রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই দিনব্যাপী ‘কারাম উৎসব’ উদযাপিত
ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠান, লোকগান, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) দুই দিনব্যাপী কারাম উৎসব উদযাপিত হয়েছে। দুই দিনব্যাপী এ উৎসব শুক্রবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মুক্তমঞ্চে শুরু হয়। শনিবার সন্ধ্যায় কারাম গাছের ডাল বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসব শেষ হবে।
উৎসব উপলক্ষে আজ শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে একটি র্যালি বের করা হয়। পরে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন আয়োজকরা।
.png)
উত্তরবঙ্গ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আদিবাসী সংগঠনের উদ্যোগে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। এবারের উৎসবের প্রতিপাদ্য ছিল—‘আমাদের সংস্কৃতিই আমাদের পরিচয়’।
কারাম উৎসব মূলত কৃষি ও প্রকৃতিনির্ভর একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব। বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের ওরাও, সাঁওতাল, মুন্ডা, কুর্মি, ভূমিজ ও খাড়িয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ উৎসব পালনের প্রচলন রয়েছে। মূলত ভাদ্র মাসে কারাম উৎসব পালন করে থাকে।
উৎসবের সাত থেকে নয় দিন আগে অবিবাহিত তরুণীরা নদী থেকে পরিষ্কার বালি ও মাটি সংগ্রহ করে নতুন বাঁশের ঝুড়িতে রাখেন। সেখানে ধান, গম, মুগ ও ছোলার বীজ বপন করা হয়। গোসলের পর প্রতিদিন হলুদ মিশ্রিত পানি দিয়ে এসব চারার পরিচর্যা করা হয়। অঙ্কুরিত এসব চারাকে ‘জাওয়া’ বলা হয়, যা নতুন জীবন ও উর্বরতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
উৎসবকে কেন্দ্র করে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে নাচ, গান ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে মুখর হয়ে উঠেছে আয়োজনস্থল। নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতেও এ আয়োজন ভূমিকা রাখছে।
আয়োজকরা জানান, কারাম উৎসব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কৃষিনির্ভর জীবন, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। ভালো ফসল, মানুষের কল্যাণ এবং প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অংশ হিসেবে এ উৎসব পালন করা হয়। ওরাওদের পাশাপাশি মাহালী ও মুড়া সম্প্রদায়ের মানুষও কারাম উৎসব পালন করেন।
কারাম উৎযাপন কমিটির সভাপতি শীত কুমার উরাং বলেন, কারাম পূজা ওঁরাও জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান ঐতিহ্যবাহী উৎসব। এটি শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং প্রকৃতি, কৃষি, ভ্রাতৃত্ব ও সমৃদ্ধির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উৎসব। পূজায় কারাম গাছের ডাল প্রতীক হিসেবে স্থাপন করা হয়। ওঁরাওদের বিশ্বাসে কারাম দেবতা জীবন, ফসলের সমৃদ্ধি ও মঙ্গলের সঙ্গে জড়িত। এর মাধ্যমে ভালো ফসল ও সমাজের কল্যাণ কামনা করা হয়।
তিনি বলেন, এই উৎসবের মূল শিক্ষা—প্রকৃতিকে ভালোবাসা-রক্ষা করা এবং সমাজে ঐক্য-ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখা। গান-নাচ ও নানা আচারের মধ্য দিয়ে ওঁরাওদের ভাষা-সংস্কৃতি প্রজন্মান্তরে বহমান থাকে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী ছবি বীর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সমতলের আদিবাসীরা প্রথমবারের মতো এই উৎসব উদযাপন করছি। প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি সাড়া ও ইতিবাচক পরিবেশ পেয়ে আমরা সত্যি আনন্দিত।
বাংলাদেশ ওঁরাও কালচারাল ফোরামের (ওঁরাও বিডি) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রণিকান্ত তিকী বলেন, ‘ওরাঁও সম্প্রদায়ের প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধারণ করাই মুলত এই উৎসবের মূল উপজীব্য। আগের চেয়ে উৎসবের আমেজ বা উদ্দীপনা কোনো অংশে কমেনি, বরং সমতল ভূমির আদিবাসীদের মধ্যে এটি পালনের আগ্রহ ও সুযোগ অনেকটাই বেড়েছে।’
আলোচনা সভায় বিশ্ববিদ্যলয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপানারা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হলে অনেক পিছিয়ে পড়বেন। তাই আপনারা ছেলে-মেয়েদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাবেন। সে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হবে। সব দিকে পদচারণা যাতে থাকে। নিজেদের কখনো নিচু ভাববেন না। নিজেদেরকে তুলে ধরেন। নিজেদের তুলে ধরার মধ্য দিয়ে দেশের কল্যাণে কাজ করেন।’