় রূপান্তরের হুঁশিয়ারিও দিচ্ছে।
গতকাল শনিবার ঢাকা থেকে রংপুর লংমার্চ কর্মসূচির প্রাক্কালে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে আয়োজিত লংমার্চ-পূর্ব সমাবেশে বক্তব্য দেন জামায়াত আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ১১ দলের দাবিগুলো মেনে নেওয়া না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। ‘দফা মনে রাখবেন, এটা নয় দফাও হইতে পারে, আবার জাতির প্রয়োজনে যেকোনো সময় এটা এক দফায় পরিণত হবে। এক দফায় যখন পরিণত হবে, তখন কিন্তু পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হবে।
এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে—জামায়াত কি দীর্ঘমেয়াদে বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার পথেই থাকবে, নাকি সাংগঠনিক ও নির্বাচনী শক্তি আরও বাড়াতে পারলে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জোরালো আন্দোলনে নামবে?
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দলে থেকে বিএনপির সঙ্গে কুসুম-কুসুম একটা সম্পর্ক রাখছে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে কৌশলে বিএনপিকে পচতে দেওয়া। জামায়াত মনে করছে, আওয়ামী লীগকে যদি খেলার মাঠের বাইরে রাখা যায়, বিএনপি নিজেকেই নিজে পচানোর জন্য যথেষ্ট। তাদের বহিঃশত্রুর প্রয়োজন নেই। নিজেদের কর্মকাণ্ডে বিএনপি যতদূর জনপ্রিয়তা হারাবে, জামায়াতের ভোট স্বয়ংক্রিয়ভাবে তত বাড়বে।
তিনি আরো বলেন, জামায়াতে ইসলামী সবসময় সাংগঠনিকভাবে তাদের মাঠপর্যায়ের জরিপ পরিচালনা করে থাকে। সুতরাং ভোটের হিসাব তাদের কাছে আছে। বর্তমানে জাতীয় সংসদে জামায়াত জোটের ৭৭টি আসন রয়েছে। নির্দিষ্ট একটা সময়ের পর যখন জামায়াত দেখবে তাদের ভোট দেড়শ আসন বা তার বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই বিএনপিকে জোরে ধাক্কাটা দেবে। সেটা এক বছর পরেও হতে পারে বা একটু বেশি সময়ও লাগতে পারে।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী আকবর বলেন, আগামী দিনে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ককে শুধু পুরোনো জোটের চশমায় দেখলে পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। দুই দলের নিজস্ব ভোটব্যাংক, সাংগঠনিক বিস্তার, নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত এবং সংসদীয় শক্তির ওপর ভিত্তি করে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, জামায়াতের বর্তমান কৌশল অনেকটাই নিজেদের ‘আখের গোছানো’র দিকে। অর্থাৎ দলটি আগে সংসদীয় শক্তি, সাংগঠনিক বিস্তার এবং নির্বাচনী ভিত্তি সুসংহত করতে চাইছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সম্ভাবনা তৈরি হলেই বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের ধরনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
এ দিকে রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী মনে করেন, জামায়াতে ইসলামী সুকৌশলে রাজনীতির মাঠ দখল করে নিচ্ছে। এমনকি জামায়াতের লোকজন বিএনপির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে আছে, যা বিএনপি চিহ্নিতই করতে পারছে না। তিনি বলেন, বিএনপি কল্পনাও করতে পারবে না তাদের ভেতরে কত জামায়াতের লোকজন আছে। বিএনপি যখন সত্যিকারের সংকটে পড়বে, তখন তাসের ঘরের মতো পড়ে যাবে। দেখবে, তার শক্তিশালী জায়গাগুলো ইতোমধ্যে জামায়াতের কব্জায়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে হয় বিএনটিকে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, অন্যথায় জামায়াতের দাসত্ব মেনে নিতে হবে। এর বাইরে বিএনপির জন্য আর কোনো রাস্তা দেখছি না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা জানান, অতীতে বিরোধী দলগুলো সাধারণত সংসদ বর্জন কিংবা বিচ্ছিন্ন হরতালে সীমাবদ্ধ থাকলেও তারা এবার ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদে জোরালো বিতর্ক, ওয়াকআউট এবং রাজপথে মিছিল, জনসভা ও লংমার্চের মতো কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, নির্দিষ্ট কিছু দাবির প্রেক্ষিতেই এসব কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। কার্যত বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক খুবই ভালো। এই মুহূর্তে সরকার পতনের আন্দোলনের কোনো চিন্তাভাবনা নেই। আমরা রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের শক্তিশালী হিসেবে তৈরি করছি। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার সম্ভাবনা তৈরি হলেই সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে কঠোর অবস্থানে যাবে জামায়াত।