ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ মতামত ]

পোলার সিল্ক রুট: ভবিষ্যতের বাণিজ্যপথ

শামসুল আরেফীন
প্রকাশিত: ২০:২৩, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পোলার সিল্ক রুট: ভবিষ্যতের বাণিজ্যপথ
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

আর্কটিক অঞ্চল অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অঞ্চল যা এখনও বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর পূর্ণাঙ্গ মনোযোগ পায়নি। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণে ও অমিত অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকায় এ অঞ্চলটি ক্রমাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে এ অঞ্চলকে ঘিরে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আর্কটিক মহাসাগরকে (যাকে উত্তর মহাসাগরও বলা হয়) ঘিরে রয়েছে ০৮টি দেশের উপকূল। দেশগুলো হলঃ রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (আলাস্কা), ফিনল্যান্ড, কানাডা, নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক (গ্রীণল্যান্ড) ও আইসল্যান্ড। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রায় ৫৩ শতাংশ উপকূল রাশিয়ার। এই ৮টি দেশ মিলে ১৯৯৬ সালে গঠিত হয়েছে আর্কটিক কাউন্সিল, যা আর্কটিক অঞ্চলের বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে কাজ করে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রতিটি দেশ তাদের সমুদ্রকূল হতে ২০০ নটিক্যাল মাইল এলাকায় প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করতে পারে। আর্কটিক অঞ্চলের জনসংখ্যা প্রায় ৪০ লক্ষ, যার অর্ধেকই রাশিয়ায় বাস করে। বাকিরা মূলতঃ নরওয়ে, সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের উত্তরাংশে বাস করে। প্রায় ৫৩ শতাংশ এলাকা জুড়ে উপকূল থাকায় আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।

ধারণা করা হয়, বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস মজুদের ২৫ শতাংশ রয়েছে আর্কটিক অঞ্চলে। এছাড়া, মৎস্য ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ, যেমন নিকেল, কপার, কয়লা, স্বর্ণ, ইউরেনিয়াম, হীরা ইত্যাদিতে ভরপুর আর্কটিক অঞ্চল। এর মধ্যে রাশিয়ার সমুদ্রকূল সবচেয়ে বেশী প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। তাছাড়া নরওয়েজিয়ান সমুদ্রে তেল ও গ্যাসের বিশাল মজুদ রয়েছে, যা নরওয়ে ও বৃটেন যৌথভাবে উত্তোলন করে ইউরোপীয় দেশগুলোতে সরবরাহ করে থাকে। নরওয়েজিয়ান সমুদ্র ছাড়াও ব্যারেন্ট সমুদ্র হতে রাশিয়ার উত্তোলিত অপরিশোধিত জ্বালানী তেল, সামুদ্রিক খাবার ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ চীনসহ মধ্য এশিয়া এবং পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপে যোগান দেয়া হয়। রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের প্রধান খনিগুলো রয়েছে আর্কটিক বেল্টের মারমানস্ক, ইনডিগা, টিমেন পেচোরা, মেসোয়াকা, ইয়ামবার্গ এবং মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের উরেনগয় ও ইয়াকুটস্ক অঞ্চলে। 

Advertisement

বিশ্ব বাণিজ্য পরিচালিত হয় সমুদ্র, রেল, সড়ক ও আকাশপথে। তবে ব্যয় সাশ্রয়ীভাবে বিশাল পরিমাণ পণ্য আমদানি-রপ্তানির প্রধান মাধ্যম সমুদ্রগামী জাহাজ। বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। এশিয়া মহাদেশকে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশ্বের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও পঞ্চম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ চীন, জাপান ও ভারত এশিয়াতে অবস্থিত। পাশাপাশি রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশসমূহ। চীনকে বলা হয় বিশ্বের উৎপাদনের ফ্যাক্টরী। শুধু শিল্পপণ্য নয়, কৃষি পণ্য উৎপাদন, খনি, সামরিক, প্রযুক্তি, এমনকি মহাকাশ গবেষণাতেও চীন বহুদূর এগিয়ে গেছে। 

চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে ইউরোপের বাণিজ্যের প্রধান সমুদ্রপথ হল ৪টি। প্রথমটি হল মালাক্কা প্রণালী, ভারত মহাসাগর, এডেন উপসাগর ও সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ। এক্ষেত্রে দূরত্ব হল প্রায় ২১,০০০ কিলোমিটার এবং এই পথ পাড়ি দিতে সমুদ্রগামী জাহাজের প্রায় ৪৮ দিন সময় লাগে। দ্বিতীয়টি হল বেরিং প্রণালী, রাশিয়ার আর্কটিক সমুদ্র উপকূল, নরওয়েজিয়ান সমুদ্র হয়ে ইউরোপ; এটির দূরত্ব হল প্রায় ১২,৮০০ কিলোমিটার, এতে পণ্য পরিবহন সময় ১০-১৫ দিন পর্যন্ত কমে যায়। এটিকে ‘পোলার সিল্ক রুট’ নামে অভিহিত করা হয়। তৃতীয়টি হল প্রশান্ত মহাসাগর, পানামা খাল, আটলান্টিক মহাসাগর হয়ে ইউরোপ; যার দূরত্ব প্রায় ২৪,০০০ কিলোমিটার, স্বাভাবিকভাবেই এটি দিয়ে বাণিজ্য খুব কম হয়। এবং চতুর্থটি হল বেরিং প্রণালী, কানাডার আর্কটিক সমুদ্র উপকূল, গ্রীণল্যান্ড হয়ে ইউরোপ; এটি ‘উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্যাসেজ’ নামে পরিচিত ও এক্ষেত্রে দূরত্ব দাঁড়ায় প্রায় ১৬,০০০ কিলোমিটার। এই শেষোক্ত পথটির প্রধান সমস্যা হল এই পথটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সমুদ্র পথ হিসেবে গণ্য করলেও কানাডা এটিকে তাদের জলসীমার অংশ হিসেবে গণ্য করে। এই নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে, যার ফলে এই পথটির উপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। এই পথটির উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ দরকার, অনেক আইস ব্রেকার জাহাজ দরকার, যা করা কানাডার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া, প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটার দূরত্ব কম হওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পশ্চিমাঞ্চলীয় ক্যালিফোর্নিয়া, ওরেগন ও ওয়াশিংটন রাজ্য (ওয়াশিংটন ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়া বা ওয়াশিংটন ডি.সি. হল যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী, তবে ওয়াশিংটন নামে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে একটি রাজ্য রয়েছে) হতে ইউরোপের সাথে বাণিজ্য করতে পানামা খাল ব্যবহার করে। তাই উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্যাসেজটির উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ কম।

দেখা যাচ্ছে, যদি পোলার সিল্ক রুট ব্যবহার করা হয় তাহলে চীন, জাপান ও দঃ কোরিয়ার সাথে ইউরোপের বাণিজ্য সবচেয়ে লাভজনকভাবে পরিচালিত হতে পারে। কিন্তু এটি ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এটি বিপুলভাবে বরফাচ্ছাদিত এবং সারা বছরে মাত্র ২ হতে ৪ মাস অর্থাৎ মে হতে অগাষ্ট পর্যন্ত জাহাজ চলাচলের উপযোগী থাকে। তাই যদি এই সমুদ্র পথকে সারা বছর জাহাজ চলাচলের উপযোগী রাখা যায় তাহলে হাজার হাজার ডলারের জ্বালানী খরচ বেঁচে যাবে এবং বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন বহুলাংশে কম হবে। 

এখানে উল্লেখ্য, শীতকালে সমস্ত আর্কটিক অঞ্চল একটি বিশাল বরফখন্ডে পরিণত হয়। এন্টারটিকার তুলনায় আর্কটিক অঞ্চলের বরফের ঘনত্ব বেশী, এন্টারটিকায় যেখানে বরফের ঘনত্ব ১-২ মিটার থাকে, সেখানে আর্কটিক অঞ্চলে এই ঘনত্ব দাঁড়ায় ২-৩ মিটারে, কোন কোন অঞ্চলে আরো বেশী। মে হতে অগাষ্ট পর্যন্ত উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল থাকে। এই সময়ে সূর্য কর্কট ক্রান্তি রেখার কাছাকাছি অবস্থান করে। তখন আর্কটিক অঞ্চলে সূর্যের আলো পড়ে। দূরত্বের কারণে তাপমাত্রা কম থাকলেও আর্কটিকের বরফ এ সময় গলতে শুরু করে। তাই এ সময় সমুদ্রপথ জাহাজ চলাচলের উপযোগী হয়ে উঠে। অন্যদিকে সেপ্টেম্বর হতে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে আর্কটিক অঞ্চল পুরু বরফে ঢাকা থাকে। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আর্কটিকের বরফের পরিমাণ অনেক কমে গেছে এবং দিন দিন আরো কমছে। ফলে পোলার সিল্ক রুট বিশ্বের আরো বেশি নজর কাড়ছে।

আগেই বলেছি, আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার রয়েছে ৫৩ শতাংশ উপকূল। তাই এ অঞ্চলে রাশিয়ার রয়েছে ব্যাপক প্রভাব। রাশিয়ার রয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ৫০টিরও বেশী আইস ব্রেকার জাহাজের বহর; যার মধ্যে রয়েছে ৮টি পারমাণবিক শক্তি চালিত ও ৩৪টি ডিজেল চালিত আইস ব্রেকার; যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে মাত্র ৩টি, যার একটিও পারমাণবিক শক্তি চালিত নয়। এই আইস ব্রেকার জাহাজগুলো পোলার সিল্ক রুটে সামরিক, বাণিজ্যিক ও পর্যটকবাহী জাহাজের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা এবং রাশিয়ার উত্তর উপকূলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ভূমিকা রাখে। এ অঞ্চলে রাশিয়া ২০১৩ সালের পর ৭টি নতুন নৌ ঘাঁটি স্থাপন করেছে, যেগুলো হলঃ সেভেরোমরস্ক, পলিয়ারনি, অলিনিয়া বে, গেজিয়েভো, বিদেয়াভো, বলশেয়া লোপাটকা ও গ্রেমিখা। এই ঘাঁটিগুলোতে রয়েছে বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও অত্যাধুনিক রাডার ব্যবস্থা, যেগুলো যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধজাহাজ ধ্বংসের ক্ষমতা রাখে। এই ঘাঁটিগুলোর প্রত্যেকটির রাডার ব্যবস্থা ৬০০ কিলোমিটার এলাকায় নজরদারি করতে সক্ষম। এর মানে হল, এই অঞ্চল দিয়ে কোন জাহাজ অতিক্রম করলে বা কোন দেশ এই অঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যক্রম পরিচালনা করলে তা রাশিয়ার নজরদারীর আওতায় থাকবে। 

পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে চীন বিকল্প সমুদ্র বাণিজ্য পথ হিসেবে উত্তর মহাসাগরে রাশিয়ার উপকূলবর্তী পোলার সিল্ক রুটকে বিবেচনা করছে। রাশিয়ার সাথে চীনের সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানোর এটি অন্যতম কারণ। চীন, মঙ্গোলিয়া, রাশিয়ান অর্থনৈতিক করিডর ব্যবহার করে রাশিয়ার সাথে বাণিজ্য সম্প্রসারণসহ পোলার সিল্ক রুট ব্যবহার করে ইউরোপের সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাশিয়ার পাশাপাশি চীনও সেখানে ব্যাপক বিনিয়োগ শুরু করেছে। রাশিয়া এ অঞ্চলে সাবেটা, ডিকসন ও পেভেক বন্দরের উন্নয়ন করছে, যাতে চলাচলকারী জাহাজে জ্বালানী সরবরাহ, ক্রুদের বিশ্রাম ও খাবার নিশ্চিতকরণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। চীনের সিএনপিসি, সিএনওওসি ও সিল্ক রোড ফান্ডের মত কোম্পানীগুলো রাশিয়ার জ্বালানী খাতে ইয়ামাল এলএনজি ও আর্কটিক এলএনজি-২ প্রকল্প, বেলকোমুর রেলওয়ে প্রকল্প, আইস-ক্লাস কন্টেইনার জাহাজ নির্মাণ, রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের বøাডিভস্টক বন্দর উন্নয়ন ইত্যাদি খাতে বহু বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। ফলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলটি অর্থনৈতিকভাবে যেমন আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে তেমনি পোলার সিল্ক রুটের ব্যবহারও দিন দিন বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা যায়।

চীনের অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। তাছাড়া তাইওয়ান নিয়েও তাদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। বেইজিং ঘোষণা দিয়ে রেখেছে, রাজনৈতিকভাবে সম্ভব না হলে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে তাইওয়ানকে চীনের সাথে একত্রীকরণের বিষয়টি তাদের বিবেচনাধীন রয়েছে। আবার বহু বছর ধরে ‘এক চীন’ নীতির পক্ষে থাকলেও গত বাইডেন প্রশাসনের সময়ে ১৯৯৭ সালের পর প্রথমবারের মত যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিনিধি পরিষদের তৎকালীন রিপাবলিকান স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির অগাষ্ট ২০২২ এ তাইওয়ান সফর; বাইডেন প্রশাসনের ০৪ বছর মেয়াদে তাইওয়ানে প্রায় ৭.৭ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি এবং প্রেসিডেন্ট বাইডেন তাইওয়ানের সাথে চীনের যুদ্ধ বাঁধলে চীনের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করার ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়ায় এই সম্পর্ক আরো খারাপ হয়। 

তাছাড়া, চীনের সাথে ইউরোপের বাণিজ্যের প্রধান পথ দক্ষিণ চীন সাগর ও মালাক্কা প্রণালীর আশেপাশে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অনেকগুলো সামরিক ঘাঁটি। চীনের পূর্ব-দক্ষিণ অংশে জাপান, দঃ কোরিয়া, ফিলিপাইন; ভারত মহাসাগরের দ্বীপ রাষ্ট্র ডিয়েগো গার্সিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন দ্বীপ গুয়ামে রয়েছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে প্রায়শই পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন, বিমানবাহী রণতরী এবং এফ-১৬, এফ-২২ র‌্যাপটর, এফ-৩৫ ও বি-৫২ যুদ্ধবিমানসহ উল্লিখিত দেশগুলোকে নিয়ে সামরিক মহড়া চালায় ও নিয়মিত টহল দেয়। এছাড়াও ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ‘কোয়াড’ গঠন করেছে (কোয়াডকে মূলতঃ কুটনৈতিক ফোরাম হিসেবে অভিহিত করা হয়, তবে সামরিক সহযোগিতাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য)। ফলে তাইওয়ান আক্রমণ বা অন্য কোন অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র যদি কখনও মালাক্কা প্রণালী বন্ধ করে দেয় তাহলে চীনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। 

এজন্য ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ চীনের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ। এটি চীন সরকারের একটি কৌশলগত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রচেষ্টা, যা ২০১৩ সালে কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানায় ঘোষণা করা হয়। চীন ইতোমধ্যে ১৪৯টি দেশ ও ৩০টি আন্তর্জাতিক সংগঠনকে এই প্রকল্পের অন্তর্ভূক্ত করেছে এবং এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ৪-৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এর আওতায় অন্যান্য বিনিয়োগ প্রকল্পের পাশাপাশি ৬টি স্থল করিডর নির্মাণ করা হবে যা রেল, সড়ক, সমুদ্রপথ, জ্বালানী ও ডিজিটাল অবকাঠামো দ্বারা সংযুক্ত থাকবে। এই ৬টি স্থল করিডর হলঃ (১) চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর; যার মাধ্যমে স্থলপথে চীনা পণ্য পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দর পর্যন্ত পৌঁছাবে ও পরবর্তীতে সমুদ্রপথে পশ্চিম এশিয়ায়, আফ্রিকায় এবং এডেন উপসাগর হয়ে ইউরোপে সরবরাহ করা হবে। এই করিডরটি চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এর ফলে মালাক্কা প্রণালী ব্যবহার অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে এবং দূরত্বও অনেক কমে যায়। (২) চীন ইয়োরেশিয়ান করিডর; এর মাধ্যমে রেলপথে চীনের জিনজিয়ান প্রদেশ হতে কাজাখস্তানের মধ্য দিয়ে রাশিয়া হয়ে বেলারুশ, পোল্যান্ড ও জার্মানী পর্যন্ত পণ্য পৌঁছাবে। (৩) চীন, মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া অর্থনৈতিক করিডর। (৪) চীন, মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া করিডর; এটি তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, ইরান হয়ে তুরস্ক পর্যন্ত যাবে। (৫) চীন, ইন্দোচীন পেনিনসুলা অর্থনৈতিক করিডর; এটি চীন হতে মায়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া হয়ে সিঙ্গাপুর যাবে। (৬) ট্রান্স হিমালয়ান মাল্টি-ডাইমেনশনাল কানেকটিভিটি নেটওয়ার্ক; এটির দ্বারা হিমালয় পর্বতমালার নিচ দিয়ে টানেল নির্মাণ করে নেপালকে চীনের সাথে যুক্ত করা হবে। পরবর্তীতে এটি বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলংকাকে যুক্ত করবে (যদিও ভারত দৃষ্টিভঙ্গি এক্ষেত্রে এখনও নেতিবাচক)।

দেখা যাচ্ছে, চীন বিশ্বব্যাপী তার বাণিজ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিকল্প বাণিজ্য পথ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এতে চীনের পাশাপাশি করিডরসমূহের অন্তর্ভূক্ত দেশগুলোও লাভবান হচ্ছে, কেননা চীনের বিনিয়োগের মাধ্যমে তাদের স্থল, রেল ও অন্যান্য যোগাযোগ অবকাঠামোয় ব্যাপক উন্নয়ন ঘটছে, যা তাদের নিজেদের অর্থে সম্পন্ন করা অসম্ভব ছিল (যদিও এক্ষেত্রে ‘চীনা ঋণের ফাঁদ’ বিষয়ক বিতর্ক রয়েছে)। তবে সবচেয়ে লাভজনক বাণিজ্য পথ হিসেবে এসব স্থল বাণিজ্য করিডরের বিকল্প হিসেবে পোলার সিল্ক রুটের গুরুত্ব চীনের কাছে অনেক।

বৈশ্বিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন, ক্রমহ্রাসমান পশ্চিমা আধিপত্য, ‘গ্লোবাল সাউথ’ (শিল্পোন্নত দেশগুলোর দক্ষিণে অবস্থিত, কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম উন্নত দেশসমূহকে গ্লোবাল সাউথ বলা হয়। আনক্টাড এর মতে, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান দেশসমূহ; ইসরায়েল, জাপান ও দঃ কোরিয়া বাদে এশিয়ার অন্যান্য দেশ এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড বাদে ওশেনিয়া অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলো গ্লোবাল সাউথের অন্তর্ভূক্ত) দেশগুলোর গতিশীল অর্থনীতি ইত্যাদি কারণে খুব দ্রুত বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটছে। এই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের ব্যবসা বাণিজ্য অব্যাহত রাখার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিগুলো প্রতিটি সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ কারণেই ‘বহুমাত্রিক বিশ্বের’ ধারণা বহুল আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। বিশ্বের অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর এই প্রচেষ্টা বাকি বিশ্বের জন্যও উদাহরণ হতে পারে।   

লেখকঃ শামসুল আরেফীন, নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!