দুনিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক সম্পর্কে জেনে নিন
এটা সবসময় আপনাকে কোনো বড় গুনাহ দিয়ে আল্লাহ থেকে দূরে সরায় না। অনেক সময় শুধু ব্যস্ত রাখে। আপনি ভাবলেন, একটা চাকরি হলে জীবনটা একটু গুছিয়ে যাবে। চাকরি হলো, তারপর মনে হলো বেতনটা আরেকটু বাড়লে ভালো হতো। বেতন বাড়ল, এবার গাড়ি দরকার। গাড়ি হলো, নিজের একটা বাসার চিন্তা শুরু হলো। বাসা হলে আরও একটু বড়, আরও একটু সুন্দর, আরও একটু স্বচ্ছন্দ… একটা চাওয়া পূরণ হতে না হতেই আরেকটা সামনে এসে দাঁড়ায়।
সমস্যা এসব চাওয়ায় নয়। ভালো চাকরি, সুন্দর ঘর, স্বচ্ছলতা, পরিবারকে ভালো রাখা—এসব হারাম নয়। সমস্যাটা তখন, যখন যে জিনিসটা একসময় দু‘আ করে চেয়েছিলেন সেটা হাতে পাওয়ার পরও মনটা শান্ত হয় না; “আলহামদুলিল্লাহ” বলার আগেই মাথায় পরের চাওয়াটা ঢুকে পড়ে।
.png)
আল্লাহ বলেন, “প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে গাফিল করে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরস্থানে পৌঁছেছ।” — সূরা আত-তাকাসুর, ১০২:১–২
আয়াতটা পড়লে নিজের দিনের কথাই মনে হয় না?
সকালে উঠে ফোন, তারপর কাজ, message, call, বাজার, রান্না, deadline, সন্তান, bill, shopping, social media—দিন শেষ হয়ে যায়। আপনি হয়তো কোনো বড় হারামে ডুবে নেই। কিন্তু যোহরটা “এই কাজটা শেষ করে পড়ব” বলতে বলতে দেরি হয়ে গেল। মা ফোন করেছিলেন, ভাবলেন একটু পরে call করবেন—আর করা হলো না।
সন্তান পাশে দাঁড়িয়ে কিছু বলছিল, আপনি “হুম, বলো” বললেও চোখ ছিল screen-এ। কয়েকদিন ধরে কুরআনটা যেখানে রেখে দিয়েছিলেন, সেখানেই পড়ে আছে।
কিছুই নাটকীয়ভাবে নষ্ট হয়নি, তবু কোথাও একটা দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। মানুষ সাধারণত একদিনে আল্লাহকে ভুলে যায় না। ছোট ছোট postponement দিয়েই শুরু হয়—“কাল থেকে ঠিক করব”, “আজ খুব ক্লান্ত”, “এই projectটা শেষ হোক”, “সময় পেলেই কুরআন পড়ব।” কিন্তু “সময় পেলে” সেই সময়টা অনেক সময় আর আসে না। কারণ দুনিয়ার কাজ কখনো শেষ হয় না; একটা শেষ হলে আরেকটা অপেক্ষা করে থাকে।
আল্লাহ বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমাদের সম্পদ ও সন্তান যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল না করে।” — সূরা আল-মুনাফিকুন, ৬৩:৯
খেয়াল করুন, সম্পদ বা সন্তানকে খারাপ বলা হয়নি। এগুলো আল্লাহর নিয়ামত। সতর্ক করা হয়েছে এমন জায়গায় পৌঁছানো থেকে, যেখানে নিয়ামতই আপনাকে নিয়ামতদাতাকে ভুলিয়ে দেয়।
এখানে আবার উল্টো একটা ভুলও করা যাবে না। ইসলাম আমাদের দুনিয়া ছেড়ে দিতে বলেনি। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা দিয়ে আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেও না।” — সূরা আল-কাসাস, ২৮:৭৭
অর্থাৎ কাজ করবেন, আয় করবেন, পরিবার গড়বেন, ঘর বানাবেন, ব্যবসা করবেন, ভ্রমণ করবেন, ভালো জিনিস ব্যবহার করবেন। কিন্তু এগুলোর ভিড়ে আল্লাহ যেন আপনার জীবনের “ফাঁকা সময়ের” অংশ হয়ে না যান।
একটা প্রশ্ন খুব অস্বস্তিকর হতে পারে—আমি কোন জিনিস হারানোর ভয় সবচেয়ে বেশি পাই? চাকরি? টাকা? ব্যবসা? সম্পর্ক? মানুষের চোখে নিজের অবস্থান? নাকি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কটা দুর্বল হয়ে যাওয়ার ভয়? সমস্যা দুনিয়ার জিনিস থাকা নয়। সমস্যা হলো, এগুলো হারানোর ভয় যদি আল্লাহকে হারিয়ে ফেলার ভয়কে ছাড়িয়ে যায়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ দুনিয়া ও আখিরাতের তুলনা বোঝাতে বলেছেন, আখিরাতের তুলনায় এই দুনিয়া এমন, যেন কেউ সমুদ্রে একটি আঙুল ডুবিয়ে তুলে দেখে—আঙুলে কতটুকু পানি লেগে আছে। — সহিহ মুসলিম, ২৮৫৮
একটু ভাবুন। একদিকে সমুদ্র, আরেকদিকে আঙুলে লেগে থাকা কয়েক ফোঁটা পানি। অথচ আমাদের জীবনের কত চিন্তা সেই কয়েক ফোঁটাকে নিয়েই! কার বাড়ি বড়, কে কত আয় করছে, কে কোথায় ঘুরতে গেল, আমার career কোথায় গেল, আরেকটু হলে আমি কত সুখী হতাম… অথচ যে জীবনটা শেষ হবে না, তার জন্য আজ কী পাঠালাম—এই প্রশ্নটা খুব সহজেই দিনের শেষে বাদ পড়ে যায়।
আল্লাহ সূরা আল-হাদীদে দুনিয়ার জীবনকে খেলাধুলা, বিনোদন, সাজসজ্জা, পারস্পরিক গর্ব এবং সম্পদ-সন্তান বৃদ্ধির প্রতিযোগিতার সঙ্গে তুলনা করে এর ক্ষণস্থায়ী স্বভাব স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। — সূরা আল-হাদীদ, ৫৭:২০
এর মানে এই নয় যে হাসা বন্ধ করতে হবে, ambition ছেড়ে দিতে হবে কিংবা সুন্দর জীবন চাওয়া যাবে না। বরং এমনভাবে বাঁচতে হবে, যেন দুনিয়ার জিনিসগুলো আখিরাতের জন্য কাজে লাগে। আপনার টাকা সদকাহ ও পরিবারের হক আদায়ে কাজে লাগুক। আপনার কাজ হালাল রিযকের মাধ্যম হোক। সন্তান শুধু আপনাকে ব্যস্ত না রাখুক, আপনার জন্য সদকায়ে জারিয়াও হোক। ঘর শুধু সাজানো না হোক, সেখানে সালাত, কুরআন, ভালোবাসা ও আল্লাহর স্মরণও থাকুক।
আজ নিজের জীবনটা একটু চুপচাপ দেখুন। সালাত কি প্রতিদিন অন্য কাজের সঙ্গে জায়গার জন্য লড়ছে? কুরআন কি “সময় পেলে” খোলা হয়? মা-বাবার সঙ্গে কথা বলার জন্য কি সত্যিই সময় নেই, নাকি অন্য জিনিসগুলো সবসময় আগে চলে আসে? সন্তান আপনার কাছ থেকে শুধু জিনিস পাচ্ছে, নাকি আপনাকেও পাচ্ছে? আর দিনের এত ব্যস্ততার মধ্যে আল্লাহর সঙ্গে আপনার একান্ত সময়টা কোথায়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর perfect হওয়া দরকার নেই। শুধু সত্য হওয়া দরকার। কারণ একদিন কাজ থামবে, ফোন আর বাজবে না, যে target নিয়ে এত চিন্তা করেছিলেন সেটাও অন্য কারও হাতে চলে যাবে। যে জিনিসগুলো নিয়ে আজ “এরপর কী?”
ভাবছেন, সেগুলোর অনেক কিছুই তখন কোনো অর্থ রাখবে না। কিন্তু আল্লাহর কাছে আগে যা পাঠিয়েছেন, সেটা থেকে যাবে।
তাই দুনিয়াকে ছেড়ে দেওয়ার দরকার নেই। দুনিয়াকে তার জায়গাতেই রাখুন। হালালভাবে উপভোগ করুন, নিয়ামতের শুকরিয়া করুন, ভবিষ্যতের জন্য চেষ্টা করুন। শুধু এমন যেন না হয়—দুনিয়ার সবকিছুর জন্য সময় হলো, রবের জন্যই সময় হলো না।
আল্লাহ আমাদের এমন হৃদয় দিন, যা নিয়ামত পেয়ে তাঁকে ভুলে যায় না; বরং আরও বেশি তাঁর দিকে ফিরে আসে। আমিন।