ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

শেরপুরে হাতি-মানুষের সংঘাত কমাতে এআই ক্যামেরার নজরদারি

নালিতাবাড়ী (শেরপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১১:৩৫, ৫ নভেম্বর ২০২৬
শেরপুরে হাতি-মানুষের সংঘাত কমাতে এআই ক্যামেরার নজরদারি
বন্যহাতির আগমনী বার্তা জানাতে গারো পাহাড়ে বসানো হয়েছে এআই ক্যামেরা। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

শেরপুরের গারো পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই বন্যহাতি ও মানুষের মধ্যে সংঘাত চলছে। খাবারের সন্ধানে পাহাড়ের বন থেকে লোকালয়ে নেমে আসে হাতির পাল। এতে ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতির পাশাপাশি ঘটছে প্রাণহানির ঘটনাও। এই সংঘাত কমাতে এবার তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়েছে। নালিতাবাড়ী উপজেলার গারো পাহাড়ে পরীক্ষামূলকভাবে স্থাপন করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ১৫টি ক্যামেরা।

ক্যামেরাগুলোতে বন্যহাতির উপস্থিতি শনাক্ত হলেই এক মিনিটের মধ্যে মোবাইল ফোনে পৌঁছে যাচ্ছে সতর্কবার্তা। আগাম খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাচ্ছেন বন বিভাগ ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্যরা। এতে হাতি-মানুষের সংঘাত ও প্রাণহানির ঝুঁকি কমছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে হাতির চলাচলের আরও এলাকায় ক্যামেরা স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় প্রায় দেড় শতাধিক বন্যহাতির একটি পাল বিচরণ করে। খাবারের সন্ধানে এক পাহাড়ি টিলা থেকে অন্য টিলায় চলাচল করে হাতিগুলো। পাহাড়ে পর্যাপ্ত খাবার না পেলে তারা লোকালয়ে নেমে আসে। তখন নিজেদের ঘরবাড়ি ও ফসল রক্ষায় স্থানীয়রা হাতি তাড়ানোর চেষ্টা করেন। এতে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়। হাতির আক্রমণে মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি আহত ও নিহত হচ্ছে বন্যহাতিও।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ বছরে শেরপুরের গারো পাহাড়ি অঞ্চলে মানুষ-হাতির সংঘাতে ৩৩টি বন্যহাতি মারা গেছে। একই সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৪ জন মানুষ। সংঘাতের কারণে দুই পক্ষেরই প্রাণহানি ঘটছে, যা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্যহাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় প্রাণীগুলো বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকায় আটকে পড়ছে। উত্তরে ভারতের বিস্তীর্ণ বনভূমি থাকলেও সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ও নানা বাধার কারণে হাতিগুলোর সেখানে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে খাবারের সন্ধানে প্রায়ই বাংলাদেশের পাহাড়ি গ্রামগুলোতে নেমে আসছে তারা।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নালিতাবাড়ী উপজেলার সমশ্চুড়া, মধুটিলা, বুরুঙ্গা, ডালুকোণা ও দাওধারা-কাটাবাড়ীসহ হাতির চলাচলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ১৫টি এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স এবং মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় চালু হয়েছে এই পরীক্ষামূলক প্রকল্প।

ক্যামেরাগুলো বন্যহাতির উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে। হাতির অবস্থান শনাক্ত হলেই টেলিগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মোবাইলে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। এতে হাতি লোকালয়ে প্রবেশের আগেই বন বিভাগ ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারছেন। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সতর্ক করা হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ক্যামেরা স্থাপনের ফলে এখন হাতি লোকালয়ে নামার আগেই খবর পাওয়া যাচ্ছে। আগে হাতি চোখে না দেখা পর্যন্ত তাদের পক্ষে আগাম সতর্ক হওয়ার সুযোগ ছিল না। ক্যামেরার সংখ্যা আরও বাড়ানো হলে মানুষ ও হাতি—উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের সমশ্চুড়া এলাকার বাসিন্দা ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সভাপতি আরফান আলী বলেন, আগে বন্যহাতি আসার খবর পেতে অনেক দেরি হতো। হঠাৎ সামনে হাতি চলে এলে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন। এখন ক্যামেরার মাধ্যমে আগেই খবর পাওয়া যাচ্ছে। বন বিভাগের লোকজনও দ্রুত চলে আসছেন। স্থানীয়দের সচেতন করাও সহজ হয়েছে। এতে এলাকায় হাতির আক্রমণ অনেকটাই কমেছে।

একই এলাকার বাসিন্দা আলমাছ মিয়া বলেন, বন্যহাতি এসে ঘরবাড়িতে হামলা চালায় এবং ফসলের ক্ষতি করে। আবার হাতি তাড়াতে গিয়েও মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। আগে কখন হাতি আসবে, তা বোঝার উপায় ছিল না। এখন আগাম খবর পাওয়ায় নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার সুযোগ হচ্ছে। তবে এলাকায় আরও ক্যামেরা স্থাপন করা প্রয়োজন।

নয়াবিল ইউনিয়নের দাওধারা-কাটাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা রহমত আলী বলেন, বন্যহাতি ও মানুষের মধ্যে এমন সংঘাত তারা আর চান না। তাঁর ভাষ্য, জন্মের পর থেকেই তিনি এই পরিস্থিতি দেখে আসছেন। তিনি চান, হাতি ও মানুষ—উভয়ই নিরাপদে থাকুক। এআই ক্যামেরা স্থাপনের পর কিছুটা সুবিধা হলেও হাতির বিচরণ বেশি এমন এলাকাগুলোতেও ক্যামেরা বসানো দরকার।

মধুটিলা রেঞ্জের সমশ্চুড়া বনবিট কর্মকর্তা কাওসার হোসেন বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে স্থাপন করা এআই ক্যামেরার মাধ্যমে হাতির চলাচল সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে এবং সংঘাতের আশঙ্কাও আগের তুলনায় কমছে। হাতির করিডোর ও বেশি উপদ্রুত এলাকাগুলোতে এ ধরনের ক্যামেরা স্থাপন করা গেলে মানুষের নিরাপত্তা আরও বাড়বে।

ময়মনসিংহ বন বিভাগের মধুটিলা ফরেস্ট রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, এআই ক্যামেরার মাধ্যমে বন্যহাতির অবস্থান সম্পর্কে দ্রুত সতর্কবার্তা পাওয়া যাচ্ছে। এতে বন বিভাগ ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যেতে পারছেন। শুধু বন বিভাগের কর্মীরাই নন, স্থানীয় রেসপন্স টিমের সদস্যরাও হাতির অবস্থান, সংখ্যা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারছেন। প্রকল্পটির সুফল বিবেচনায় হাতির চলাচলের অন্য পথগুলোতেও ক্যামেরা স্থাপন করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, নালিতাবাড়ী উপজেলার বন্যহাতি উপদ্রুত এলাকায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বায়ো ফেন্সিং বা কাঁটাযুক্ত উদ্ভিদের বেড়া নির্মাণ এবং পাঁচ হেক্টর জমিতে হাতির খাদ্য উপযোগী বাঁশবাগান তৈরির কাজ চলমান রয়েছে।

ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের কমিউনিটি গভর্নেন্স স্পেশালিস্ট আবরার আহমাদ বলেন, ইতোমধ্যে ১৫টি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। এসব ক্যামেরা থেকে সহজেই মোবাইল ফোনে বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। প্রকল্পটির বড় সুবিধা হলো, বন বিভাগের পাশাপাশি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্যরাও এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ফলে আগাম তথ্য পেয়ে তাঁরা হাতির ক্ষতি না করে সেগুলোকে পাহাড়ের দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে পারছেন।

শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে প্রকল্পটি চালু করা হলেও ইতোমধ্যে এলাকার মানুষ সুফল পাচ্ছেন। এসব এলাকায় আরও এআই ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম জলাশয় তৈরি ও পাহাড়ে হাতির পছন্দের খাবার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, হাতির বিচরণক্ষেত্রে গভীর সাবমার্সিবল পাম্পযুক্ত জলাধার তৈরি করা হবে। যেসব এলাকায় হাতির বিচরণ বেশি, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী জলাধার খনন করা হবে। প্রাকৃতিক উৎসের পানি ধরে রাখার পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মেটাতে এসব পাম্প স্থাপন করা হবে। এতে বনের ভেতরেই হাতির পানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে এবং পানির সন্ধানে লোকালয়ে আসার প্রবণতা কমতে পারে।

তবে পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু এআই ক্যামেরা স্থাপন করে হাতি-মানুষের সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য পাহাড়ে হাতির স্বাভাবিক বিচরণ, খাবার ও পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ের প্রভাষক হাবিবুল হক পলাশ বলেন, পাহাড়ে বন্যহাতির স্বাভাবিক বিচরণ ও খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। হাতির জন্য পর্যাপ্ত জলাশয় তৈরি এবং পছন্দের খাদ্যগাছ রোপণ করতে হবে। এতে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে আসার প্রবণতা কমতে পারে এবং এআই ক্যামেরার পরীক্ষামূলক প্রকল্পটিও আরও কার্যকর হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/নালিতাবাড়ী/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!