সাংবাদিকতা যেন পুলকিত ‘সুইসাইড নোট’!
শূন্যদশকে নির্মম-নিরুপায়ে পঁয়ত্রিশ পার করার সময়েই ঢুকে গেলাম সাংবাদিকতার ব্ল্যাকহোলে। উত্তরাঞ্চলের তৎকালীন জনপ্রিয় দৈনিক ‘আজ ও আগামীকাল’-এর সম্পাদক বললেন, “তুমি পারবে, থেকে যাও!” প্রচণ্ড দ্বিধা চেপে বসেছিল বুকের ভেতর। এর মধ্যেই আব্বা পড়লেন বিছানায়।
এক রাতে মায়ের জরুরি বার্তা, “রাতেই বাড়ি আয়, তোর আব্বার অবস্থা ভালো নয়।” বিকেলে সম্পাদককে বললাম, “বেতনটা দরকার, স্যার? বাড়ি যাওয়া জরুরি।“ বললেন, “রাতে পেয়ে যাবে। ”
সেই রাতে আর বেতন পাওয়া হয়নি। আব্বাকে নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় মধ্যরাতে ঘুমাতে গেলাম। পরদিন ভোরে কাজিন মোটরসাইকেলে এসে ঘুম ভাঙালো। কিছু না বলেই আমাকে নিয়ে ছুটলো। গ্রামের কাছাকাছি যেতেই মাইকিং থেকে জানলাম, গতরাতে আব্বা মারা গেছেন।
.png)
শুনলাম, আব্বা আমাকে দেখার জন্য ছটফট করছিলেন। মা-বোন-ছোট ভাই সবাই আমাকে জড়িয়ে কাঁদছে হাউমাউ করে। আমার চোখে পানি নেই। অনেকে ভাবল, আমি পাষাণ।
২.
সেই থেকে কেন যেন সম্পাদকদের ওপর চাপা ক্ষোভ। ‘সংবাদ’-এ বগুড়া প্রতিনিধি হতে বিলু ভাইয়ের শিষ্য হলাম। বললেন, নিয়োগ না পাওয়া পর্যন্ত ‘আজ ও আগামীকাল’ ছেড়ো না। সকাল থেকে ১০-১২ ঘণ্টা ছুটতে থাকলাম ‘সংবাদ’-এর খবর জোগার করতে। সন্ধ্যার পর ‘আজ ও আগামীকাল’ অফিসে।
- এক রাতে অফিসে হঠাৎ নাকে-মুখে রক্ত এলো। নেওয়া হলো চেম্বারে। ডাক্তার বললেন, “হাইপারটেনশন। টেনশন কমাতে হবে।”
টানা ছয় মাস ১০-১২ ঘণ্টা ফ্রি খাটাখাটির পর ‘সংবাদ’-এ নিয়োগ। বেতন প্রত্যাশিত না হলেও চাপ-টেনশন কমাতে রাতের ‘আজ ও আগামীকাল’ ছাড়লাম। এর কয়েক মাস পর আরও ভালো কাজ করার জন্য জরুরি হয়ে পড়ল ল্যাপটপ কেনা।
বিজ্ঞাপনের কিছু টাকাও জমেছিল অফিসে। কিন্তু এক ঈদে বিলু ভাইয়ের বিলের সঙ্গে আমার বিল পাঠালো অফিস। একসঙ্গে সব টাকা আর পেলাম না। স্বপ্নের সেই ল্যাপটপও আর কেনা হলো না। কিছু সিনিয়র মনে হয় জুনিয়রদের স্বপ্ন পড়তে পারেন না।
৩.
এক সময় বুঝলাম, কাজের পরিধি কোথায় যেন আটকে যাচ্ছে। নিউজ পলিসিতে কাজ করার স্বপ্ন দেখলাম। সেজন্য রাজধানীতে গিয়ে বরেণ্য সম্পাদকদের শিষ্য হতে চাই।
‘সংবাদ’ থেকেও ডাক এলো। তবে ব্যাগ-ব্যাগেজ নিয়ে ‘চল্লিশ প্লাসে’ যখন ঢাকায় পৌঁছলাম, ‘সংবাদ’-এর বেতনের অফারে চোখে অন্ধকার দেখলাম।
- প্রেসক্লাবে একদিন ‘সংবাদ’-এর নির্বাহী সম্পাদক বুলবুল ভাইকে দেখে ছুটে গেলাম। কিন্তু হঠাৎ চোখের সামনে যেন হাজির হলো দিগন্তজোড়া শর্ষে ফুল।
কতদিন পর বুঝেছিলাম, দূর থেকে যাদের আমরা ‘বটবৃক্ষ’ ভাবি, তারা আসলে একেকটা ‘ব্যাঙের ছাতা’। ঢাকার পথ সেই যে বেঁকে গেল, আর সোজা হয়ে ওঠেনি।
দেখলাম, ঢাকায় শুধুই অভিজাত সাংবাদিকতা। সম্পাদকেরা সরকারের একেকজন রাজকবি।
দক্ষতা, যোগ্যতা নয়, এখানে কানেকশনই বড়। নিউজের লক্ষ্য সাধারণ মানুষ নয়, অর্থ আর ক্ষমতা। মন্ত্রী, এমপি, আমলাদের ঝলসানো আলোয় চাপা পড়ে মাঝারি-প্রান্তিক সাংবাদিকদের বিষণ্ণতায় ভরা গল্পগুলো। (চলবে)
(সুইসাইড নোটের জীবন: ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬। সেন্ট্রাল রোড, ঢাকা)