ঢাকা,  রোববার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ মতামত ]

অপ্রতিমরা নিহত হওয়ার পরও আমরা কি কিছু শিখবো!

দীপু মাহমুদ
প্রকাশিত: ১৮:০২, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অপ্রতিমরা নিহত হওয়ার পরও আমরা কি কিছু শিখবো!
অপ্রতীমের জন্য ন্যায়বিচার মানে শুধু তার হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা নয়। ন্যায়বিচার মানে সেই পুরো পথটিও দেখা- যে পথে একজন ১৩ বছরের কিশোর নিরাপদে বাড়ি ফেরার বদলে লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে মৃত অবস্থায় পৌঁছাল।

অপ্রতিমের মায়ের কপালে বড় টিপ ছিল- এটা অপ্রতিমের হত্যার কোনো ব্যাখ্যা নয়। তার হাতে কেন আইফোন ছিল- এটাও নয়। অপ্রতিমের মা জুলাইয়ের সমর্থক ছিলেন কিনা, কিংবা কোনো রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি তার সহানুভূতি আছে কিনা- সেটাও তার ১৩ বছরের সন্তানের নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। 

একজন শিশুর জীবন কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, পোশাক, অলংকার, প্রযুক্তি ব্যবহার কিংবা পারিবারিক অবস্থানের বিনিময়যোগ্য সম্পদ নয়। 

Advertisement

অপ্রতিমের মা যদি জুলাইয়ের পক্ষে থাকেন, তবু অপ্রতিমের বেঁচে থাকার অধিকার ছিল, তিনি জুলাইয়ের বিপক্ষে থাকলেও একই অধিকার ছিল। এই কথাটি এত সরল যে, এটা নিয়ে বিতর্ক হওয়ারই কথা নয়। 

অথচ অপ্রতিমের মৃত্যুর পর আলোচনার একটি অংশ খুব দ্রুত সরে যাচ্ছে হত্যাকারীর কাছ থেকে ভিকটিমের পরিবারের দিকে। কেন একজন ১৩ বছরের কিশোরের হাতে আইফোন ছিল, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করত, তার ওপর পরিবারের কতটা নজরদারি ছিল, একজন কিশোরকে কীভাবে ‘গ্রুম’ করা উচিত ছিল- এসব প্রশ্ন অবশ্যই করা যায়। বরং শিশুর নিরাপত্তার জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু এগুলো হত্যার কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে না, হত্যাকে বৈধতা দিতে পারে না। 

এই পার্থক্যটি না বুঝলে সমাজ অপরাধ বিশ্লেষণ থেকে ধীরে ধীরে ভিকটিম-ব্লেমিংয়ের দিকে চলে যায়। 

সমাজমনোবিজ্ঞানে এর পরিচিত ব্যাখ্যা আছে- Just-World Hypothesis। মানুষ অনেক সময় পৃথিবীকে ন্যায্য ও নিয়ন্ত্রিত বলে ভাবতে স্বস্তি বোধ করে। ফলে নিরপরাধ কারও ওপর ভয়াবহ কিছু ঘটলে সেই অস্বস্তিকর সত্য মেনে নেওয়ার বদলে মানুষ খুঁজতে থাকে- ভুক্তভোগী কী এমন করেছিলেন, যার কারণে তার সঙ্গে এমন হলো? গবেষণায় দেখা গেছে, নিরপরাধ ভিকটিমকে দোষারোপ করার প্রবণতার সঙ্গে এই ‘ন্যায্য পৃথিবী’ বিশ্বাসের সম্পর্ক আছে। 

অপ্রতিমের ঘটনায় আইফোন, মায়ের টিপ, পারিবারিক পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনা তাই নিছক সামাজিক কৌতূহল নয়, এটা আরও বড় এক মানসিক সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। 

আমরা যেন নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্কে মিথ্যা নিশ্চয়তা তৈরি করতে চাই- “আমি তো এমন করি না, আমার সন্তান এমন নয়, আমার হাতে আইফোন নেই, অতএব আমার সঙ্গে এমন হওয়ার কথা নয়।” 

এটা বিপজ্জনক আত্মপ্রবঞ্চনা। কারণ অপরাধের দায় অপরাধীর আচরণ থেকে সরিয়ে ভুক্তভোগীর জীবনযাপন বিশ্লেষণে ব্যস্ত হয়ে পড়লে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রশ্নটি আড়ালে চলে যায়। 

অপ্রতিমের ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুলিশ প্রথমে জানিয়েছিল, মায়ের আইফোন নিয়ে বের হওয়ার পর কিশোর নিখোঁজ হয় এবং ফোনের সূত্র ধরে হত্যার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য নিয়ে তদন্ত চলছে। পরে সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে তুহিনকে আটক করা হয় এবং তার জিজ্ঞাসাবাদের সূত্রে আরও দুজনকে আটক করা হয়। 

২০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুলিশি তদন্তের বরাত দিয়ে ওই তিনজনের কাছ থেকে অপ্রতিমের মায়ের আইফোন উদ্ধারের কথাও এসেছে। তবে হত্যার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ও দায় আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলো তদন্তের তথ্য হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। 

আইফোন যদি হত্যার সঙ্গে যুক্ত কোনো বস্তু হয়ও, আইফোন হত্যার কারণ নয়, মানুষের অপরাধী সিদ্ধান্তই অপরাধের বিষয়। ছুরি কাউকে হত্যা করে না- মানুষ ছুরি ব্যবহার করে হত্যা করে। গাড়ি কাউকে চাপা দেওয়ার ‘অপরাধী’ নয়- চালকের আচরণ ও পরিস্থিতি তদন্তের বিষয়। একইভাবে একটি ফোনের মালিকানা একজন শিশুকে হত্যার দায় থেকে মুক্ত করে না, আবার ফোনের মালিক হওয়াও শিশুকে হত্যার জন্য দায়ী করে না। 

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো নাগরিকের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। আর শিশুর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। 

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ১৯ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে শিশুদের সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক সহিংসতা, নির্যাতন, অবহেলা ও শোষণ থেকে রক্ষার জন্য আইনগত, প্রশাসনিক, সামাজিক ও শিক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ, রিপোর্টিং, তদন্ত, চিকিৎসা ও বিচারিক ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত।

অর্থাৎ শিশুর নিরাপত্তা কেবল বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়। পরিবার গুরুত্বপূর্ণ, সমাজ গুরুত্বপূর্ণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ- কিন্তু এসবের ওপরে একটি child protection system থাকা রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ। 

বাংলাদেশের বাস্তবতাতেও এই ব্যবস্থাগত প্রশ্নটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ২০২৬ সালের ২২ মে UNICEF Bangladesh বলেছে, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় প্রতিরোধ, রিপোর্টিং, প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা, child-friendly policing, বিচার এবং সামাজিক সেবাব্যবস্থায় ঘাটতি মোকাবিলা করা জরুরি। একই বিবৃতিতে অপরাধীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতি বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। 

অপরাধী যদি জানে, অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব- তাহলে আইন তার কাছে কী বার্তা পাঠায়? অপরাধবিজ্ঞানের deterrence গবেষণায় ‘শাস্তির নিশ্চয়তা’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পুনরাবৃত্ত অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তির কনফার্মেশন অপরাধ কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে-এমন বিশ্লেষণ গবেষণায় পাওয়া যায়। বিশেষ করে repeat offending-এর ক্ষেত্রে শাস্তির নিশ্চয়তা ও অপরাধীর পূর্ব অপরাধের রেকর্ড গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। 

এই কারণে অপ্রতীমের ঘটনায় যদি তার হত্যার সঙ্গে আটক তুহিনের বিরুদ্ধে আগের মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের বিষয়টি তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তবে সেটা নিছক কোনো পার্শ্বকাহিনি নয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে একজন যুবক দাবি করেছেন, আগের ঘটনায় তিনি মামলা করতে গেলে মামলা না নিয়ে জিডি করা হয়েছিল। তুহিনের বিরুদ্ধে আগের অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি- সুতরাং এই অংশটি তদন্তের দাবি রাখে। 

তবে তদন্তে যদি সত্যিই দেখা যায় যে কোনো ব্যক্তি আগে অপরাধের অভিযোগে আইনের আওতায় এসেও কার্যকর জবাবদিহির মুখোমুখি হয়নি, তাহলে পরবর্তী অপরাধ নিয়ে আমাদের প্রশ্নটি কেবল পরিবারের ওপর থাকা উচিত নয়। প্রশ্ন উঠবে অপরাধের প্রথম সংকেতটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছিল। কারণ প্রথম অপরাধের পর আইন যদি নীরব থাকে, অপরাধীর কাছে সেই নীরবতাও সামাজিক বার্তা হয়ে উঠতে পারে। 

অপ্রতিমের হাতে আইফোন ছিল- এটা ঘটনাটির একটা উপাদান। কিন্তু অপ্রতিমের হত্যাকে বুঝতে হলে আরও বড় ছবিটা দেখতে হবে। একজন কিশোর কীভাবে অপরাধপ্রবণ পরিবেশের সংস্পর্শে এলো। তার আগে কোনো অভিযোগ ছিল কিনা। সেই অভিযোগের প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল। পুলিশ ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কী জানত। নিখোঁজ হওয়ার পর অনুসন্ধান কত দ্রুত শুরু হয়েছিল। নজরদারি ও সিসিটিভি ব্যবস্থার কার্যকারিতা কতটা ছিল এবং শেষ পর্যন্ত তদন্ত থেকে বিচার পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাটি কতটা জবাবদিহিমূলক। 

এই প্রশ্নগুলো বাদ দিয়ে শুধু ‘আইফোন’কে সামনে রাখলে আমরা অপরাধের কাঠামোগত কারণের বদলে অপরাধের দৃশ্যমান বস্তু নিয়ে আলোচনা করব। 

এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশ্নও আসে। ‘আইফোনের জন্য কিশোর খুন’- এই ধরনের শিরোনাম পাঠকের মনে প্রথমেই সরল causal connection তৈরি করে। আইফোন মানে লোভ। আর সেখান থেকে হত্যা। অথচ ‘কিশোর গ্যাংয়ের হাতে কিশোর নিহত’ বা ‘কিশোর নিখোঁজের পর হত্যাকাণ্ড, সন্দেহভাজন আটক’- এই ধরনের framing পাঠকের মনোযোগকে অন্যদিকে নেয়। অপরাধী, সংগঠন, সামাজিক পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা ও তদন্তের দিকে। 

অবশ্য সংবাদশিরোনামকে ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্রের দায় আড়াল করার ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখার আগে প্রমাণ প্রয়োজন। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে framing যে মানুষ কোন দিকটি বেশি দেখতে পাবে, কোন দিকটি কম দেখতে পাবে- সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই অপরাধের সংবাদে ভিকটিমের পোশাক, সম্পদ, পারিবারিক পরিচয় বা জীবনযাপনের বিবরণ যতটা গুরুত্ব পায়, অপরাধীর পূর্ব ইতিহাস, প্রতিষ্ঠানগত ব্যর্থতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা ততটাই গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

‘বাবা-মা আরও সাবধান হলেই অপ্রতীম বাঁচত’- এই বাক্যটি আমাদের সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু এটা পূর্ণাঙ্গ সামাজিক বিশ্লেষণ নয়। কারণ একই যুক্তি কাল অন্য কোনো পরিবারের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হবে- 'রাতে বের হয়েছিল কেন’, ‘এত দামি ফোন ব্যবহার করেছিল কেন’, ‘বন্ধুদের সঙ্গে গিয়েছিল কেন’, ‘মেয়েটি ওই পোশাক পরেছিল কেন’, ‘ছেলেটি ওই এলাকায় গিয়েছিল কেন’। 

এভাবে চলতে থাকলে সমাজ একসময় নিরাপত্তার অধিকারকে শর্তযুক্ত অধিকারে পরিণত করবে। আপনি যদি যথেষ্ট সাবধানী হোন, যথেষ্ট গরীব হোন, যথেষ্ট সাদাসিধে পোশাক পরেন, দামি ফোন ব্যবহার না করেন, ভুল মানুষের সঙ্গে মিশবেন না- তাহলেই নিরাপত্তা পাবেন। এটা কোনো সভ্য নিরাপত্তাব্যবস্থার ধারণা নয়। 

নাগরিকের নিরাপত্তা ‘পুরস্কার’ নয় যে ভালো আচরণ করলে রাষ্ট্র তা দেবে। এটা রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার মৌলিক দায়িত্বের অংশ। নাগরিক কর দেন, পণ্য কিনলে ভ্যাট দেন, আইন মানেন- বিনিময়ে রাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও আইনের সুরক্ষা প্রত্যাশা করেন। 

  • একজন নাগরিক গা ভরা গহনা পরে রাস্তায় বের হলেও তার ওপর হামলা করার অধিকার কারও নেই। একজন কিশোর মায়ের আইফোন হাতে নিয়ে রাস্তায় বের হতে পারে। সেট তার হত্যার লাইসেন্স কারও হাতে তুলে দেয় না। 

এখানে পরিবারকে দায়মুক্তি দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে না। পরিবারের supervision দরকার। কিশোরের বন্ধুত্ব সম্পর্কে বাবা-মায়ের জানা দরকার। ডিজিটাল নিরাপত্তা শেখানো দরকার। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ঝুঁকি বোঝানো দরকার। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে- এসব জানা দরকার। এসবের সঙ্গে শিশুর নিরাপত্তার সম্পর্ক গভীর। 

কিন্তু পারিবারিক supervision এবং রাষ্ট্রীয় accountability- দুটো পরস্পরের বিকল্প নয়। একটি দায়িত্ব পালিত হয়নি বলে অন্য দায়িত্ব বাতিল হয় না। 

অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, এটা আমাদের নিরাপত্তার প্রশ্ন। আমরা কি অপরাধের পর অপরাধীর দিকে তাকাই, নাকি প্রথমেই ভিকটিমের জীবনযাপন খুঁটিয়ে দেখি?

 আমরা কি জানতে চাই- কোন প্রতিষ্ঠান কোথায় ব্যর্থ হয়েছে, নাকি জানতে চাই- মায়ের টিপ এত বড় কেন? আমরা কি জানতে চাই- অভিযোগের পর আইন কী করেছে, নাকি জানতে চাই- শিশুর হাতে আইফোন এল কীভাবে? 

এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সমাজের চরিত্র সম্পর্কে অনেক কিছু বলে। আর এই আলোচনার সবচেয়ে কঠিন জায়গাটি হলো- অপ্রতিমের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন আতঙ্ক হিসেবে দেখলে আমরা মূল সমস্যাটি ধরতে পারব না। 

বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের ৩ সেপ্টেম্বরের হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৫,৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার রিপোর্ট হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৩,৬৭৯ জন উদ্ধার বা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে, কিন্তু ২,০৩৮ জন নিখোঁজ শিশুর সন্ধান মেলেনি। 

এই সংখ্যাগুলো আইফোনের ঘটনা নয়। এদের প্রত্যেকের জীবন, পরিবার, ভয়, অনিশ্চয়তা এবং ফিরে আসার প্রতীক্ষা আছে। অপ্রতিমের মায়ের কপালের টিপ তাই আমাদের আলোচনার কেন্দ্র হতে পারে না। তার হাতে থাকা আইফোনও নয়। কেন্দ্রে থাকা উচিত অপ্রতিমের অধিকার- এবং সেই অধিকার রক্ষার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা।

কারণ কোনো শিশুকে হত্যা করার আগে হত্যাকারী সাধারণত কোনো আইফোনকে জিজ্ঞেস করে না- রাষ্ট্র কতটা শক্তিশালী। সে হিসাব করে অন্য কিছু। ধরা পড়ার আশংকা কতখানি, পালানোর সুযোগ কতটা, আগের অপরাধের কী হয়েছিল, কে তাকে রক্ষা করতে পারে, আইন কত দ্রুত নড়বে। 

  • সেখানেই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। অপ্রতিমের জন্য ন্যায়বিচার মানে শুধু তার হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা নয়। ন্যায়বিচার মানে সেই পুরো পথটিও দেখা- যে পথে একজন ১৩ বছরের কিশোর নিরাপদে বাড়ি ফেরার বদলে লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে মৃত অবস্থায় পৌঁছাল। 

আর আমাদের সামাজিক প্রশ্নটি হওয়া উচিত আরও সরল- অপ্রতিমের মা কেন আইফোন হাতে সন্তানকে বাইরে যেতে দিলেন- শুধু এটাই নয়। প্রশ্ন হলো, শিশু বাইরে বের হলে তাকে নিরাপদে বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়ার মতো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা আমরা কতটা তৈরি করতে পেরেছি? 

এই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে যদি আমরা আইফোন, টিপ, পোশাক, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা পরিবারের জীবনযাপন নিয়ে ব্যস্ত থাকি, তাহলে আমরা অপরাধের কারণ নয়- অপরাধের দায় এড়ানোর আরামদায়ক গল্প খুঁজছি। 

অপ্রতিম আর ফিরবে না। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আমরা কী শিখব- সেটা এখনো আমাদের হাতে। 

শিশুর নিরাপত্তা কোনো পরিবারের বিলাসিতা নয়। এটা অধিকার। আর অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে পরিবার যেমন দায়বদ্ধ, রাষ্ট্রও তেমনি জবাবদিহির বাইরে নয়।

লেখক : দীপু মাহমুদ, চিন্তক, সমাজ বিশ্লেষক ও শিশু-অধিকার বিষয়ক লেখক।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!