ঢাকা,  শুক্রবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ মতামত ]

অশনিসংকেত!- সমাজে একা থাকার প্রবণতা বাড়ছে

এস এম মুকুল
প্রকাশিত: ১০:৫২, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অশনিসংকেত!- সমাজে একা থাকার প্রবণতা বাড়ছে
বিয়ের প্রতি অনাগ্রহ বাড়ার পেছনে বেশকিছু কারণ তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা। তার মধ্যে অন্যতম হলো, লিভ টুগেদার ও দুজনের সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্কের হার বৃদ্ধি। এর ফলে অনেকেই দাম্পত্য সম্পর্কে নানা দায়-দায়িত্ব কিংবা হিসেবে নিকেশে জড়াতে অনাগ্রহী হয়ে উঠছেন।

* দেশেই তরুণ-তরুণীরা বিয়েকেন্দ্রিক সাংসারিক চাপ ও দায়িত্ব সামলাতে অনাগ্রহী হয়ে উঠছেন।
* ২০৩০ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ নারীই অবিবাহিত-নিঃসন্তান থাকবেন
* অবিবাহিত পুরুষের হার অবিবাহিত নারীর চেয়ে ১৩% বেশি

দেশে একা থাকার প্রবণতা বাড়ছে। বিয়ের প্রতি অনিহা বা অনাগ্রহ বাড়ছে। ঘরে ঘরে বিয়ে না হওয়া ছেলে ও মেয়ের সংখ্যা বাড়ছে। একইসাথে বাড়ছে ডিভোর্সের মতো ঘটনা। এই অবস্থা সমাজে এক নীরব মহামারির সৃষ্টি করবে। সমাজে, পরিবারে নানা ধরণের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। 

Advertisement

যদিও দেশে বিয়ের হার বেড়েছে। আবার বেড়েছে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদও। আর বিবাহবিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় কারণ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক এবং দাম্পত্যজীবন পালনে অক্ষমতা  বা বনিবনার অভাবকে দায়ী করা হচ্ছে। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নতুন এক জরিপ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটির নাম বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২২। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে শহরের চেয়ে গ্রাম এলাকায় বিয়ে বেশি হচ্ছে। তালাক ও দাম্পত্য বিচ্ছেদও গ্রাম এলাকায় বেশি। প্রতি ১০ হাজারে গ্রামে ১১টি এবং শহরে ৯টি তালাকের ঘটনা ঘটছে। তবে সার্বিকভাবে দেশে বিয়ের হার অনেকটা কমেছে। আর বিয়ের গড় বয়স কিছুটা বেড়েছে। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩-এর ফলাফল প্রকাশ করে। এখানে বলা হয়েছে, রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে সংসার ভাঙছে ৫০টির বেশি। ২০২৩ সালে ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৭ হাজার ৩০৬টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৬ হাজার ৩৯৯টি বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে। 

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২০ সালে করোনা মহামারির পরপরই বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়ে আগের থেকেও বেশি। নারীরা কখনও কখনও সংসারে নিজের মর্যাদা না পেয়ে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। অপরদিকে দেনমোহরের লেনদেনে নিপীড়িত হয়েও পুরুষরা বিবাহ বিচ্ছেদের দিকে ঝুঁকছেন বলে মনে করা হয়।

 এই অবস্থা কেবল বাংলাদেশে নয়। জানা গেছে, চীনে তরুণ প্রজন্ম বিয়েতে আগ্রহ হারাচ্ছে। কারণ তরুণীরা আত্মনির্ভরশীল হওয়ার ব্যাপারে বেশি উৎসাহী। তারা বিয়েটাকে অনেক ক্ষেত্রে বোঝা মনে করছেন এবং নির্ভার থাকতেই বেশি পছন্দ করছেন। তারা বিয়েটাকে অতিরিক্ত দায়বদ্ধতা মনে করছেন। এমনকি স্বাধীনতা কমে যাওয়ার শঙ্কা থেকেও তারা আগ্রহ হারাচ্ছেন। এসব নানান কারণে এক দিকে বিয়ের হার যেমন কমছে, অন্যদিকে বিবাহ বিচ্ছেদের হার বাড়ছে।

সমাজ মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, বন্ধু, পরিচিত মানুষ ও স্বজনদের মধ্যে বিচ্ছেদের তিক্ত অভিজ্ঞতা অথবা প্রতিদিন ডিভোর্সের খবর, স্বামী-স্ত্রীর ভুল বোঝাবুঝি, অবিশ্বাস, এমনকি হত্যা-আত্মহত্যার খবরগুলো তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে। ব্যক্তির মধ্যে আচরণগত একটা অস্থিরতা বা ক্ষত তৈরি হয়, যা তাকে নেতিবাচকতার দিকে তাড়িত করে। 

বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, জাপানে রেকর্ডসংখ্যক তরুণ-তরুণী জানিয়েছেন- তারা বিয়ে করবেন না। তাদের সবার বয়স ১৮ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে। ২০২২ সালের ওই সমীক্ষায় বিয়েতে অনীহা প্রকাশকারীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ছিলো। মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ বিয়ে করতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। কেন বিয়েতে অনীহা তাদের? 

উত্তরে তারা বলেছেন, তারা নিজেদের 'সিঙ্গেল' জীবন উপভোগ করতে চান। 'ব্যক্তি স্বাধীনতা'য় ছাড় দিতে চান না। পেশাগত জীবনে উন্নতি করতে চান। জাপানের ওয়ার্কোহলিক তরুণ-তরুণীরা বিয়ে করে সংসার করার চেয়েও নিজেদের পেশাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

শুধু কি জাপানেই বিয়ের প্রতি অনীহা? 
বিশ্বের অনেক দেশেই তরুণ-তরুণীরা বিয়েকেন্দ্রিক সাংসারিক চাপ ও দায়িত্ব সামলাতে অনাগ্রহী হয়ে উঠছেন। পাশাপাশি মানিয়ে চলা ও পরস্পরকে বোঝার ক্ষেত্রে ধৈর্য্যও কমে গেছে। প্রশ্ন উঠেছে, কেন ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বিয়ের প্রতি আগ্রহ কমছে এবং বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যেই কেন তালাক হয়ে যাচ্ছে? 

বাংলাদেশেও এই প্রবণতা বাড়ছে, যা সামাজিকভাবে বিষফোড়ায় পরিণত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। পত্রিকার কিছু শিরোণাম পড়লে এর ভয়াবহতার চিত্র পরিলক্ষণ করা যায়- 
‘২০৩০ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ নারীই অবিবাহিত-নিঃসন্তান থাকবেন, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ঢাকা মেইল। 

বাকি শিরোণামগুলো পড়ুন, তারপর মূল গল্পটি পড়ুন- তাহলে সমাজের বর্তমান এবং ভবিষ্যত অবস্থা সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবেন। আরো কিছু শিরোণাম :-

‘অবিবাহিত পুরুষের হার অবিবাহিত নারীর চেয়ে ১৩% বেশি, ১১ জুন ২০২৪, প্রথম আলো’, 
‘ অবিবাহিত নারী পরিবারপ্রধান পাঁচ বছরে বেড়েছে ছয় গুণ,
৩০ মার্চ ২০২৪, প্রথম আলো’, ‘অবিবাহিত নারী বেশি সিলেটে, ১১ ফেব্রæয়ারি ২০২৪, কালবেলা’।

আমরা দেখতে পাই বর্তমানে নারীরা নিজের জীবন নিয়ে বেশ সচেতন বলা যায়। সংসারের পরিবর্তে তারা ক্যারিয়ারের দিকে বেশি ফোকাস করছেন। বেশিরভাগ নারীর ক্ষেত্রে এখন বিবাহিত জীবন একমাত্র কাম্য নয়। কীভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, স্বাধীনভাবে বাঁচা যায়, নিজের স্বপ্ন পূরণ করা যায় তা নারীদের প্রাথমিক লক্ষ্য হয়েছে।  

তবে ক্যারিয়ারের প্রতি বাড়তি নজর এই প্রজন্মকে অন্য দিকে টেনে নিতে পারে। এমনটাই বলছে গবেষণা। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ নারীই অবিবাহিত থাকবেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৭০ সালে যেখানে বয়স ২০ এর কোটায় পৌঁছালেই বেশিরভাগ মানুষ বিয়ে পিঁড়িতে বসতেন। বর্তমানে, পুরুষদের ক্ষেত্রে সেটি ৩০ বছর এবং নারীদের ক্ষেত্রে ২৮ বছরে ঠেকেছে। বাস্তব অবস্থা তারচেওে ভিন্ন।  

বিয়ের প্রতি অনাগ্রহ বাড়ার পেছনে বেশকিছু কারণ তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা। তার মধ্যে অন্যতম হলো, লিভ টুগেদার ও দুজনের সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্কের হার বৃদ্ধি। এর ফলে অনেকেই দাম্পত্য সম্পর্কে নানা দায়-দায়িত্ব কিংবা হিসেবে নিকেশে জড়াতে অনাগ্রহী হয়ে উঠছেন। 

যাই হোক না কেন- এ অবস্থা সমাজের জন্য, পরিবারের জন্য, ব্যক্তি জীবনের জন্য এমন কি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হতে পারেনা। জীবনের নিগুঢ় বাস্তবতা বুঝার জন্য আমরা নিচের গল্পটি পড়তে পারি। 

‘এখন আর কোনো যুবকই আমার কাছে প্রস্তাব নিয়ে আসে না। না লম্বা, না খাটো; না ধনী, না গরিব- কেউ না। 
বাবার গৃহে আমি ছিলাম খুবই আদুরে মেয়ে। আমার কোনো চাওয়াই অপূর্ণ থাকত না। পাঁচ ভাইয়ের একমাত্র বোন বলে আমার স্নেহ-ভালোবাসা ও আদর-যতেœ কোনো কমতি ছিল না। সবাই আমার প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রাখত। 

আমার সব আবদার পরিবারের সবাই বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিত। আমি গভীরভাবে পড়াশোনায় মনোযোগ দিলাম এবং মাধ্যমিক স্তরে উত্তীর্ণ হলাম।

একদিন মায়ের দেওয়া একটি সংবাদে প্রথমবারের মতো কাঁপুনি ধরল আমার হৃদয়ে। তিনি বলেন, অমুক তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে। আমি আশ্চর্য হলাম, বিরক্ত হলাম। একে একে অসংখ্য বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলাম। 

আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পণ করলাম। এদিকে প্রস্তাব আসার এই ধারাও অব্যাহত থাকল। আমি সর্বদা একই প্রশ্ন করতাম—ছেলের যোগ্যতা কী? তার মধ্যে কী কী গুণ আছে? বিচিত্র সব পেশার যুবক এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলেরা আমার পরিবারের কাছে সম্বন্ধ পাঠাত। 

একবার আবদুল্লাহ নামের অসাধারণ এক যুবক বিয়ের প্রস্তাব দিল। সে জ্ঞানে-গুণে অন্য অনেকের চেয়ে এগিয়ে ছিল। তবু আমি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলাম। কারণ আমি সুন্দরী, আমি মেধাবী; আমার একটা অবস্থান আছে। 

পড়ালেখা শেষে যখন কর্মজীবনে পা রাখলাম, সম্বন্ধ আসার ধারা বেড়ে গেল। তবে এতে কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেল। যারা প্রস্তাব নিয়ে আসছে, তাদের বয়স খানিকটা বেশি—ত্রিশের আশপাশে!
সময় গড়াতে লাগল। এরই মধ্যে এমন একটি প্রস্তাব এলো, যা আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিল। 

এক ব্যক্তি প্রস্তাব নিয়ে আসে যে সে তার স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে এবং তার একটি সন্তান আছে। এমন প্রস্তাব পেয়ে প্রথমে একটা ধাক্কা খেলাম। পরক্ষণেই বললাম, বেচারা বোধ হয় আমার অবস্থা জানে না, আমি কে। তার জন্য আমার একধরনের করুণা হলো।

দিন যায়, সপ্তাহ গড়ায়, মাস ফুরায়; এদিকে আমার বয়সও বাড়তে থাকে। কিন্তু সেদিকে আমার কোনো খেয়াল নেই। আমি আমার কাজে মগ্ন। বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একদিকে আমার দৈহিক লাবণ্য ও কমনীয়তা কমতে থাকে, অন্যদিকে বাড়তে থাকে আমার কাজের চাপ ও দায়িত্বের পরিধি। 

আমি সবার বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে থাকি আর আবদুল্লাহর মতো এক তরুণের প্রস্তাব পাওয়ার আশায় অধীর আগ্রহে প্রহর গুনতে থাকি। কিন্তু আমার আশার গুড়ে বালি! 

খবর নিয়ে জানলাম, আবদুল্লাহ এখন চার সন্তানের বাবা আর আমি এখনো কুমারী বুড়ি। আমার বয়স এখন ৩০ ছুঁই ছুঁই। ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে জীবন! এইতো আমার বান্ধবী ফাতিমা, সে এখন চার সন্তানের মা। আরেক বান্ধবীর কোলজুড়ে চাঁদের মতো ফুটফুটে দুটি মেয়ে। আরেক বান্ধবী স্বামীকে নিয়ে কী সুখে দিন কাটাচ্ছে! অথচ তাদের আর্থিক অবস্থা নিতান্তই সাধারণ। আর আমি...!

আমি নির্ঝঞ্ঝাট আরামে দিনাতিপাত করছি। আসলে আমি আত্মপ্রবঞ্চনায় ভুগছি; নিজের সঙ্গে মিথ্যা বলছি। সত্যি কি আমি সুখে আছি? জনতার ভিড়ে এক অদ্ভুত নির্জনতা আমাকে জেঁকে ধরেছে। 

এদিকে আমার চারপাশে বিচিত্র সব ফিতনা ও পরীক্ষা এসে ভিড় জমাচ্ছে, আমাকে গ্রাস করে ফেলতে চাইছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমাকে অশ্লীল ও নির্লজ্জ কাজ থেকে হিফাজত করেছেন। এরই মধ্যে আমার মেধা ও কঠিন অধ্যবসায় কর্মক্ষেত্রে আমাকে পৌঁছে দিয়েছে সাফল্যের সর্বোচ্চ স্তরে। কিন্তু এই সফলতা আমার কাছে অর্থহীন মনে হয়। 

একদিন আমি অফিস থেকে ফিরলাম। বাসায় ফিরে দেখি, মা আমার উদ্দেশে একটি চিরকুট লিখে আমার বালিশের ওপর রেখে দিয়েছেন। তাতে লেখা, ‘মেয়ে আমার, অমুক তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে। সে ভালো চাকরি করে, আর তার বয়সও কম। আশা করি তুমি সায় দেবে; যদিও তার অন্য এক স্ত্রী ও ছয়জন সন্তান রয়েছে। দিন কিন্তু চলে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করে আমাকে জানাও।’

আমি চিরকুটটা গভীর মনোযোগে পড়লাম এবং রাগে ফেটে পড়লাম। আমি মাথার চুলের দিকে তাকালাম। মাঝে মাঝে সাদা হয়ে ওঠা চুলগুলো লুকাতে এরই মধ্যে আমি কলপ লাগাতে শুরু করেছি। ভাবতে ভাবতে কান্নায় ভেঙে পড়লাম আমি। শেষ পর্যন্ত এমন একজন লোকও আমাকে প্রস্তাব দিল? 

আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। রেগেমেগে সেই সন্ধ্যায় আমি বাবার কাছে গেলাম। তাঁকে বললাম, কিভাবে আপনারা এমন একজন মানুষের প্রস্তাব গ্রহণ করলেন, যার ছয়টা সন্তান আছে? বাবার জবাব আমার অন্তরে ধারালো ছুরির মতো বিদ্ধ হলো। 

তিনি বলেন, ‘কয়েক মাসে আমাদের কাছে এমন বিবাহিতরা ছাড়া অন্য কেউ প্রস্তাব নিয়ে আসেনি। আমার ভয় হয়, কিছুদিন পর হয়তো এমন সময় আসবে, যখন প্রস্তাব আসাই বন্ধ হয়ে যাবে। 

মেয়ে আমার, মুরব্বিরা একটা কথা বলতেন, মেয়েরা গোলাপের মতো-ছিঁড়তে দেরি করলে পাপড়িগুলো ক্রমে শুকিয়ে আসে। 

  • আমার মনে হয়, তুমিও সেই পর্যায়ে পৌঁছে গেছ। মেয়ে, তোমার কাছে তো শত শত প্রস্তাব এসেছিল, তুমি এক এক করে সব প্রত্যাখ্যান করেছ। ও বেশি লম্বা, সে বেশি খাটো, ওর এই দোষ, অমুকের এই সমস্যা। আর এখন? এমন সময় এসেছে, তুমি আর কাউকেই পাচ্ছ না!’

অতীত স্মৃতিগুলো আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আব্বু, আপনি যদি তখন জীবনের এই বাস্তবতা বোঝাতেন, আমি এখন আপনাকে তিরস্কার করতাম না। 

হায়, আপনি যদি এর জন্য আমাকে প্রহার করতেন, আমার এই পরিণতি হতো না। এসব বলতে বলতে আমি কান্নায় ভেঙে পড়লাম। এখন আর কোনো যুবকই আমার কাছে প্রস্তাব নিয়ে আসে না। না লম্বা, না খাটো; না ধনী, না গরিব-কেউ না।’ 

গল্পটি কেবলই গল্প নয়- জীবনকে তাচ্ছিল্য বা অবজ্ঞা করার নিষ্ঠুরতম বাস্তবতা। কারণ জীবনে সুখের জন্য বেশি কিছু লাগেনা। দুজন মানুষ- একটা সংসার = একটা সংগ্রামি জীবন ও কিছু সুখ, দুঃখ। 

জীবনের প্রতিটা ধাপ উপভোগ করা খুব খুব জরুরি। আসুন জীবন উপভোগের আরেকটি গল্প পড়ি।

মেক্সিকো ভ্রমণে গেছেন এক পর্যটক। ঘুরতে ঘুরতে তিনি গেলেন সমুদ্রের পাড়ে। সেখানে জেলেদের মাছ ধরা দেখে তিনি দারুণ মজা পেলেন। তাদের কাছে গিয়ে পর্যটক বললেন, "আচ্ছা, প্রতিদিন মাছ ধরতে আপনাদের কত সময় লাগে?”
“বেশিক্ষণ না!” জেলেদের ঝটপট জবাব।

“তাহলে আপনারা বেশি সময় ধরে আরো বেশি মাছ ধরেন না কেন?” পর্যটক প্রশ্ন করেন।

"আমরা যে মাছে ধরি তাতে আমাদের প্রয়োজন মিটে যায়।" জেলেরা জাল টেনে তুলতে তুলতে বলেন।

“তাহলে মাছ ধরার পর বাকি সময়টা আপনারা কী করেন?” পর্যটক জানতে চান।

জেলেরা উত্তর দেয়, “আমরা ঘুমাই, বাচ্চাদের সাথে খেলা করি, স্ত্রীর সাথে খাই, সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেই, মজা করি, হাসি, গলা ছেড়ে গান গাই, জীবনকে উপভোগ করি।"

পর্যটক তাদেরকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, “আমি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছি। আমি আপনাদেরকে বুদ্ধি দিয়ে সাহায্য করতে পারি। আপনারা আরও বেশি সময় নিয়ে মাছ ধরবেন, বাড়তি মাছগুলো বিক্রি করে মাছ ধরার বড় নৌকা কিনবেন।"

“তারপর?” জেলেদের প্রশ্ন।

“আপনারা বড় নৌকার সাহায্যে আগের চেয়ে অনেক বেশি মাছ ধরবেন, বেশি আয় করবেন। সেটা দিয়ে আরও বড় কয়েকটা নৌকা কিনবেন। একসময় মাছ ধরার নৌবহর বানিয়ে ফেলবেন। তখন মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীদের কাছে মাছ বিক্রি না করে সরাসরি মাছ প্রসেসিং ফ্যাক্টরির সাথে বেচাকেনা করবেন। 

এক সময় নিজেরাই মাছ প্রসেসিং ফ্যাক্টরি খুলে বসবেন। তারপর অনেক ধনী হয়ে গ্রাম ছেড়ে মেক্সিকোর বড় কোনো শহর, আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেস বা নিউ ইয়র্কে চলে যাবেন। সেখান থেকে আপনারা মেগা প্রজেক্ট চালু করবেন।" পর্যটক বলতে থাকেন।

“এসব করতে আমাদের কত সময় লাগবে?” জেলেরা জানতে চায়।

“কুড়ি পঁচিশ বছর তো লাগবেই।” একটু ভেবে জবাব দেন পর্যটক।
"তারপর?" জেলেদের চোখে কৌতূহল।

লোকটা হেসে বলেন, “ব্যবসায় যখন আরও বড় হবে তখন আপনারা শেয়ার বাজারে যাবেন, মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার আয় করবেন।”

“মিলিয়র ডলার! ধরুন পেলাম মিলিয়ন ডলার। কিন্তু, তারপর?” জেলেরা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

পর্যটক তখন কিছুটা বিরক্তি নিয়ে জবাব দেন, “আপনারা তখন অবসরে যাবেন। শান্ত গ্রামে ফিরে এসে সমুদ্রের ধারে ঘুমাবেন, বাচ্চাদের সাথে খেলা করবেন, বৌয়ের সাথে খাবার খাবেন, সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিবেন, মজা করবেন।"

পর্যটকের এসব কথা শুনে জেলেরা উদাসভাবে জবাব দেয়, “সেই কাজটাই তো আমরা এখন করছি! তাহলে বিশ পঁচিশ বছরের অপেক্ষা আর কষ্ট করতে যাব কেন?"

লেখক : সমাজ, কৃষি-অর্থনীতি বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
[email protected]

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!