ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ আইন-আদালত ]

আপসনামায় অন্য পক্ষের অধিকার খর্ব নয়: হাইকোর্ট

আদালত প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৯:২৭, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আপসনামায় অন্য পক্ষের অধিকার খর্ব নয়: হাইকোর্ট
ছবি: সংগৃহীত

কোনো মামলায় একাধিক পক্ষের মধ্যে আপসনামার ভিত্তিতে পুরো সম্পত্তি নিয়ে ডিক্রি দেওয়া হলেও, ওই আপসে সম্মতি না দেওয়া কোনো পক্ষের স্বতন্ত্র স্বত্ব ও অধিকার খর্ব করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, কোনো পক্ষের নিজস্ব অবহেলা বা গাফিলতির কারণে তৈরি ঘাটতি পূরণের জন্য সাধারণত মামলা পুনরায় বিচারের জন্য নিম্ন আদালতে পাঠানো উচিত নয়। তবে কোনো পক্ষের ইচ্ছাকৃত বা দোষযোগ্য আচরণের কারণে নয়, বরং আইনজীবীর অনুপস্থিতির মতো পরিস্থিতিতে তার লিখিত জবাব গ্রহণ করা না হলে এবং এতে সম্পত্তিতে তার স্বতন্ত্র দাবি প্রতিষ্ঠার সুযোগ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে ন্যায়বিচারের স্বার্থে তাকে মামলাটি প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

Advertisement

সম্প্রতি ‘মোহাম্মদ আলী ও অন্যান্য বনাম আবদুল জব্বার ও অন্যান্য’ মামলার রায়ে এসব পর্যবেক্ষণ দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ফার্স্ট আপিল নম্বর ৩৩৯/২০১৮-এর শুনানি শেষে গত ২৫ আগস্ট এ রায় দেন। মামলাটির শুনানি শেষ হয় ২০ আগস্ট।

জমি নিয়ে বিরোধ

মামলার নথি অনুযায়ী, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া এলাকায় ১৪ দশমিক ৬৪ একর জমি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত। বাদীরা ওই জমির ৫ দশমিক ৮৬ একর নিজেদের দাবি করে স্বত্ব ঘোষণার মামলা করেন।

মামলায় কয়েকজন বিবাদী বাদীদের দাবি মেনে নিলেও অন্য কয়েকজন বিবাদী জমির বড় একটি অংশে নিজেদের স্বত্ব দাবি করেন। তারা ১৯৬৪ সাল থেকে বিভিন্ন নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে ওই জমি কেনার দাবি করেন।

এর আগে একই ১৪ দশমিক ৬৪ একর জমি নিয়ে পার্টিশন স্যুট নম্বর ৫/২০০৪ দায়ের করা হয়েছিল। ওই মামলায় বর্তমান আপিলকারীদের পক্ষে ৬ দশমিক ২১৫০ একর জমি বরাদ্দ দিয়ে ডিক্রি দেওয়া হয়। পরে ওই ডিক্রির বিরুদ্ধে করা আপিলও খারিজ হয়ে যায়।

পরবর্তী স্বত্ব ঘোষণার মামলায় কয়েকজন বিবাদী নির্ধারিত সময়ের পর লিখিত জবাব দাখিল করেন। লিখিত জবাব গ্রহণের আবেদনের শুনানির দিন তারা বা তাদের আইনজীবী উপস্থিত হয়ে আবেদনটি উপস্থাপন না করায় আদালত তা গ্রহণ করেননি। পরে বাদী ও কয়েকজন বিবাদীর মধ্যে আপসের ভিত্তিতে পুরো মামলাটি নিষ্পত্তি করা হয়।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

রায়ে হাইকোর্ট বলেন, কোনো পক্ষের নিজস্ব অবহেলা বা গাফিলতির কারণে সৃষ্ট ঘাটতি পূরণের জন্য সাধারণভাবে মামলা রিমান্ড করা উচিত নয়। তবে কোনো পক্ষের ইচ্ছাকৃত বা দোষযোগ্য আচরণের কারণে নয়, এমন পরিস্থিতিতে যদি সে কার্যকরভাবে মামলা পরিচালনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এবং এতে তার গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলাটি পুনরায় বিচারের জন্য নিম্ন আদালতে পাঠানো যেতে পারে।

আদালত বলেন, বর্তমান আপিলকারীরা মামলায় পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ছিলেন না। তারা আদালতে হাজির হয়েছিলেন, লিখিত জবাব দাখিলের জন্য সময় নিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত লিখিত জবাব গ্রহণের আবেদনও করেছিলেন। কিন্তু শুনানির দিন তাদের আইনজীবী আবেদনটি উপস্থাপন না করায় লিখিত জবাব গ্রহণ করা হয়নি।

হাইকোর্টের মতে, জমির স্বত্ব ঘোষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ মামলায় লিখিত জবাব গ্রহণ না করার বিষয়টি গুরুতর। কারণ সংশ্লিষ্ট বিবাদীরা নিবন্ধিত দলিলের ভিত্তিতে জমির একটি উল্লেখযোগ্য অংশে স্বতন্ত্র স্বত্ব দাবি করেছিলেন এবং আগের পার্টিশন মামলার ডিক্রির ওপরও নির্ভর করেছিলেন।

আপসনামায় অন্য পক্ষের অধিকার খর্ব নয়

হাইকোর্ট স্পষ্ট করে বলেন, কোনো পক্ষের সঙ্গে করা আপসনামা ওই আপসে সম্মতি না দেওয়া অন্য পক্ষের স্বতন্ত্র স্বত্ব ও অধিকারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে না। সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি যথাযথভাবে বিবেচনা ও বিচার করেই সিদ্ধান্ত দিতে হবে।

আদালত আরও বলেন, আগের পার্টিশন মামলায় যে জমি নিয়ে ডিক্রি দেওয়া হয়েছিল, তার সঙ্গে বর্তমান মামলার জমির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আগের ডিক্রিতে বর্তমান আপিলকারীদের পক্ষে ৬ দশমিক ২১৫০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ফলে পরবর্তী আপসের ভিত্তিতে দেওয়া ডিক্রি আগের ওই ডিক্রির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।

এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট আপিল মঞ্জুর করেন এবং ২০১৫ সালে নিম্ন আদালতের দেওয়া রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন। একই সঙ্গে মামলাটি নতুন করে নিষ্পত্তির জন্য ট্রায়াল কোর্টে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন।

আদালত নির্দেশ দেন, ১১ থেকে ২২ নম্বর বিবাদীর দাখিল করা লিখিত জবাব ১০ হাজার টাকা খরচ পরিশোধের শর্তে রেকর্ডে গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি আপিলে পরবর্তীতে যুক্ত হওয়া ৯ থেকে ১৮ নম্বর আপিলকারীদের মূল মামলায় বিবাদী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের লিখিত জবাব দাখিলের সুযোগ দিতে হবে।

নতুন করে বিচারকাজে সব পক্ষকে প্রমাণ উপস্থাপনের যুক্তিসংগত সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি আগের পার্টিশন মামলায় ২০০৭ সালে দেওয়া ডিক্রিসহ পরবর্তী ডিক্রিগুলো বিবেচনায় নিতে ট্রায়াল কোর্টকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

মামলার নথি ও হাইকোর্টের রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর সম্ভব হলে ছয় মাসের মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

রায়ের মূল বক্তব্য হলো, কোনো পক্ষ আপসনামায় অংশ না নিলে শুধু ওই আপসের ভিত্তিতে তার স্বতন্ত্র স্বত্ব ও অধিকার খর্ব করা যাবে না। বিশেষ করে একই সম্পত্তি নিয়ে পূর্ববর্তী আদালতের ডিক্রি বিদ্যমান থাকলে, তা যথাযথভাবে বিবেচনা না করে আপসের ভিত্তিতে নতুন ডিক্রি দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ন্যায়বিচারের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে তার দাবি ও প্রমাণ উপস্থাপনের কার্যকর সুযোগ দিতে হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!