পরীক্ষার আগে বাবার মৃত্যু: বুকভরা কষ্টে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে লিজা পেল জিপিএ-৫
এইচএসসি পরীক্ষার কিছুদিন পূর্বে পরিবারের একমাত্র অবলম্বন বাবার মৃত্যু হয়। এই শোক বুকে চেপে রেখে পরীক্ষায় বসতে হয়েছিল তাকে। একদিকে বাবাকে হারানোর অসহনীয় বেদনা, অন্যদিকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। চোখের পানি মুছে সেই কঠিন সময়েও হাল ছাড়েনি সে। বুকভরা কষ্ট নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেন নির্জনা ইসলাম লিজা নামে এক পরীক্ষার্থী। শনিবার প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে নির্জনা ইসলাম লিজা জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে চমকিয়ে দিয়েছে।
নির্জনা ইসলাম লিজা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মোগড়া এলাকায় ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী।
তার এ সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক ও সহপাঠীদের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
পরীক্ষার কিছু দিন পূর্বে বাবার মৃত্যু হওয়ায় হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। বাবা হারানো বেদনা বুকভরা কষ্ট আর চোখের জল নিয়ে পরীক্ষা দিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের মেধা ও অধ্যবসায়ের প্রমাণ দিয়েছে সে।
ফলাফল প্রকাশের পর জিপিএ-৫ পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি আবেগের সৃষ্টি হয়। অনেকেই তার এই অর্জনকে কঠিন পরিস্থিতির বিরুদ্ধে এক অসাধারণ লড়াই হিসেবে দেখছেন।
বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো সন্তানের এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হতেন। কিন্তু আজকের এই অর্জনের পেছনে যার বেশী ভূমিকা রয়েছে সেই প্রিয় মানুষটি নেই। তাই সাফল্যের আনন্দের মাঝেও বাবাকে হারানোর শূন্যতা তাকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দিচ্ছে।
নির্জনা ইসলাম লিজা পৌর শহরের মসজিদপাড়া এলাকার মৃত রেজাউল ইসলাম (ছায়েদ) এর মেয়ে। মা একজন গৃহিণী। দুই ভাই এর মধ্যে সে সবার বড়। এর আগে সে এসএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ অর্জন করে। তার এই অসাধারণ সাফল্যের পেছনে বাবা মায়ের ভূমিকা ছিল সব চাইতে বেশি।
পরীক্ষার আগে বাবার মৃত্যুর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে স্বজনদের পরামর্শে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন লিজা। বাবাকে হারানোর গভীর শোক বুকে নিয়েই শেষ পযর্ন্ত পরীক্ষা দেন।
ফল প্রকাশের পর নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে লিজা বলেন, বাবা সব সময় চাইতেন তার ফল ভালো হোক। পরীক্ষার আগে বাবাকে হারানো ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত। বাবার স্বপ্ন পূরণের কথা ভেবেই নিজেকে সামলে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া হয়। সে আরও বলেন, বাবার মৃত্যুর পর কোন কিছুই ভালো লাগতো না। বারবার বাবার মুখ ভেসে উঠতো। পড়ায় মন বসতো না। বাবা বেঁচে থাকলে এ ফল দেখে খুব খুশি হতেন। সবার কাছে বাবার জন্য দোয়া চাই।
সে আরও জানায়, ছোটবেলা থেকেই মা’ বাবা আমার পড়াশুনাসহ সব কিছুতে খেয়াল রেখেছেন। বাবার পাশাপাশি সর্বস্থায় আমার মায়ের তদারকি ছিল সব চাইতে বেশী। সেইসাথে কলেজের শিক্ষকদের সার্বিক সহযোগিতা এবং নিজের ইচ্ছের কারণেই আজ ভাল ফলাফল অর্জন করেছি। আমার ইচ্ছা ডাক্তার হওয়ার। এ জন্য সকলের কাছে দোয়া চাই। ডাক্তার হয়ে যেন মানুষের সেবা করতে পারি।
আখাউড়া উপজেলার ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুর রাজ্জাক হাজারী বলেন, নির্জনা ইসলাম লিজা শুরু থেকেই একজন মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। শিক্ষকদের প্রত্যাশা ছিল, সে ভালো ফল করবে। পরীক্ষার কিছুদিন পূর্বে তার বাবা মারা যাওয়ায় সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। আমরা সবাই তাকে উৎসাহ দিয়ে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করি।
তিনি বলেন, পরীক্ষার আগে বাবার মৃত্যুর এত বড় শোক সামলে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সে যে ফলাফল অর্জন করেছে নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তার এ সাফল্যে কলেজের সবাই খুশি। ভবিষ্যতেও সে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে বলে আশা করছি।