ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ধর্ম ]

‘দানে বিপদ কাটে’

মোহাম্মদ মামুন কবীর মোহাম্মদ মামুন কবীর
প্রকাশিত: ১৮:৩৯, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
‘দানে বিপদ কাটে’
এআই দিয়ে তৈরি করা ছবি।

মানুষের জীবনে বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট ও নানা ধরনের সংকট আসতেই পারে। কখনো অসুস্থতা, কখনো আর্থিক দুরবস্থা, আবার কখনো দুর্ঘটনা কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো পরিস্থিতি মানুষকে বিপর্যস্ত করে তোলে। ইসলাম এসব বিপদের সময়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি নেক আমল, দোয়া, তওবা ও দান-সদকার প্রতি উৎসাহ দিয়েছে।

ইসলামি শিক্ষায় দান বা সদকা শুধু অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যম নয়, বরং এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল। কোরআন ও হাদিসে দানের মর্যাদা এবং এর বহুমুখী কল্যাণের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা দান মানুষের জন্য দুনিয়ায় কল্যাণের কারণ হতে পারে এবং আখিরাতে নাজাতের পথ সুগম করতে পারে।

দানের প্রতি কোরআনের আহ্বান

Advertisement

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা দান-সদকার প্রতি বারবার উৎসাহ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,

“তোমরা যা কিছু কল্যাণের জন্য ব্যয় করো, তা তোমাদের নিজেদের জন্যই। আর তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যয় করো না। তোমরা যে কোনো কল্যাণ ব্যয় করবে, তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদের দেওয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।”

(সুরা আল-বাকারা, ২৭২)

অর্থাৎ আল্লাহর পথে ব্যয় করা কখনো বৃথা যায় না। মানুষ হয়তো মনে করতে পারে, দান করলে তার সম্পদ কমে যাচ্ছে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করা সম্পদের প্রকৃত ক্ষতি নয়; বরং এর প্রতিদান আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত থাকে।

দান সম্পদ কমায় না

রাসুলুল্লাহ হযরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন,

“সদকা সম্পদ কমায় না।”

(সহিহ মুসলিম)

এই হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ হিসাবে কাউকে অর্থ দিলে নিজের অর্থ কমে যায়। কিন্তু আল্লাহর পথে দেওয়া সম্পদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। সদকার মাধ্যমে মানুষের সম্পদে বরকত আসে, হৃদয়ে প্রশান্তি আসে এবং আল্লাহর রহমত লাভের সুযোগ তৈরি হয়।

তাই অভাবের ভয় দেখিয়ে দান থেকে বিরত থাকা একজন মুমিনের জন্য সমীচীন নয়। বরং সামর্থ্য অনুযায়ী দান করা উচিত।

বিপদে সদকার গুরুত্ব

বিপদ-আপদ থেকে মুক্তির জন্য মানুষ নানা উপায় খোঁজে। ইসলামি শিক্ষায় দোয়া ও ইবাদতের পাশাপাশি সদকাকেও গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ হযরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন,

“তোমরা সদকার মাধ্যমে তোমাদের অসুস্থদের চিকিৎসা করো।”

এই বর্ণনাটি দানের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও সাহায্য লাভের আশাবাদকে তুলে ধরে। তবে এটিকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে নয়, বরং চিকিৎসার পাশাপাশি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নেক আমল হিসেবে বুঝতে হবে।

অর্থাৎ কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণ করবে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং একই সঙ্গে আল্লাহর কাছে দোয়া করবে ও সামর্থ্য অনুযায়ী সদকা করবে।

গোপনে দানের মর্যাদা

দান করার ক্ষেত্রে লোক দেখানো থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে দান করা হয়, তার মর্যাদা অনেক বেশি।

রাসুলুল্লাহ হযরত মোহাম্মদ (সা.) সাত শ্রেণির মানুষের কথা বলেছেন, যাদের কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার আরশের ছায়া দেবেন। তাদের মধ্যে একজন হলেন সেই ব্যক্তি, যে এমন গোপনে সদকা করে যে তার বাঁ হাতও জানতে পারে না তার ডান হাত কী দান করেছে।

(সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, দানের ক্ষেত্রে নিয়ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষকে দেখানো বা প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করাই একজন মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

সামান্য দানও মূল্যবান

দান করতে হলে অনেক অর্থের মালিক হতে হবে, এমন নয়। ইসলাম সামর্থ্য অনুযায়ী দান করতে উৎসাহ দিয়েছে। একটি খেজুরের অর্ধেক দান করেও মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে, যদি তা হয় হালাল উপার্জন থেকে এবং আন্তরিকতার সঙ্গে।

রাসুলুল্লাহ হযরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন,

“জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচো, যদিও অর্ধেক খেজুর দান করার মাধ্যমে হয়।”

(সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

তাই সামর্থ্য কম হলেও দানকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। একজন মানুষ হয়তো লাখ টাকা দিতে পারবেন না, কিন্তু একজন ক্ষুধার্তকে খাবার দিতে পারেন, অসুস্থ ব্যক্তির ওষুধ কিনে দিতে পারেন কিংবা বিপদে পড়া কাউকে সামান্য অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে পারেন। এসবও সদকার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

দান শুধু অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়

সদকা মানেই শুধু টাকা-পয়সা দেওয়া নয়। মানুষের উপকার করাও সদকা। রাসুলুল্লাহ হযরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “প্রত্যেক ভালো কাজই সদকা।”

(সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

তাই একজন অসহায় ব্যক্তিকে সহযোগিতা করা, পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া, ভালো কথা বলা কিংবা কারও প্রয়োজন মেটাতে সহযোগিতা করাও সওয়াবের কাজ হতে পারে।

দানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা

দান মানুষের মধ্যে মানবিকতা ও সহমর্মিতা তৈরি করে। সমাজের ধনী ও সামর্থ্যবান মানুষের সম্পদ থেকে দরিদ্র মানুষের কাছে সহযোগিতা পৌঁছে যায়। ফলে সামাজিক বৈষম্য কিছুটা কমে এবং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ে।

কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,

“তোমরা যা ভালোবাসো, তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পূর্ণ নেকি লাভ করতে পারবে না।”

(সুরা আলে ইমরান, ৯২)

এই আয়াত মুসলমানকে প্রিয় সম্পদ থেকেও আল্লাহর পথে ব্যয় করার শিক্ষা দেয়।

বিপদ এলে কী করা উচিত

কোনো বিপদ বা সংকট দেখা দিলে একজন মুসলমানের উচিত প্রথমে আল্লাহর ওপর ভরসা করা। পাশাপাশি নিজের ভুলের জন্য তওবা করা, নামাজ ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সদকা করা।

তবে দানকে কোনো যান্ত্রিক নিয়ম হিসেবে দেখা ঠিক নয়। যেমন, ‘আমি টাকা দিলেই নিশ্চিতভাবে এই বিপদ চলে যাবে’ এমন নিশ্চয়তা ইসলাম দেয় না। বরং একজন মুমিন বিশ্বাস করবে, আল্লাহ চাইলে সদকা ও অন্যান্য নেক আমলের মাধ্যমে বিপদ দূর করতে পারেন।

কারণ সবকিছুর ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতে।

দান হোক গোপনে, নিয়ত হোক আল্লাহর জন্য

আজকের সময়ে দান করার পর ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করার প্রবণতা দেখা যায়। মানুষের উৎসাহ সৃষ্টি করার জন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা উপকারী হতে পারে। তবে নিজের প্রশংসা, পরিচিতি বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দান করা থেকে সতর্ক থাকা জরুরি।

আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য দানের ক্ষেত্রে নিয়ত বিশুদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। একজন মুমিন এমনভাবে দান করতে পারেন, যাতে তার ডান হাত কী দিয়েছে, বাঁ হাতও তা জানতে না পারে।

বিপদ-আপদ মানুষের জীবনের পরীক্ষা। কোনো বিপদ এলে হতাশ না হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া উচিত। নামাজ, দোয়া, তওবা, ধৈর্য ও নেক আমলের পাশাপাশি দান-সদকা করা একজন মুমিনের জন্য কল্যাণের পথ খুলে দিতে পারে।

দান শুধু একজন অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটায় না, দাতার নিজের জীবনেও বরকত ও প্রশান্তির কারণ হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা কোনো নেক আমলই তাঁর কাছে হারিয়ে যায় না।

তাই বিপদ আসার অপেক্ষা না করে সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত দান করা উচিত। হয়তো আপনার সামান্য একটি দান কোনো অসহায় মানুষের জীবন বদলে দেবে। আর আল্লাহ চাইলে সেই দানই আপনার জীবনে রহমত ও কল্যাণের দরজা খুলে দিতে পারে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: ইসলাম ধর্ম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!