মানুষকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে AI বলবে-পৃথিবী শুধু আপনার নয়!
কিছুদিন ধরে পৃথিবীর গণমাধ্যমে এমন কিছু খবর প্রকাশিত হচ্ছে, যা শুধু প্রযুক্তিবিদদের নয়, আমাদের প্রত্যেকের ঘুম নষ্ট করার মতো। AI তৈরি করা গবেষকদেরই কেউ কেউ চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। কারণ তাঁরা AI-কে ভয় পাচ্ছেন বলে নয়, বরং তাঁরা ভয় পাচ্ছেন মানুষের হাতে থাকা ক্ষমতাকে।
যে প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে অভাবনীয়ভাবে বদলে দিতে পারে, সেটিই যদি মানুষের লোভ, প্রতিযোগিতা, যুদ্ধ এবং ক্ষমতার রাজনীতির হাতে পড়ে, তাহলে বিপদটা AI নয়, মানুষ নিজেই।
এখানেই আমার প্রশ্নটি একটু অন্যরকম।
আমরা কি AI-কে ভয় পাওয়ার বদলে AI-কে এমন একটি শক্তি হিসেবে তৈরি করতে পারি, যে শক্তি মানুষের ওপর নয়, মানুষের অপব্যবহারের ওপর নজর রাখবে?
.png)
মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রযুক্তির অভাব নয়। সমস্যা হলো ক্ষমতার অপব্যবহার। পৃথিবীতে খাদ্য আছে, অথচ মানুষ না খেয়ে থাকে। সম্পদ আছে, অথচ কোটি কোটি মানুষ দরিদ্র। আইন আছে, অথচ আইন ভাঙার লোক ক্ষমতাবান হলে অনেক সময় আইন তার কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান আছে, অথচ দুর্নীতির সঙ্গে কখনও কখনও প্রতিষ্ঠানই জড়িয়ে যায়।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষ যদি মানুষকে নিরপেক্ষভাবে বিচার করতে না পারে, সেখানে একটি উন্নত AI কি নিরপেক্ষ প্রহরী হতে পারে?
ধরা যাক, একটি দেশের সব সরকারি ক্রয়, টেন্ডার, নিয়োগ, বাজেট, কর, ব্যাংকিং লেনদেন এবং সরকারি প্রকল্পের তথ্য AI বিশ্লেষণ করছে। কোনো মন্ত্রী, কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী বা রাজনৈতিক দলের নাম দেখে নয়, শুধু তথ্যের সম্পর্ক, অস্বাভাবিক লেনদেন, স্বার্থের সংঘাত এবং নিয়মের ব্যতিক্রম দেখে AI সতর্ক সংকেত দিচ্ছে।
একজন মন্ত্রী নিজের আত্মীয়ের প্রতিষ্ঠানের জন্য নিয়ম বদলাতে চাইলে AI বলতে পারে, “এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত রয়েছে।”
একজন কর্মকর্তা একই ধরনের কয়েকটি টেন্ডারে বারবার একই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সিদ্ধান্ত দিলে AI বলতে পারে, “এখানে অস্বাভাবিক প্যাটার্ন পাওয়া গেছে।”
কোনো সরকারি প্রকল্পের ব্যয় বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে AI প্রশ্ন তুলতে পারে। কোনো আইন এমনভাবে লেখা হলে, যার সুবিধা একটি বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য অস্বাভাবিকভাবে বেশি, AI তার সম্ভাব্য প্রভাব দেখাতে পারে।
এমনকি একজন সাধারণ নাগরিকও জানতে পারেন, তাঁর দেশের অর্থ কোথায় যাচ্ছে।
এখানে AI বিচারক নয়। AI শাস্তিদাতা নয়। AI সরকারও নয়। AI হবে তথ্যের প্রহরী, যে ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের জন্য একই মানদণ্ডে প্রশ্ন করবে।
এই ধারণাটি কল্পনা নয়। সরকারি খাতে AI দিয়ে পুলিশিং, প্রতারণা শনাক্তকরণ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সহায়তার সম্ভাবনা নিয়ে ইতিমধ্যে ব্যাপক গবেষণা হচ্ছে। তবে গবেষণাও সতর্ক করছে যে ভুল নকশা বা পক্ষপাতপূর্ণ তথ্যের ওপর তৈরি AI বৈষম্য ও অন্যায়কে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ AI নিজে ন্যায়বিচারের গ্যারান্টি নয়। তাকে ন্যায়বিচারের কাঠামোর মধ্যে তৈরি করতে হবে।
তাহলে আরও বড় প্রশ্ন আসে।
AI যদি দুর্নীতি শনাক্ত করতে পারে, তাহলে দুর্নীতিবাজ মানুষ কেন AI-কে নিয়ন্ত্রণ করবে?
AI যদি রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় শনাক্ত করতে পারে, তাহলে সেই AI-এর রিপোর্ট মুছে ফেলার ক্ষমতা কোনো মন্ত্রী বা কর্মকর্তার হাতে থাকবে কেন?
AI যদি দেখতে পারে একটি আইন কারা লাভবান হবে এবং কারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাহলে আইন প্রণয়নের আগে সেই বিশ্লেষণ জনগণের সামনে প্রকাশ করা হবে না কেন?
AI যদি দেখতে পারে একটি নির্বাচনী প্রচারণায় মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তাহলে মানুষের ভোটকে প্রভাবিত করার আগে নাগরিকদের সেই তথ্যের উৎস ও সত্যতা জানার অধিকার থাকবে না কেন? এখানেই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও নৈতিক লড়াই হতে পারে।
লড়াইটা হয়তো মানুষ বনাম AI হবে না।
লড়াই হবে ক্ষমতা বনাম জবাবদিহির।
আজ পৃথিবীর কয়েকটি শক্তিশালী রাষ্ট্র এবং বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান AI-এর উন্নয়নের দৌড়ে এগিয়ে যেতে চাইছে। কারণ AI অর্থনৈতিক শক্তি, সামরিক শক্তি, গোয়েন্দা শক্তি এবং বৈশ্বিক প্রভাবকে বহুগুণ বাড়াতে পারে। কিন্তু এখানেই বিপদের আরেকটি দরজা খুলে যায়। AI যদি অল্প কয়েকটি রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে যে প্রযুক্তি বৈষম্য কমানোর কথা ছিল, সেটিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৈষম্যের যন্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
- ব্রিটিশ সরকারের frontier AI বিষয়ক বিশ্লেষণেও বাজারক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ, নজরদারি, আচরণ প্রভাবিত করা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ AI-এর বিপদ শুধু AI কতটা বুদ্ধিমান হবে তা নয়; প্রশ্ন হলো, কার হাতে সেই বুদ্ধি থাকবে।
তাই আমার কাছে ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ AI হবে সবচেয়ে শক্তিশালী AI নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ AI হবে সেই AI, যে প্রশ্ন করতে পারবে:
“এই সিদ্ধান্তে কার লাভ, কার ক্ষতি? এই অর্থ কোথা থেকে এলো? এই আইনটি সবার জন্য সমান কি? এই যুদ্ধের প্রকৃত কারণ কী? এই সম্পদ কয়েকজনের হাতে কেন? এই তথ্যটি সত্য কি? এই ক্ষমতার জবাবদিহি কোথায়?”
ভাবুন, পৃথিবীর প্রতিটি বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটি স্বাধীন বৈশ্বিক AI ব্যবস্থা সেই সিদ্ধান্তের মানবিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং বৈষম্যমূলক প্রভাব বিশ্লেষণ করছে। রাষ্ট্র চাইলে তাকে বন্ধ করে দিতে পারবে না। কোনো কর্পোরেশন নিজের সুবিধামতো তার রিপোর্ট বদলাতে পারবে না। তার অ্যালগরিদম স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা যাবে। তার সিদ্ধান্তও মানুষের মতোই চ্যালেঞ্জ করা যাবে।
এটি কোনো AI-শাসিত পৃথিবীর স্বপ্ন নয়।
বরং এটি হতে পারে মানুষকে মানুষের কাছ থেকে রক্ষা করার একটি নতুন ব্যবস্থা।
তবে এখানেই সবচেয়ে বড় সতর্কতা।
যদি AI-কে অন্ধভাবে ক্ষমতা দেওয়া হয়, তাহলে আমরা দুর্নীতিবাজ মানুষের পরিবর্তে পক্ষপাতদুষ্ট মেশিন পেতে পারি।
মানুষের তৈরি অন্যায় তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত AI অন্যায়কে আরও নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে। তাই AI-কে মানুষের ওপরে বসানো যাবে না। তাকে বসাতে হবে মানুষের সংবিধান, মানবাধিকার, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে।
আরেকটি বিষয়ও পরিষ্কার করা দরকার। AI যে মানুষকে ধ্বংস করবেই, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক নিশ্চিততা নেই। কিন্তু যারা সবচেয়ে উন্নত AI তৈরি করছেন, তাঁদের মধ্যেই এখন নিয়ন্ত্রণ হারানোর সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। এই উদ্বেগকে উপহাস করার সময়ও নেই, আবার আতঙ্ক ছড়ানোরও প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হলো প্রশ্ন করা এবং প্রস্তুত হওয়া।
কারণ ইতিহাসে আমরা একটি ভয়ংকর ভুল বারবার করেছি।
প্রথমে শক্তিশালী অস্ত্র তৈরি করেছি। পরে তার নিয়ন্ত্রণের নিয়ম বানিয়েছি।
প্রথমে প্রযুক্তি ছড়িয়েছি। পরে তার ক্ষতি সামলানোর চেষ্টা করেছি।
প্রথমে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছি। পরে জবাবদিহি খুঁজেছি।
AI-এর ক্ষেত্রে হয়তো প্রথমবারের মতো আমাদের উল্টো পথে হাঁটতে হবে।
আগে নিয়ন্ত্রণ, পরে ক্ষমতা।
বিশ্বের পরাশক্তিদেরও বুঝতে হবে, AI-এর প্রতিযোগিতা যদি শেষ পর্যন্ত কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে সেই প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তাহলে একদিন এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি হতে পারে যার গতি মানুষের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে দ্রুত, যার সিদ্ধান্ত মানুষের বোঝার ক্ষমতার চেয়ে জটিল এবং যার ক্ষমতা কয়েকটি রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত।
সেদিন প্রশ্ন হবে না, কে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ।
প্রশ্ন হবে, পৃথিবী কি এখনও মানুষের হাতে আছে?
তাই AI-কে থামানোর কথা আমি বলছি না।
আমি বলছি, AI-কে মানুষের বিবেকের বিকল্প নয়, মানুষের বিবেকের আয়না বানাতে হবে।
যে আয়নায় রাষ্ট্র নিজের দুর্নীতি দেখতে পাবে, ক্ষমতাবান নিজের স্বার্থ দেখতে পাবে, প্রতিষ্ঠান নিজের বৈষম্য দেখতে পাবে এবং সাধারণ মানুষ দেখতে পাবে তার অধিকার কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে।
মানুষ যদি সত্যিই দিন দিন অমানবিক হয়ে ওঠে, তাহলে হয়তো ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় আশ্চর্য হবে এমন একটি AI, যে মানুষকে অমানবিক হতে দেবে না।
- মানুষকে AI-এর দাস বানানোর দরকার নেই। বরং এমন AI দরকার, যার সামনে ক্ষমতাবান মানুষও বলতে বাধ্য হবে: “আমি ক্ষমতাবান, কিন্তু আমি আইনের ঊর্ধ্বে নই।”
হয়তো এখানেই AI-এর প্রকৃত মানবিকতা।
আর হয়তো মানবসভ্যতার শেষ সুযোগও।
কারণ আমরা যদি AI-কে নিয়ন্ত্রণ করার আগেই নিজেদের লোভ, যুদ্ধ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার উন্মাদনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তাহলে একদিন AI আমাদের ধ্বংস করবে কি না, সেটিই হয়তো সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকবে না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে:
মানুষ কি AI আসার আগেই নিজেকে ধ্বংস করে ফেলবে?
আর সেই কারণেই আজকের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হতে পারে আরও সরল:
AI কি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি AI-এর সাহায্যে মানুষ প্রথমবারের মতো মানুষের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখবে?
আমি দ্বিতীয় পথটির সম্ভাবনাই দেখতে চাই।
কারণ পৃথিবীকে বাঁচাতে আমাদের AI-কে মানুষের জায়গায় বসানোর প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে কোনো পরাশক্তি, কোনো সরকার, কোনো কর্পোরেশন এবং কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি প্রযুক্তি, অর্থ বা সামরিক শক্তির কারণে মানবতার ঊর্ধ্বে উঠে যেতে না পারে।
পরাশক্তিকে পরাজিত করার জন্য নয়, পরাশক্তির ক্ষমতাকেও জবাবদিহির মধ্যে আনার জন্য AI দরকার। হয়তো এটাই AI যুগের সবচেয়ে অস্বাভাবিক, অথচ সবচেয়ে মানবিক বার্তা:
মানুষকে দমন করার জন্য AI নয়। মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্য কমানোর জন্য AI। আমরা যদি এই ভারসাম্য তৈরি করতে পারি, তাহলে AI হয়তো মানবসভ্যতার প্রতিদ্বন্দ্বী হবে না। বরং মানুষ যখন নিজের তৈরি ক্ষমতার কাছে পরাজিত হওয়ার পথে, তখন AI-ই হয়তো তাকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে বলবে:
“থামুন। পৃথিবী শুধু আপনার নয়।”
লেখক : রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
ই-মেইল: [email protected]