ঢাকা,  সোমবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

তীব্র হচ্ছে গ্যাস সঙ্কট, বাপেক্স ঘিরে শত প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৬:৪০, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তীব্র হচ্ছে গ্যাস সঙ্কট, বাপেক্স ঘিরে শত প্রশ্ন
রিগগুলো গড়ে ১০ থেকে ২৫ বছরের পুরোনো

দেশজুড়ে গ্যাস সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বাড়ছে চাপ। গৃহস্থালি পর্যায়েও চলছে নানা বিধিনিষেধ। এমন পরিস্থিতিতে দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

সংকট যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সের সক্ষমতা ও কার্যক্রমের গতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে নেই। গত এক দশকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং বিদেশি কোম্পানির তুলনায় বেশি সাফল্যের হার দেখালেও প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে রয়ে গেছে বড় ধরনের ঘাটতি। পুরোনো রিগ, দক্ষ জনবলের সংকট, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব এবং দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণে সম্ভাবনা অনুযায়ী এগোতে পারছে না সংস্থাটি।

Advertisement

বর্তমানে বাপেক্সের হাতে রয়েছে মাত্র পাঁচটি রিগ। এগুলোর কোনোটিরই আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেট নেই। রিগগুলোর বয়সও ১০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। ফলে দেশে কূপ খননের ক্ষেত্রে পুরোনো যন্ত্রপাতির ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।

অবশ্য দুটি আধুনিক অনুসন্ধান রিগ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার হর্সপাওয়ার ক্ষমতার একটি রিগ কেনার মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলছে। আর ১ হাজার ৫০০ হর্সপাওয়ার ক্ষমতার আরেকটি রিগ কেনার জন্য বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে নতুন রিগ কেনার উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে অনুসন্ধান কার্যক্রমের গতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফজলুল হক বলেন, আমাদের সাফল্যের হার বিদেশি কোম্পানির চেয়ে ভালো। কিন্তু পুরোনো রিগ, জনবল সংকট এবং প্রকল্প অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রিতা আমাদের গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। নতুন রিগ এলে এবং দক্ষ জনবল নিয়োগ হলে পরিস্থিতি বদলাবে। আমরা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হতে চাই।

তিনি জানান, বর্তমানে পাঁচটি রিগের মধ্যে দুটি ওয়ার্কওভার এবং তিনটি ড্রিলিং রিগ। তবে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা যাচ্ছে না।

বিদেশি কোম্পানির তুলনায় বাপেক্সের অনুসন্ধান সাফল্যের হার উল্লেখযোগ্য। বিদেশি কোম্পানিগুলো গড়ে প্রতি চারটি কূপ খনন করে একটিতে গ্যাসের সন্ধান পেলেও বাপেক্স দুটি কূপ খনন করে একটিতে গ্যাস পাওয়ার সাফল্য দেখিয়েছে। দেশের বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর অনেকগুলোই বাপেক্সের আবিষ্কার। গত এক দশকেও প্রতিষ্ঠানটি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারে ভূমিকা রেখেছে।

তবে সাফল্যের হার বেশি হলেও কূপ খননের সংখ্যা ও গতি নিয়ে রয়েছে বড় সীমাবদ্ধতা। দক্ষ জনবলের অভাবে বর্তমানে বাপেক্স একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুটি রিগ পরিচালনা করতে পারে। অথচ একটি ড্রিলিং সাইট পরিচালনায় ২৪ ঘণ্টা প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করতে হয়।

সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বিদেশি কোম্পানিগুলো বছরে সাত থেকে আটটি কূপ খনন করতে পারলেও বাপেক্স বছরে গড়ে একটি কূপ খনন করতে সক্ষম হচ্ছে। নতুন একজন কর্মীর প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে অন্তত চার-পাঁচটি কূপে কাজ করার অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। ফলে দ্রুত দক্ষ জনবল তৈরি করাও সম্ভব হচ্ছে না।

এর সঙ্গে রয়েছে বেতন কাঠামোর সমস্যা। বাপেক্সের কর্মীরা জাতীয় বেতন স্কেলের তুলনায় কম বেতন পান। ফলে দক্ষ ও মেধাবী কর্মীদের একটি অংশ বেশি বেতনের আশায় বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিতে চলে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সার্টিফিকেশনেও ঘাটতি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির জনবলের।

অফশোর বা সমুদ্রাঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধানেও বাপেক্সের নিজস্ব সক্ষমতা সীমিত। থ্রিডি প্রযুক্তিসম্পন্ন জরিপ পরিচালনার নিজস্ব জাহাজ না থাকায় এ ক্ষেত্রে নৌবাহিনীর সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়।

এ ছাড়া বাপেক্সের জিওলজিক্যাল ও জিওফিজিক্যাল বিভাগের সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার নিয়মিত হালনাগাদ করার প্রয়োজন থাকলেও তা পর্যাপ্তভাবে করা হচ্ছে না। আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে সিসমিক তথ্য বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধান কার্যক্রমে সক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

কূপ খননের প্রক্রিয়াটিও দীর্ঘ ও জটিল। একটি কূপ খননের আগে প্রথমে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করতে হয়। এরপর সেটি বাপেক্সের বোর্ডে অনুমোদনের জন্য ওঠে। সেখানে অনুমোদনের পর যায় পেট্রোবাংলার বোর্ডে। সেখান থেকে মন্ত্রণালয়, অর্থের সংস্থান এবং পরে পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক বৈঠক পেরিয়ে প্রস্তাবটি যায় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক)।

একনেকের অনুমোদনের পর শুরু হয় টেন্ডার প্রক্রিয়া। এরপর কূপ খননের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়। এ দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে বছরে একটি কূপ খনন করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, কূপ খননের জন্য আলাদা ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ থাকলে বছরে তিনটি পর্যন্ত কূপ খনন করা সম্ভব। এর সঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণের দীর্ঘ প্রক্রিয়াও অনুসন্ধানের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণেই দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, গ্যাস সংকট মোকাবিলায় বাপেক্সকে শক্তিশালী করা সরকারের অগ্রাধিকার। নতুন দুটি রিগ কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। জনবল নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয় পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে দক্ষ জনবল তৈরি ও প্রশিক্ষণে সময় লাগবে।

তিনি বলেন, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি নতুন গ্যাস কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগোচ্ছে। একই সঙ্গে সাড়ে চার হাজার লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক (২ডি) এবং চার হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ত্রিমাত্রিক (৩ডি) সিসমিক সার্ভে চলমান রয়েছে।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাপেক্সের বর্তমান সক্ষমতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, প্রয়োজনীয় রিগ, দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি এবং দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা ছাড়া বড় আকারের কূপ খনন কার্যক্রম বাস্তবায়ন কঠিন হবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, বাপেক্সকে আন্তর্জাতিক সক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, কারিগরি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী দক্ষ ও মেধাবী জনবলকে উচ্চ বেতনে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাপেক্সকেও প্রতিযোগিতামূলক বেতন কাঠামো তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু নতুন রিগ কিনলেই হবে না; রিগ, দক্ষ জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বিত সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।

জ্বালানি বিশ্লেষক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, গত সরকার বিদেশি কোম্পানিকে প্রাধান্য দিয়েছে, বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দেয়নি। ফলে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। দেশীয় সম্পদ অনুসন্ধানে বাপেক্সকে কেন্দ্র করে নীতি প্রণয়ন করা উচিত। সিসমিক সার্ভে ও তথ্য বিশ্লেষণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার না করলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

গত এক দশকে একাধিক আন্তর্জাতিক কোম্পানি বাংলাদেশের অনশোর ও অফশোর এলাকায় সিসমিক জরিপ ও মূল্যায়ন করেছে। এসব জরিপ ও মূল্যায়নে দেশের গ্যাস সম্ভাবনা এখনো উল্লেখযোগ্য বলে উঠে এসেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় ও সমুদ্রগর্ভের কিছু ব্লকে সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে অনুসন্ধানের ধীর গতি এবং স্থানীয় সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে এই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। একটি নরওয়েজিয়ান জরিপ দলের প্রতিবেদনে দ্রুত ড্রিলিং ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্যাসের মজুত বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে একটি মার্কিন কোম্পানির মূল্যায়নে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে ব্যয় সাশ্রয়ী ও টেকসই অনুসন্ধানের সুযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব প্রতিবেদন ও তথ্য দেশের স্বার্থে কাজে লাগিয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার সুযোগ রয়েছে।

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি বলেছেন, বিগত স্বৈরাচারের সময় সরকারি প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে রীতিমতো পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল। অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান ও আমদানিনির্ভরতার কারণে বর্তমান জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বাপেক্সকে শক্তিশালী করতে আরও দুটি নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলছে। আমরা দেশীয় সম্পদের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে বদ্ধপরিকর।

গ্যাস সংকটের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথমেই রিগ ও জনবল সংকট দূর করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতামূলক বেতন কাঠামো, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো জরুরি।

গত এক দশকে বাপেক্সের সাফল্যের হার এবং দেশের গ্যাস অনুসন্ধানে এর অবদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রতিষ্ঠানটির সীমাবদ্ধতাগুলোও এখন স্পষ্ট। নতুন রিগ কেনার পাশাপাশি দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা না করলে শুধু যন্ত্রপাতি বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে তাই বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানো এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনুসন্ধানের গতি বাড়াতে হলে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত, কারিগরি ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতাগুলো সমন্বিতভাবে দূর করার উদ্যোগই হতে পারে পরবর্তী বড় পদক্ষেপ।

ডেইলি-বাংলাদেশ//একেকে
স্পটলাইট জনপ্রিয় খবর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!