ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি নিয়ে বিতর্ক, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালা ‘সংস্কারের’ অংশ হিসেবে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি স্থান দেওয়া হয়। নতুন করে স্থান পাওয়া এসব ছবি নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক, এর মাঝেই ছবিটি সরিয়ে তা ছিঁড়ে ফেলছেন উর্দু বিভাগে স্নাতক পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী। ওই শিক্ষার্থীর নাম আবু তৈয়ব হাবিলদার। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। দীর্ঘ বিরতির পর ফের তিনি পড়াশোনার সুযোগ পান। এর আগে, ডাকসু নির্বাচনে সবচেয়ে প্রবীণ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন আবু তৈয়ব।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টার দিকে ডাকসুর সংগ্রহশালাতে এসে ছবি তিনটি ছিঁড়ে ফেলে আবু তৈয়ব।
.png)
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, দুপুরে উত্তেজিত অবস্থায় ডাকসুর সংগ্রহশালায় আসেন আবু তৈয়ব হাবিলদার। এক পর্যায়ে সংগ্রহশালার দেওয়ালে ঝুলে থাকা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর একক ছবি ভেঙে ফেলেন। পরে ফ্রেম থেকে ছবি বের করে তা ছিঁড়ে ফেলেন। পরে দুই দফায় আরও দুইটি ছবি ফ্লোরে আঁচড়ে ফেলেন, ফ্রেম থেকে বের করে সেগুলোও ছিঁড়ে ফেলেন আবু তৈয়ব।
পরে আবু তৈয়ব হাবিলদারের সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা হলে তিনি বলেন, ‘আপনাদের (শিবির সমর্থিত প্যানেল) ইশতেহারে কি ছিল জিন্নাহকে আপনারা নায়ক বানাবেন? জিন্নাহ-গোলাম আযম জাতীয় খলনায়ক, তারা ডাকসুর মতো জায়গায় স্থান পেতে পারে না। জিন্নাহর মতো বাজে লোক যে স্থান দেওয়া হবে, এটা কি সাদিক কায়েমদের ইশতেহারে ছিল? জিন্নাহর ছবি যে টাঙিয়েছে, সে সাদিক কায়েম কিংবা ফরহাদ বা অন্য কেউ হোক যে লাগিয়েছে সেও ভিলেন। যারা ডাকসুতে বসে, জিন্নাহকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে তাদের বলব, তোমরা ইতিহাস পড়ো এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নাও। আজকে যেটি করেছি, এটি তাদেরকে একটি ছোট্ট বার্তা দিয়েছে। এই জিন্নাহই, বলেছিল উর্দুই হবে, পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। কোনো খলনায়কের ছবি, এই ডাকসুতে থাকতে পারে না। তাই যা মন চায়, তা করতে দেওয়া হবে না। যারা ভিলেন-মীর জাফর তাদেরকে আমরা ভিলেন-মীর জাফরই বলব। যারা ভাষা আন্দোলন-মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে যাবে, ইতিহাসে তারাই খলনায়ক।’
নিজের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রানিং শিক্ষার্থী। সবাই আমার সম্পর্কে জানে, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে সবধরনের গণতান্ত্রিক লড়াই সংগ্রামে ছিলাম। দেশের প্রেক্ষাপটে আমি নতুন করে ফের পড়ার সুযোগ পাই। শুধু আমি না, আমার মতো অনেক শিক্ষার্থীই নতুন করে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছে।’

এদিকে ভাঙচুরের পরপরই ডাকসুর সংগ্রহশালা পরিদর্শনে আসেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন শিক্ষক। এর মধ্যে ছিলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী গীতি আর নাসরিন, একাউন্টিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা ঋতুসহ আরও অনেকে।
এর আগে, গত রোববার দুপুরে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরবময় কর্মকাণ্ড বিশেষ করে ডাকসুর কর্মকাণ্ডের স্মৃতি সংরক্ষণে ডাকসুর সংগ্রহশালার সংস্কার কাজ শেষে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের সময় কিছু ছবি সরিয়ে নতুন করে স্থান পায় আরও কিছু ছবি। দাবি ওঠে, শেখ মুজিবুর রহমানের কিছু ছবি ছিল, সেগুলোর মধ্যে অনেক ছবি সংস্কার শেষে স্থান পায়নি। এছাড়া নতুন করে স্থান পায় বেশ কিছু ছবি। তবে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবির স্থান পাওয়ার বিষয়টি ব্যাপকভাবে সমালোচনার জন্ম দেয়।
এ প্রসঙ্গে পরিদর্শন শেষে ডাকসুর এমন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রস্থল এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে কি ৫২-৭১ কিছু হয়নি? আমাদের প্রশ্ন হলো, এই জিনিসগুলো সংগ্রহশালা থেকে কোথায় গেলো? এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তো অনেক ইতিহাস রয়েছে, সেই জায়গাগুলো বাদ দিয়ে যে, আমাদের ভাষা বিরুদ্ধে যে দাঁড়িয়েছে, তাকে এভাবে স্থান দেওয়া অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞান একটি কাজ। এখন তারা যেহেতু ডাকসুর পার্ট অবশ্যই তাদের জবাবদিহি করতে হবে।’
গোলাম আযমের হেনস্তার ছবি ডাকসুর সংগ্রহশালাতে টাঙালেন ছাত্র ফেডারেশনের নেতারা
শিক্ষকদের ওই দল চলে যাবার পরপরই শূন্য স্থানে ’৭৮ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের একটি ছবি স্থান দেয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ফেডারেশনের কয়েকজন নেতা। পত্রিকায় প্রকাশিত ওই ছবিটির ক্যাপশনে লিখা— ‘জনতার হাতে লাঞ্চনা: ৮১-র ১ জানুয়ারি গোলাম আযম বায়তুল মোকাররমে প্যালেস্টাইন যুদ্ধে শহীদ দুই বাংলাদেশির জানাজা পড়তে এলে উপস্থিত নামাজিরা তাকে জুতা পেটা করেন।’
এমন ছবি টাঙিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়া বলেন, ‘এটিও ইতিহাসের অংশ। এটিও জানার অধিকার সবারই রয়েছে। তারা যেমন ইচ্ছে হয়েছে, লাগিয়েছে। আমাদেরও তো অনেক কিছু ইচ্ছে হয়, আমাদের ইচ্ছে হয়েছে তাই এটি আমরা এবার লাগিয়েছি।’
সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
সোমবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন ব্যক্তিদের ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’