ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

[ ফিচার ]

মানুষ নিজের কষ্ট কেন লুকিয়ে রাখে?

ডাঃ এম আর করিম রেজা
প্রকাশিত: ১২:০৬, ৫ নভেম্বর ২০২৬
মানুষ নিজের কষ্ট কেন লুকিয়ে রাখে?
নিজের কষ্ট স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; বরং সুস্থতার পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি সাহসী পদক্ষেপ।

কিছু মানুষ সব সময় হাসিখুশি থাকেন, অন্যদের হাসান, সবার পাশে দাঁড়ান— অথচ নিজের মনের কষ্ট আড়াল করে রাখেন। বাইরে থেকে তাঁদের জীবন স্বাভাবিক ও সুন্দর মনে হলেও মনের গভীরে জমে থাকতে পারে দুঃখ, একাকিত্ব, হতাশা কিংবা মানসিক ক্লান্তি।

এই অবস্থাকে সাধারণভাবে বলা হয় হাসির পেছনে বিষণ্নতা’ (Smiling Depression)। এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্বীকৃত কোনো স্বতন্ত্র রোগ নয়; বরং এমন একটি পরিস্থিতি বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দবন্ধ, যেখানে একজন মানুষ বাইরে থেকে হাসিখুশি ও স্বাভাবিক থাকলেও ভেতরে বিষণ্নতার লক্ষণ অনুভব করতে পারেন।

মানুষ কেন নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখে?
এর পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। কেউ দুর্বল হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ভয়ে মনের কথা প্রকাশ করেন না, কেউ প্রিয়জনদের দুশ্চিন্তায় ফেলতে চান না। আবার পরিবার, কাজ ও সামাজিক দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে অনেকে নিজের অনুভূতিগুলোকে উপেক্ষা করেন।

কিছু মানুষের ধারণা, সব সময় শক্ত থাকতে হবে, অন্যদের সামনে ভেঙে পড়া চলবে না। ধীরে ধীরে নিজের কষ্ট আড়াল করাটাই অভ্যাসে পরিণত হয়।

বিষণ্নতার সম্ভাব্য লক্ষণ
বাইরের হাসি দিয়ে মনের অবস্থা বোঝা যায় না। তবে বিষণ্নতার কিছু লক্ষণ হতে পারে—

- দীর্ঘদিন ধরে মন খারাপ, শূন্যতা বা হতাশা অনুভব করা।
- আগে ভালো লাগত এমন কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।
- ঘুম, খাওয়াদাওয়া ও দৈনন্দিন কর্মশক্তিতে পরিবর্তন আসা।
- মনোযোগ দিতে অসুবিধা হওয়া কিংবা নিজেকে মূল্যহীন মনে করা।
- মানুষের সঙ্গে থেকেও একাকিত্ব অনুভব করা।

এসব লক্ষণ থাকলেই বিষণ্নতা নিশ্চিত নয়। তবে লক্ষণগুলো দীর্ঘস্থায়ী হলে বা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেললে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

হাসিখুশি থাকা মানেই মানসিকভাবে ভালো থাকা নয়।

কীভাবে পাশে দাঁড়ানো যায়?
মানসিক কষ্টে থাকা মানুষের প্রয়োজন সহানুভূতি, মনোযোগ এবং বিচারহীন পরিবেশ। আন্তরিকভাবে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া, নিয়মিত খোঁজ নেওয়া এবং অনুভূতিগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া সহায়ক হতে পারে।

“সব ভুলে যাও” কিংবা “ইতিবাচক চিন্তা করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে”—এ ধরনের মন্তব্যের পরিবর্তে মন দিয়ে শোনা এবং পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া বেশি কার্যকর।

প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সাহায্য নিতে উৎসাহিত করা উচিত। কেউ আত্মহত্যা বা আত্মহানির কথা বললে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত উপযুক্ত সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

নিজের যত্ন নেওয়াও জরুরি

মানসিক কষ্টের জন্য সাহায্য চাইতে জীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার অপেক্ষা করতে হয় না। বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলা এবং প্রয়োজনে মনোবিজ্ঞানী, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা যোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

নিয়মিত ঘুম, সুষম খাবার ও শারীরিক সক্রিয়তা মানসিক সুস্থতায় সহায়তা করতে পারে। তবে বিষণ্নতার চিকিৎসার প্রয়োজন হলে এগুলো পেশাদার চিকিৎসার বিকল্প নয়।

নিজের কষ্ট স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; বরং সুস্থতার পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি সাহসী পদক্ষেপ।

হাসির আড়ালের মানুষটিকেও বোঝা জরুরি
মানুষের হাসি, সাফল্য ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড চোখে পড়ে; কিন্তু মনের ভেতরে চলতে থাকা সংগ্রাম সব সময় দৃশ্যমান হয় না।

যিনি অন্যদের সাহস দেন, তাঁরও সাহসের প্রয়োজন হতে পারে। যিনি সবার পাশে থাকেন, তাঁরও কখনো সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।

তাই বাহ্যিক আচরণ দেখে কারও মানসিক অবস্থা বিচার না করে সহানুভূতিশীল হওয়া জরুরি। এমন পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে মনের কষ্ট প্রকাশ করতে লজ্জা বা ভয় কাজ করবে না।

ভালোবাসা পাওয়ার জন্য সব সময় হাসিখুশি থাকার প্রয়োজন নেই। সাহায্য পাওয়ার জন্য শক্ত থাকার অভিনয়ও জরুরি নয়। অন্যদের ভালো রাখতে গিয়ে নিজের কষ্ট নীরবে সহ্য করা কোনো বাধ্যবাধকতা নয়।

কখনো কখনো একটি আন্তরিক প্রশ্ন, মন দিয়ে শোনা কিংবা পাশে থাকার আশ্বাস একজন মানুষের জন্য অনেক বড় সান্ত্বনা হয়ে উঠতে পারে।

কারণ প্রতিটি মানুষেরই প্রাপ্য—তাঁকে বোঝা হোক, তাঁর কথা শোনা হোক এবং তাঁর প্রতি যত্নশীল হওয়া হোক।

লেখক : ডাঃ এম আর করিম রেজা, চিকিৎসক ও সমাজকর্মী।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!